ভাইভা পরীক্ষার প্রস্তুতি by আরিফুর রহমান

কথায় বলে প্রথমে দর্শনধারী তারপরে গুণবিচারী। এই কথাটি সর্বক্ষেত্রেই সর্বজনস্বীকৃত একটি প্রমাণিত সত্য। আপনি সাক্ষাতকার দিতে যাচ্ছেন কিন্তু আপনার বেশভূষা, বাচনভঙ্গি, আচরণ সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর নিকট যদি কাক্সিক্ষত না হয়।


তবে আপনি ওই চাকরি বা কাজের জন্য যতই উপযুক্ত হোন না কেন, আপনার চাকরি না পাওয়ার পাল্লাই ভারি থাকবে। সাক্ষাত গ্রহণকারীর কাছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য অপ্রতুল তথ্য থাকে। এই কারণেই আপনাকে ভালভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্যই কিন্তু সে আপনাকে ডেকেছে। আপনার মেধা, কাজ করার সক্ষমতা ও মানসিকতা যাচাই করার সঙ্গে সঙ্গে তারা আপনার ব্যক্তিগত গুণাবলীও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবে। তাই মনে রাখবেন, আপনাকে কেমন দেখাচ্ছে তা আপনার সাফল্যের মাত্রার ওপর বিরাট প্রভাব ফেলে। আলফ্রেড অ্যাডলার বলেছিলেন, ‘যদি আমরা কোন ব্যক্তিকে বুঝতে চাই ... তাহলে আমাদের কান বন্ধ করতে হবে। আমাদের শুধু চোখ মেলে দেখতে হবে। এভাবে আমরা নিঃশব্দ অঙ্গভঙ্গি প্রত্যক্ষ করতে পারব।’ এই উক্তিটা কিন্তু সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর মনের কথাই প্রকাশ করে। সাক্ষাতকার গ্রহণকারী প্রথমেই চাকরি প্রার্থীকে যাচাই করে তার বেশভূষা, বাচনভঙ্গি ও আচরণ দিয়ে। আপনার প্রতি যদি চাকরি প্রার্থীর ফার্স্ট ইমপ্রেশন খারাপ হয়ে যায় তাহলে সাক্ষাতকার পর্বে আপনার উৎরে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়বে। কেননা সাক্ষাতকার গ্রহণকারী আপনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। গবেষণায় দেখা যায়, আকর্ষণীয় শারীরিক সৌন্দর্য বাছাই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। ব্যাপারটি এতই বহুল প্রচলিত যে এর নামকরণ করা হয়েছে ইমপ্রেশন ম্যানেজমেন্ট। শারীরিক সৌন্দর্য ও শারীরিক সক্ষমতা চাকরিদাতাকে আপনার প্রতি বাড়তি ইমপ্রেশন সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। মহিলা ও পুরুষ উভয়ের জন্যই শারীরিক সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিদাতা এমন লোকদের চান যারা সাহসী, কঠিন কাজ ও চাপ সহ্য করার ক্ষমতা যাদের আছে। নির্দিষ্ট বয়সের তুলনায় যদি আপনাকে বেশি বয়স্ক মনে হয় তবে তা আপনার প্রতি নেতিবাচক ইমপ্রেশন সৃষ্টি করতে পারে। এই জন্য আপনাকে স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। আপনি যদি সুস্থ থাকেন, আপনার শারীরিক সক্ষমতা যদি ভাল থাকে এবং শারীরিক সৌন্দর্য যদি ভাল থাকে তবে আপনার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাই স্বাস্থ্যবান হওয়ার চেষ্টা করা একান্ত কর্তব্যর মধ্যেই পড়ে যায়। চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে যদি অন্য বিষয়গুলো সমান থাকে, যারা দেখতে সমর্থ এবং ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী, তাদেরই চাকরিটি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং পুষ্টিকর খাবার রুটিন মাফিক খান।
এবার আসা যাক সাক্ষাতকার দেয়ার প্রস্তুতিস্বরূপ আপনার পোশাক-পরিচ্ছদ কেমন হবে তা নিয়ে কিছু আলোচনা। সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর কাছে ইমপ্রেশন ম্যানেজমেন্টের কৌশল হিসেবে আপনি কী পোশাক পরেছেন তার গুরুত্ব অনেক। আপনার পোশাক পরিচ্ছদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কখনও কখনও বাড়তি সুবিধা যোগ করতে পারে। যারা আকর্ষণীয় এবং পোশাকে পরিপাটি তারা অপেক্ষাকৃত কম আকর্ষণীয় এবং বেমানান পোশাক পরিহিত প্রার্থীদের থেকে বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠেন। এখন বলছি পোশাক পরিধানের কিছু সদুপদেশ। যে পোশাক আপনাকে মানায় অর্থাৎ সঠিক স্টাইল এবং চমৎকার রঙের পোশাক পড়বেন। অবশ্যই খেয়াল রাখবেন দৃষ্টিকটু ফ্যাশনেবল পোশাক আপনার প্রতি নেতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি করতে পারে। ঐতিহ্যকে অনুসরণ করাই এক্ষেত্রে শ্রেয়। অতি আধুনিক হবার চেষ্টা না করাই উত্তম। সামর্থ্য অনুযায়ী মোটামুটি দামী ও উন্নতমানের পোশাক পরিধান করতে পারলে ভাল হয়। গাঢ় রঙগুলো হাল্কা রঙের চেয়ে বেশি উপযোগী। তাই পোশাক পরার সময় এই বিষয়টি মাথায় রাখুন। ভাল করে চুল কাটুন। বিশেষ করে পুরুষদের বেলায় বলতে হয় বড় বড় চুল ও এলোমেলো চুল আপনার প্রতি নেতিবাচক ইমপ্রেশন সৃষ্টি করতে পারে। তাই চেহারার সঙ্গে মানানসই চুল ছোট করুন। ভাল জুতো ক্রয় করুন এবং এগুলোকে চকচকে রাখুন। পুরুষদের ক্ষেত্রে বলতে হয়, আপনারা ফর্মাল ড্রেস ইন করে পড়ুন এবং বেল্ট যাতে আকর্ষণীয় হয় সেই দিকটিও খেয়াল রাখুন। বিশেষ করে করপোরেট চাকরির ক্ষেত্রে আপনাকে ফর্মাল ড্রেসে মানিয়ে নিতে হবে, তাই সুন্দর করে ফর্মাল ড্রেস পরুন। যদি প্রয়োজন মনে করেন সেই ক্ষেত্রে সুন্দর দেখে টাইও আপনি পরতে পারেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে বলতে হয় বেশি খোলামেলা পোশাক পরা উচিত নয়। কোন সুগন্ধি ব্যবহার করা উচিত নয়। সম্প্রতিক গবেষণায় সুগন্ধি ব্যবহারকে বাড়াবাড়ি বলে গণ্য করা হয়। আপনি যদি স্কার্ট পরে সাক্ষাতকার দিতে যান তবে এমনভাবে বসবেন যাদে ঊরু বের হয়ে না থাকে। আর শাড়ি বা সেলোয়ার কামিজ পরলে মার্জিতভাবেই পরা উচিত। অনেক সময় দেখা যায়, একদম নতুন পোশাকে আপনি ইতস্তত বোধ করলেন। এই জন্য যদি নতুন কোন পোশাক কিনে থাকেন তবে সাক্ষাতকারের পূর্বেই সেটি পরে অভ্যস্ত হয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অলঙ্কার কম ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আরেকটি বিষয় মহিলাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, উগ্র সাজসজ্জা সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর মনে আপনার প্রতি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এই বিষয়টির ব্যাপারে আপনাদের সর্তক থাকতে হবে। নিজেই ভেবে দেখুন কাপড়ের রুচিশীল রঙ ও স্টাইল কি হবে, টাইয়ের রঙ, চুলের দৈর্ঘ্য ইত্যাদি কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয়। কাজে সাফল্যের জন্য নিজেকে কৃত্রিম রূপে উপস্থাপনের চেষ্টা না করে সাবলীলভাবে রুচিসম্মত পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করুন। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সাক্ষাতকার দেয়ার সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে নিঃশব্দ ইঙ্গিতের মাধ্যমে আপনি আপনার সাফল্যের মাত্রাকে বাড়াতে পারেন। সুন্দর স্মিত হাসি, সাক্ষাত গ্রহণকারী কথা বলার সময় মাথা ঝাঁকানো, প্রশ্ন শোনা এবং উত্তর দেবার সময় সামনের দিকে একটু ঝুঁকে থাকা, যথার্থ আই কন্টাক্ট ইত্যাদি সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর নিকট আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করবে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে কোন ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি বা বিরক্তিকর কিছু করা যাবে না। আপনাকে রুচিশীল ও শোভনীয় আচণর করতে হবে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ মানুষের কথাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে ৬০ শতাংশ অবদান রাখে। তাই এটির প্রতি আপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। যতদূর সম্ভব চেয়ারের পেছনে দিক ঘেঁষে বসুন। কিছু সাক্ষাতের সেটআপ এমনভাবে সাজানো হয় যেন এটি একটি পারস্পরিক দর কষাকষি প্রস্তুতি। এসব ক্ষেত্রে প্রার্থী ও সাক্ষাত গ্রহণকারী মুখোমুখি অবস্থানে বসেন। এটা সহায়ক অবস্থা নয়। তথাপি আপনাকে এটা মেনে নিতে হবে। সাক্ষাতকারের সময় আপনাকে বসতে বলা হলে আপনি আপনার চেয়াটাকে ৪৫ ডিগ্রি ঘুরিয়ে বসে পরিবেশটাকে একটু সহজ করে নিতে পারেন। এটি অপানার আত্মবিশ্বাসের প্রবল বহির্প্রকাশ ঘটাবে। এখন চেয়ারটাকে সঠিক অবস্থানে আনার পর আপনি যদি আপনার শরীর, হাত আর কাঁধ সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর দিকে সমান্তরাল করে রাখতে পারেন তবে আপনি বোঝাতে সক্ষম হবেন যে, আপনি সাক্ষাতকার গ্রহণকারীকে পছন্দ করেছেন। এতে আপনার সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হবে।
আপনি চেয়ারে বসার সময় পায়ের অবস্থান কেমন হবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ। সাফল্য আড়াআড়ি বা এথলেটিক অবস্থান এক্ষেত্রে সঠিক। পা-গুলো অতিরিক্ত আড়াআড়ি করে রাখলে আত্মরক্ষামূলক ভাবমূর্তি প্রকাশ পায় যা সঠিক নয়। এথলেটিক অবস্থানে আপনার ডান পা চেয়ারের নিচে চলে আসে আর শুধু জুতার ডগা মেঝে স্পর্শ করে থাকে, আর বাঁ পা চেয়ারের সাথে সমান্তরাল দৃঢ়ভাবে সোজাসুজি সামনে থাকবে। এটি খুবই শক্তিশালী অবস্থান। আর এতে আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে। তবে এই এথলেটিক অবস্থান নারীদের জন্য যথাযথ নয়।
তাদের উচিত পা-গুলো সামান্য আড়াআড়ি অবস্থানে রাখা অথবা শুধু পায়ের গোড়ালি আড়াআড়ি করে রাখা। এবার আসা যাক হাতের অবস্থান কি হবে তার আলোচনা। হাত দুটোকে আপনার কনুইয়ের থেকে নিচু করে রাখুন। নিজের ঊরুর ওপর এগুলোকে আলতো করে রাখুন অথবা দু’হাতে আঙ্গুলগুলো পরস্পরের সাথে সামান্য আড়াআড়ি করে দিন। এই অবস্থানটা অস্থির চিত্তের মানুষের জন্য উপকারী এবং যারা কথা বলার সময় হাত নাড়েন। যত কম হাত আর আঙ্গুল নাড়ানো যাবে ততই মঙ্গল। তাই এই অবস্থানে হাত রাখলে আপনার ভাবমূর্তি উজ্জ্ব হওয়ার সম্ভবনা বেশি।
সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর চোখে চোখ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে আপনাকে বেশি আত্মাবিশ্বাসী মনে হবে। কেউ কেউ অন্যের চোখে চোখ রাখতে অসুবিধা বোধ করেন। আপনি যদি এদের মতো হন তাহলে সাক্ষাতকার গ্রহণকারীর কানের দিকে তাকানোর চর্চা করুন।
এই যে সাক্ষাতকার দেয়ার জন্য যেসব বিষয়ের অবতারণা করলাম এই বিষয়গুলোতে একদিনেই অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব নয়। তাই আপনাকে এসব কিছু নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে।
মনে রাখবেন, আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, আপনার বাচনভঙ্গি, পোশাক-আশাক, বসার ধরন ইত্যাদি যদি সঠিক হয় তবে আপনি অতি সহজেই সাক্ষাতকার গ্রহণকারীকে আপনার প্রতি ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পাববেন, যা আপনার কাক্সিক্ষত চাকরি লাভের দুয়ার খুলে দেবে। তাই চাকরি পাচ্ছেন না এই হতাশা প্রকাশ না করে এখন থেকেই নেমে পড়ুন অনুশীলনে।
মডেল : রেজা ও তারেক

No comments

Powered by Blogger.