তালিপামের পরম্পরা কয়েকটি প্রস্তাব by মোকারম হোসেন

তালিপামের কথা প্রথম জানতে পারি বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম প্রকাশিত রেড ডেটা বুক অব ভাস্কুলার প্লান্টস অব বাংলাদেশ বইটি পড়ে। প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। গ্রন্থের পৃষ্ঠাজুড়ে তালিপামের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি ছাপা হয়। প্রাথমিকভাবে গাছটিকে তালগাছ না ভেবে উপায় নেই। কারণ, গাছের কাণ্ড ও পাতার গড়ন হুবহু তালগাছের মতোই। গাছটির পাশেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি উঁচু আবাসিক ভবন। তার নবম তলায় থাকেন চারুকলার বর্তমান ডিন শিল্পী মতলুব আলী। তাঁর ঘরের জানালা দিয়ে সরাসরি গাছটি দেখা যায়। আর দশজনের মতো তিনিও গাছটিকে তালগাছই ভেবে আসছিলেন। গাছটি দেখতে দেখতে তিনি হয়তো আনমনা হয়ে গ্রামের কোনো দৃশ্য কল্পনা করেছিলেন। এভাবেই তাঁর ভাবনায় গেঁথে থাকে চিরচেনা একটি অপূর্ব দৃশ্য। কিন্তু হঠাৎ করেই কেউ যেন তাঁর চিরচেনা সেই দৃশ্যটি বদলে দেয়। ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে তালগাছের মাথা ফুঁড়ে দীর্ঘ এক মঞ্জরিদণ্ড গজায়। বিস্ময় মানেন তিনি। এমন তালগাছ কি জীবনে কখনো দেখেছেন! নিছক তালগাছ ভেবেই এত দিন যার ক্যানভাস সাজিয়েছেন, রং-তুলিতে এখন কীভাবে তা বদলে দেবেন। যখন শুনতে পান, এ গাছটি নিতান্তই দুর্লভ এবং বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক তালিপাম, তখন তাঁর বিস্ময়ের মাত্রা আরও বাড়ে। তত দিনে পত্রিকা পড়ে জেনেছেন গাছটির শেষ পরিণতি। সিদ্ধান্ত নিলেন, ফুল থেকে ফল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি তাঁর চিত্রকর্মে ধরে রাখবেন। দীর্ঘদিন সময় নিয়ে কাজটি শেষ করেছেন তিনি। আমিও গত এক বছর গাছটির বিভিন্ন পরিবর্তন ক্যামেরায় ধারণ করার জন্য তাঁর বাসাটিই ব্যবহার করেছি। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তালিপাম ফুল ও ফল দেওয়ার পর মৃত্যুবরণ করে। আমাদের তালিপামটি দুটো প্রক্রিয়াই শেষ করেছে। নিজের স্বেচ্ছামরণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে রেখে যাচ্ছে তার কয়েক হাজার সবুজ সন্তান।
তালিপামের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পর্যায় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে প্রথম আলো। ২০০৮ সালের ১৮ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত মোট চারটি প্রতিবেদন ও একটি উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদন পড়ে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ পাঠক জেনেছেন পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক তালিপাম সম্পর্কে। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে গাছটি দেখতে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যান। এই তালিপামটি নিয়ে কেন এত হইচই? গাছটি কি খুব সুদর্শন, সুস্বাদু ও দুর্লভ ফল পাওয়া যায়, নাকি দারুমূল্যে অনন্য? না, এর কোনোটিই নয়। প্রধানত আমাদের জানামতে এটি পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক তালিপাম; দ্বিতীয়ত, বঙ্গের নিজস্ব গাছ। ফুল ফোটার পর সবাই যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, তা হচ্ছে যথাযথভাবে বীজ হবে কি না, বীজ থেকে স্বাভাবিকভাবে চারা হবে তো! অবশেষে আমাদের সব দুশ্চিন্তার অবসান হলো। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান হাজার খানেক চারা করতে সক্ষম হয়েছে। তা ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগও ছয় শর মতো চারা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্যের বাসায় তালিপামের প্রথম উত্তরসূরি তৈরির চমকপ্রদ খবরটি গত ৮ মে একটি জাতীয় দৈনিকের মাধ্যমে জানা যায়। একক প্রচেষ্টায় এ কাজটি করেন মালী জাহাঙ্গীর আলম। পরে পর্যায়ক্রমে উপরিউক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর খবর পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত বিলুপ্তির হাত থেকে একটি প্রজাতি রক্ষা পেল।
তালিপামের এসব অমূল্য চারা আমরা কী করব? যত দূর জানি, এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় তালিপামের চারা লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু আমরা চাই, এই চারাগুলো বিলি-বণ্টনে জাতীয়ভাবে একটি সমন্বয় থাকুক। সুষ্ঠুভাবে তদারক করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি কমিটি করা হোক। চারা রোপণের ক্ষেত্রে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। শুধু চারা লাগালেই হবে না, সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। বৃদ্ধি শ্লথ হওয়ায় রোপণের পর কয়েক বছর একটু ভালোভাবে তদারক করতে হবে। এ কাজটি কোনো অবস্থায়ই যেন আমাদের বৃক্ষরোপণের মতো করুণ পরিণতিতে গিয়ে না ঠেকে।
প্রসঙ্গত, আরও দু-একটি প্রস্তাব রাখছি। প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি চারা লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনে পাঠানো যেতে পারে। ‘কিউ’ সারা বিশ্বের বিচিত্র উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা কোনো ধরনের দুর্যোগে যদি আমাদের সব কটি পাম হারিয়েও যায়, তাহলে একমাত্র দীপশিখা জ্বালিয়ে রাখবে সেই গাছগুলো। আরেকটি বিষয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিবেচনা করতে পারে। বহির্বিশ্বে এসব চারা বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশে তালিপামের চারা দিয়ে বিনিময়ে সেসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিগুলো আমাদের দেশে নিয়ে আসা। তবে সেসব গাছপালা অবশ্যই উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়ার হতে হবে। না-হয় বাঁচিয়ে রাখাটাই হবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাতে আমাদের বোটানিক্যাল গার্ডেনের সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও নতুন নতুন প্রজাতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
বিরল এই পামগাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Corypha taliera। ভারতবর্ষে Corypha গণের চারটি প্রজাতি দেখা যায়। এগুলো হলো Corypha taliera (বাংলার নিজস্ব গাছ এবং অতি বিরল), C. umbraculifera (দক্ষিণ কেরালার নিজস্ব গাছ বলে ধারণা করা হয়, ঢাকার সিঅ্যান্ডবি বাগানে একটি গাছ ছিল, যা ২০-২৫ বছর আগে কেটে ফেলা হয়), C. elata (এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বিস্তৃত, দেশের চট্টগ্রামে কয়েকটি লাগানো গাছ আছে, বলধা গার্ডেনের একমাত্র গাছটিতে ২০০৮ সালে ফুল ফোটে, বীজ থেকে নতুন করে চারা তৈরি করা হয়), C. macropoda (আন্দামান অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। জানামতে বাংলাদেশে নেই)। পামের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য অতি সূক্ষ্ম। এ কারণেই অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তালিপাম নিয়ে সর্বশেষ একটি শুভ সংবাদ আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে।
বীজগুলো পরিপক্ব হওয়ার পরপরই এ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। অতিসম্প্রতি এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়। গবেষণা থেকে যে চমকপ্রদ ফল পাওয়া গেছে তা হচ্ছে, তালিপাম মানুষের বার্ধক্য ঠেকাতে পারবে। খবরটি উৎসাহব্যঞ্জক। এমন একটি সম্ভাবনার কথা জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন আবদুর রশীদসহ আরও কয়েকজন গবেষক। তালিপামের ফল নিয়ে গবেষণা করে তাঁরা প্রাথমিকভাবে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলো মানুষের বার্ধক্য প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। তাঁরা তালিপামের ফলকে ‘অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এজেন্টের’ একটি প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে দেখতে পেয়েছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ গবেষণার জন্য আরও বছর দুয়েক সময় ও কিছু অর্থকড়ির প্রয়োজন। এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্মটি যৌথভাবে সম্পাদিত হয়। আরও যাঁরা অংশ নেন তাঁরা হচ্ছেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান আবুল হাসান, ফার্মেসি অনুষদের ডিন মো. আবদুর রশীদ, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম এবং পিএইচডি গবেষক ও শিক্ষক আখতারুজ্জামান চৌধুরী। গবেষকেরা মনে করেন, মানুষ যে কারণে বৃদ্ধ হয়ে যায়, সেই কারণটাকে বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে ওই রাসায়নিক উপাদানে। ফলে প্রৌঢ় বয়সেও মানুষ যুবকের মতোই অনুভব করবে। যদি সুচারুরূপে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফল অর্জন করা সম্ভব হয়, তাহলে তা হবে আমাদের এক বিরাট সফলতা, বিরাট অর্জন। আমরা অধীর আগ্রহে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছি।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক, সাধারণ সম্পাদক, তরুপল্লব।
tarupallab@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.