প্রকৃতিও যেন কাঁদছে হুমায়ূনের শোকে

প্রকৃতিও যেন কাঁদছে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমী তাঁর স্মরণে শোকসভার আয়োজন করেছিল একাডেমীর রবীন্দ্রচত্বরে। বেলা তিনটায় সভা শুরুর পরপরই নামল বৃষ্টি। অগত্যা সভাস্থল বদলে একাডেমীর সেমিনার কক্ষে শুরু হলো সভার কাজ।


বক্তারা বলছিলেন তাঁর অগণিত অনুরাগীর মতো প্রকৃতিও যেন হুমায়ূনের মৃত্যুতে শোকাভিভূত। কাঁদছে অঝোর ধারায়।
একাডেমীর সভাপতি আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে শোকসভার শুরুতেই হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সূচনা বক্তব্যে একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে শিগগিরই উত্তরাধিকার পত্রিকার হুমায়ূন আহমেদ সংখ্যা প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া আগামী তিন মাসে হুমায়ূন আহমেদের নির্বাচিত ১০টি উপন্যাস নিয়ে ধারাবাহিক লিখিত আলোচনার ব্যবস্থা করা হবে।’
তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক অবদান রেখেছেন। তাঁর সৃষ্টি দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক মাত্রা অর্জন করেছে।’
লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, হুমায়ূন আহমেদকে নিছক জনপ্রিয়তার দৃশ্যগ্রাহ্য মানদণ্ডে বিচার করলে ভুল হবে। তাঁর কথাসাহিত্যিক সৃষ্টিকুশলতা উত্তর প্রজন্মের লেখকদের জন্য পাথেয় হিসেবে কাজ করবে।
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘এই বাংলা একাডেমীতেই ১৯৭২ সালে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাঁর রচনায় মুক্তিযুদ্ধ নতুন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছে।’
কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ প্রায় একাই আমাদের প্রকাশনাশিল্পকে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের প্রকাশনাশিল্প ও বইমেলায় প্রভাব ফেলবে। আমাদের বেড়া ওঠার দিনগুলো তিনি তাঁর উপন্যাস ও নাটকে আনন্দময় করে তুলেছিলেন। সে জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
প্রকাশক আলমগীর রহমান চারটি প্রস্তাব দেন। সেগুলো হলো: আগামী বইমেলা হুমায়ূন আহমেদের নামে উৎসর্গ করা, বাংলা একাডেমীর পাঠাগারে তাঁর নামে একটি পাঠকক্ষ চালু করা, তাঁর নামে একটি জাতীয় সড়ক নামকরণ করা এবং একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে তাঁর জন্মদিনে হুমায়ূন মেলার প্রবর্তন করা ।
সাংবাদিক সালেহ্ চৌধুরী বাংলা একাডেমীকে হুমায়ূন আহমেদের বিপুল রচনাবলির একটি তথ্যপঞ্জি প্রকাশের প্রস্তাব দেন।
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর হুমায়ূন আহমেদের মানবিক দিকগুলোর প্রতি আলোকপাত করেন।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, জীবিতকালে ও প্রয়াণে হুমায়ূন আহমেদ দেশের সর্বস্তরের মানুষের যে ভালোবাসা অর্জন করেছেন, তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন কথাশিল্পী নন, একজন বড় মাপের মনস্তত্ত্ববিদ এবং দার্শনিকও বটে। তাঁর রচনা আমাদের যুক্তিবাদী হতে শিখিয়েছে।’ জাতীয় কবিতা পরিষদের সম্পাদক আসলাম সানী তাঁর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, হুমায়ূন আহমেদ ঐতিহ্য, আধুনিকতা, বিজ্ঞান ও মরমিবাদের মতো আপাত-বৈপরীত্যকে সুনিপুণ দক্ষতায় একত্র করেছেন। ভাষার বৈচিত্র্যেও ভাস্বর তাঁর সৃষ্টিভুবন। তিনি বলেন, আগামী অমর একুশে গ্রন্থমেলা হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে উৎসর্গ করা হবে। এ ছাড়া বাংলা একাডেমীতে স্থাপিত জাতীয় লেখক ও সাহিত্য জাদুঘরের একটি অংশে হুমায়ূন আহমেদের পাণ্ডুলিপি, ব্যবহূত জিনিসপত্র ও অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা হবে।
শোকসভায় হুমায়ূন আহমেদের বোন সুফিয়া হায়দার, মমতাজ শহীদ ও পরিবারের কয়েকজন আত্মীয় উপস্থিত ছিলেন।
নাগরিক শোকসভা: কাল শনিবার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট হুমায়ূন আহমেদের স্মরণে নাগরিক শোকসভার আয়োজন করেছে। কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে বেলা তিনটায় এ সভা শুরু হবে।
নুহাশপল্লী থেকে ফিরেছেন শাওন
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, হুমায়ূন আহমেদের দাফনের দুই দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নুহাশপল্লী ত্যাগ করেছেন তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন। গতকাল নুহাশপল্লীতে ছিল বরাবরের মতোই নিরিবিলি পরিবেশ।

No comments

Powered by Blogger.