কীটনাশক বিষ 'কার্বামেট' আমাদের শরীরে! by তৌফিক মারুফ

আর্সেনিকের পর এবার দেশে আরেক রাসায়নিকের বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই বিষের নাম 'কার্বামেট'। এটা ব্যবহার করা হয় ফসলে দেওয়ার কীটনাশকে। ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে কীটনাশকের এই বিষ কার্বামেট পাওয়া গেছে মানবদেহে। এর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ১১ শিশুর সন্ধান মিলেছে ঢাকার পাশে ধামরাইয়ে।


তাদের মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যুও ঘটেছে। ধামরাইয়ে গবেষণারত দেশি-বিদেশি গবেষকদের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মতে, ফসলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে সেই বিষ খাদ্যের মাধ্যমে নীরব ঘাতক হয়ে ঢুকে পড়ছে মানবদেহে। আর সেই বিষের মাত্রা অতিরিক্ত হলে অনেকে মারা যাচ্ছে, অনেকে গুরুতর অসুস্থ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। এভাবে দেশ আরেক 'বিষ বিপর্যয়'-এর মুখোমুখি হতে পারে বলে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসা গবেষকরা।
ধামরাইয়ের পাশাপাশি আরেক দল গবেষক গবেষণা চালিয়েছেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলায়। সেখানে তাঁরা মাত্রাতিরিক্ত কার্বামেটের উপস্থিতি পেয়েছেন পানিতে।
দুটি গবেষণার ফলাফলই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একাধিক প্রকাশনায় ছাপা হলেও স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বিষয়টি প্রকাশ করা হয়নি। তবে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানের মুখে উভয় দলের দায়িত্বশীল বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি স্বীকার করে জরুরি ভিত্তিতে কার্বামেটের বিষক্রিয়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা কালের কণ্ঠের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, সারা দেশেই এ ধরনের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে, বিশেষ করে শিশুরা। কিন্তু চিকিৎসকদের পক্ষে তা সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসাও হয়ে থাকতে পারে। তাঁরা আরো বলেন, আর্সেনিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বিষক্রিয়া ছড়ায় আর কার্বামেট সরাসরি মানুষের ব্যবহারের মাধ্যমে বিষক্রিয়া ছড়াচ্ছে। তাই আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও কার্বামেট বা অন্যান্য কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করা কঠিন কিছু হবে না। তবে আর্সেনিক বিশেষ কিছু স্থানে এবং বিশেষত পানির মাধ্যমে ছড়ালেও কার্বামেট দেশব্যাপী কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক হারে ব্যবহার হওয়ায় এর ক্ষতিকর প্রভাবও অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানীসংলগ্ন ধামরাই উপজেলার দুটি গ্রামে শিশুদের ওপর পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে এই বিষাক্ত কার্বামেট পাওয়া গেছে। একই ধরনের উপসর্গে ওই এলাকার তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টিও গবেষকরা এই কার্বামেটের প্রতিক্রিয়া বলে দাবি করেছেন।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান- আইইডিসিআর, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন ও আন্তর্জাতিক উদারাময় রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান- আইসিডিডিআরবির যৌথ দল ধামরাইয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছে। অন্যদিকে রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় পানিতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বামেট বিষক্রিয়া পেয়েছে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের একদল বিশেষজ্ঞ।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে টিউবওয়েলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বামেট বিষক্রিয়া শনাক্ত হয়। সেখানে এমন কার্বামেটযুক্ত নলকূপগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের দেশে এমন কোনো পর্যবেক্ষণ বা পদক্ষেপ সম্পর্কে আমার জানা নেই। এ ছাড়া বাংলাদেশে মানবদেহে কার্বামেট পাওয়ার ঘটনা এর আগে আর শুনিনি।' তিনি জানান, বাংলাদেশে যত ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে গড় হিসাবে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩০ শতাংশ থাকে এই কার্বামেট জাতীয় কীটনাশক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইইডিসিআরের পরিচালক ও ধামরাইয়ে গবেষণা দলের অন্যতম বিশেষজ্ঞ ড. মাহামুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, ধামরাইয়ে কৃষিনির্ভর গ্রাম মালঞ্চ (ভাড়ারিয়া ইউনিয়নে) ও নওগাকায়েত (কুল্লা ইউনিয়ন) গ্রাম দুটিতে শিশুদের মধ্যে ২০০৯ সালে এক অজ্ঞাত রোগ দেখা দেয়। এতে তিনটি শিশুর মৃত্যু ঘটে। ১১ শিশুর মধ্যে একই ধরনের স্নায়ুতন্ত্রের নানা গোলযোগের উপসর্গ বিদ্যমান ছিল। ১১ শিশুর অর্ধেকের বেশির মধ্যেই শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম দেওয়া, মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়া, হাত-পা দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং অচেতন হয়ে যাওয়ার উপসর্গ ছিল। এসব শিশুর বয়স ছিল ১৬ মাস থেকে ৮ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে সাতটি মেয়ে ও চারটি ছেলে। এ শিশুদের বেশির ভাগের রক্তে ও প্রস্রাবে কার্বামেট ও অর্গানো ফসফেট জাতীয় কীটনাশক উপাদানের বিষক্রিয়া পাওয়া যায়। কারো কারো মধ্যে বিষক্রিয়ার মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের (ইউএস এনএইচএএনইএস ৯৫) চেয়ে ৬ থেকে ২৩ গুণ পর্যন্ত বেশি দেখা যায়।
ড. মাহামুদুর রহমান বলেন, 'উপসর্গ ও পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, কার্বামেট ও অর্গানো ফসফেট জাতীয় কীটনাশক উপাদানের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েই ওই শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমনকি তিন শিশুর মৃত্যু ঘটে এই একই কারণে।
বিশেষজ্ঞ দলের আরেক সদস্য আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, কার্বামেট ও অর্গানো ফসফেট জাতীয় কীটনাশক উপাদানের বিষক্রিয়া শিশুদের জন্য খুবই বিপজ্জনক। শিশুদের শরীরে এর বিষক্রিয়া দেখা দিলে তাদের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়, মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়, খিঁচুনি দেয় এবং অচেতন হয়ে পড়ে। সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে মারা যায়। তবে বড়দের শারীরিক সহনীয় ক্ষমতা বেশি থাকায় এর বিষক্রিয়া ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে। ড. মাহামুদুর রহমান বলেন, বড়দের ক্ষেত্রে কার্বামেট ও অর্গানো ফসফেট জাতীয় কীটনাশক উপাদানের বিষক্রিয়ার পরিণতি তাৎক্ষনিক দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে স্নায়ুতান্ত্রিক নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ড. মুশতাক হোসেন বলেন, কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের পরিণতি কম-বেশি সবাইকে ভোগ করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিশুরা সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে সঠিক মান রক্ষা করে এবং প্রয়োগবিধি না মেনে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে একাধারে উৎপাদিত ফসল, মাছ, পানি এবং জমি মারাত্মকভাবে বিষাক্ত হয়ে থাকে। আর এর যেকোনো মাধ্যম থেকে মানুষের শরীরে সহজেই ঢুকে পড়ছে এই বিষাক্ত উপাদান।
আইইডিসিআরের পরিচালক জানান, ২০০৯ সালের ২ থেকে ৯ এপ্রিল মালঞ্চ গ্রামে এবং ১৭ থেকে ২২ মে নওগাকায়েত গ্রামে অসুস্থ ওই ১১ শিশুর সন্ধান মেলে। এ সময়ে তাদের রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করে ওই বছরের মে মাস পর্যন্ত তাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরে ওই স্যাম্পল উন্নত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও পরীক্ষায় একই উপাদান মেলে। এ-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা অঙ্গনের গুরুত্ববহ ওই প্রতিষ্ঠানের বুলেটিনে গত বছরের ১ জানুয়ারি ছাপা হলেও বাংলাদেশে এটি প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, 'আমরা চাই আতঙ্কিত না হয়ে বরং দেশের মানুষকে কীটনাশকের বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চলতি বছরের ২১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পরিবেশবিষয়ক আরেকটি বুলেটিনে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একদল বিজ্ঞানীর গবেষণালব্ধ এক প্রতিবেদনে রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় পানিতে কার্বামেট ও অর্গানো ফসফেট জাতীয় কীটনাশক উপাদানের বিষক্রিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পীরগাছার ২৪টি সারফেস ওয়াটার এবং পাঁচটি গভীর নলকূপের পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এগুলোর পানিতে উচ্চমাত্রার কার্বামেট ও অর্গানো ফসফেট জাতীয় কীটনাশক উপাদানের বিষক্রিয়ার অস্তিত্ব দেখা যায়। এর মধ্যে ধানক্ষেতের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বোফুরান ও কার্বোরিলের উপাদান মেলে।
ওই গবেষকদলের অন্যতম বিজ্ঞানী ড. আলমগীর জামান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ফসল উৎপাদনে এসব কীটনাশক দেওয়া হয়। কিন্তু এর প্রয়োগবিধি মানা হয় না। অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পানিতে এর বিষক্রিয়া ঘটে। ওই পানি ব্যবহারকারী পশু-পাখির মৃত্যুর ঘটনাও আমরা দেখেছি। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে নানা ক্ষতিকর প্রভাব তো রয়েছেই। এ নিয়ে আরো গবেষণা চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্লান্ট প্রটেকশন ইউংয়ের পরিচালক কৃষিবিদ মো. আবু হানিফ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, কোন কীটনাশকের কী কাজ, বিষক্রিয়ার মাত্রা কী, কিভাবে প্রয়োগ করতে হবে, কী সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার- তা জেনে এসব কীটনাশক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে কিংবা আমদানিকারকদের অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতির আগে কয়েক দফা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপরও মানুষ কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন না হওয়ায় নানা ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমাদের পক্ষ থেকে সচেতন করার চেয়ে বেশি কিছু করার উপায় নেই। কারণ কোন চাষি কখন কোন কীটনাশক কিভাবে প্রয়োগ করছেন তা জনে জনে পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব নয়। তবে আমরা কীটনাশক বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না তা কঠোরভাবে মনিটরিং করছি। বিধি না মেনে বা অবৈধভাবে কীটনাশক প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতের কারণে অনেক কম্পানির ও বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.