ঢাকা-যশোর-খুলনা-গাড়ি চালাতেও ভয় by কৌশিক দে

রাজধানীর সঙ্গে খুলনার সড়ক যোগাযোগের দুটি রুট। একটি ঢাকা-আরিচা-যশোর, অন্যটি ঢাকা-মাওয়া-গোপালগঞ্জ হয়ে। কিন্তু দুটি মহাসড়কেরই বেহাল ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের মনে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা-গোপালগঞ্জ-মাওয়ার কুদিরবটতলা থেকে কাটাখালী,


খুলনা-যশোর-ঢাকার নওয়াপাড়া থেকে যশোর সড়ক যান চলাচলের অযোগ্য। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা এসব সড়কে গাড়ি চালাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। তাঁরা বলছেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ঈদের সময় যাত্রীরা ভয়াবহ দুর্ভোগের শিকার হবে। তবে সড়ক বিভাগ বলেছে, পুরোপুরি সংস্কার না হলেও ঈদের আগেই এসব সড়ক স্বাভাবিক যানচলাচলের উপযোগী করা হবে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কও ঈদের সময় তীব্র যানজটের অশনি সংকেত দিচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে ও সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, খুলনা-যশোর ২০ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা খুবই করুণ। বিশেষ করে যশোরের মুরুলি-রাজঘাট সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ। এ সড়কে বড় বড় খানা-খন্দ সৃষ্টি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। যশোর থেকে খুলনা আসতে আগে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগলেও এখন আড়াই বা তিন ঘণ্টার কমে যাতায়াত করা যাচ্ছে না।
যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ৬ জুলাই খুলনা সফরকালে নওয়াপাড়া-যশোর, খুলনা-মংলার কুদিরবটতলা থেকে কাটাখালী সড়কের বেহাল দশা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেন। এরপর রাস্তার বিভিন্ন স্থানের গর্তগুলো ইটের টুকরো ফেলে ভরাট করা হয়। কোনোরকম জোড়াতালি দিয়ে মেরামতের কারণে ভারি যানবাহন চলে কয়েক দিনের মধ্যেই রাস্তা আবার আগের চেহারায় ফিরে গেছে।
বাসচালক মোহাম্মদ উল্লাহ মোস্তফা বাবু বলেন, 'পুরো রাস্তাটিই চলাচলের অযোগ্য। স্পিডব্রেকার ও ভাঙাচোরা রাস্তায় গাড়ি চালানো কঠিন। বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় আগে যেখানে এক ঘণ্টা বা সোয়া এক ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে এখন আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা লাগে।'
সওজ খুলনা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গুলজার হোসেন বলেন, 'খুলনা-যশোর সড়কের নওয়াপাড়া থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজটি ছিল জরুরি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায়। এখনো সংস্কারকাজ চলছে। এটি শেষ হলে আর সমস্যা থাকবে না।'
কুদিরবটতলা-কাটাখালী সড়ক : চলতি বছরের শুরুতে প্রিরডিক্স মেইনটেন্স প্রোগ্রামের (পিএমপি) প্রকল্পের আওতায় খুলনা-মংলা সড়কের খুলনা-গোপালগঞ্জ-মাওয়া-ঢাকা অংশ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিয়ালেন্স বিল্ডার্স কাজ শুরু করে। প্রায় ৩১ কিলোমিটার সড়কের এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ কোটি টাকা। গত জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ কাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী জানুয়ারিতে। এ সড়কের সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা কুদিরবটতলা থেকে কাটাখালী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার পরই সওজ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এ অংশের কাজ জরুরি ভিত্তিতে শেষ করার তাগিদ দিতে থাকেন। কিন্তু গত সাত মাসেও সড়কের কাজ শেষ না হওয়ায় ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আটকা পড়ে যাত্রীদের দুই থেকে তিন ঘণ্টা পার করতে হয়। পুরো সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কই কাদামাটির মাঠে পরিণত হয়েছে।
রিয়ালেন্স বিন্ডার্সের প্রজেক্ট ম্যানেজার সাজ্জাত হোসেন জানান, বৈরী আবহাওয়া ও মাটির কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাগেরহাট জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনোয়ারউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সড়কটির বেহাল অবস্থা নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার এ বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। তবে ঈদের আগে এটি যানচলাচলের উপযোগী করা হবে।'
খুলনা মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন মৃধা বলেন, 'কয়েকটি রাস্তার যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে আমাদের গাড়ি চালানো বন্ধ করা ছাড়া গতি নেই। খুলনা-যশোর মাওয়া সড়কের কুদিরবটতলা থেকে কাটাখালী, খুলনা-যশোর মহাসড়কের নওয়াপাড়া থেকে যশোর সড়কে গাড়ি চলাচল একেবারে অসম্ভব।' তিনি আরো বলেন, 'খুলনা থেকে এসব সড়কে ঢাকা ছাড়াও অর্ধশতাধিক রুটে হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। আমরা রাস্তার এই অবস্থা থেকে মুক্তি চাই।'
খুলনা বিভাগীয় বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান ও খুলনা পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল গফফার বিশ্বাস জানান, রাস্তার বেহাল অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাতে হিমশিম খায় চালকরা। দুর্ঘটনাও বেড়েই চলেছে। তাঁরা এ অবস্থার জন্য কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অবহেলাকে দায়ী করে দ্রুত রাস্তা মেরামতের দাবি জানান।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক : এই মহাসড়কে এবারের ঈদে যাত্রীদের যানজটের কবলে পড়ে দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে। কারণ এই মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি বাঁক প্রশস্ত করার কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সড়ক ও জনপথ বিভাগ আপাতত প্রশস্তকরণ অংশে কার্পেটিং না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে বৃষ্টি হলে প্রশস্ত করা অংশগুলোতে ভাঙন ও গর্ত সৃষ্টি হয়ে যানজট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার পর ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিপজ্জনক বাঁকগুলো প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যোগাযোগমন্ত্রীর নির্দেশে গত জানুয়ারিতে এই মহাসড়কের ধামরাইয়ের ঢুলিভিটা থেকে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার উথুলী পর্যন্ত বিপজ্জনক ১১টি বাঁক চিহ্নিত করা হয়। এরপর দরপত্র আহ্বান ছাড়াই এ কাজের জন্য কয়েকজন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। যোগাযোগমন্ত্রী এ কাজ জুলাই মাসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিলেও অধিকাংশ বাঁকের প্রশস্তকরণের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

No comments

Powered by Blogger.