সাদাকালো-বাংলা সমর্থক বিদেশিদের সম্মাননা ও একজন এয়ার মার্শাল by আহমদ রফিক

বলতে দ্বিধা নেই, রাজনৈতিক বিচারে আমি ঘোর পাকিস্তানবিরোধী এবং তা যুক্তিসংগত কারণে। শুধু একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর চরম বর্বরতার জন্যই নয়, আরো অনেক অনেক কারণে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেখা গেছে, শাসকশ্রেণীর স্থূল বাঙালিবিদ্বেষ, বাংলা (ভাষা)বিদ্বেষ।


পাকিস্তান আমলে করাচি, লাহোর, পিন্ডি ইত্যাদি শহরের শিক্ষিত শ্রেণীর সিংহভাগের মনোমোহনে নিহিত বাঙালি বিরূপতা এক অপ্রিয় সত্য_সূত্র ব্যক্তিগত ও বন্ধুস্থানীয়দের অভিজ্ঞতা। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বন্ধুদের তিক্ত অভিজ্ঞতা পদোন্নতি ও আচরণে। সেই কবে ১৯৬০ সালে করাচি বন্দরে দাঁড়ানো একটি ডেস্ট্রয়ার জাহাজের বাঙালি নাবিকদের মধ্যে কী তিক্ত প্রতিক্রিয়া! জাহাজের নামটা এত দিনে ভুলে গেছি।
'রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই'_এমন আপ্তবাক্য মনে রেখেই বলি, মানবিক ও মতাদর্শগত মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কিছু নিশ্চিত সত্য থাকে, যা হেরফের হওয়ার নয়। বাঙালি কখনো পাকিস্তানি শাসক ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের পাকাধানে মই দেয়নি, বরং বাঙালি মুসলমানের ভোটেই (১৯৪৬) পাকিস্তান কায়েম। ওই নির্বাচনের প্রদেশভিত্তিক ফলাফল তা প্রমাণ করে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানে বাঙালির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও অর্থনৈতিক শোষণ পাকিস্তানি শাসনের নীতি হয়ে দাঁড়ায়। আর ব্যতিক্রম বাদে সাধারণ আচরণে বাঙালিও কেন জানি তাদের সমীহ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। যখন ঘুরে দাঁড়ায়, তখনই বাধে সংঘাত। আর পাকিস্তানি অপপ্রচারের গুণে সাধারণ পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ বাঙালিবিদ্বেষ থেকে মুক্ত ছিল না, এখনো নয়। এ বিরূপতা নৃতাত্তি্বক-সাংস্কৃতিক চরিত্রেরও।
রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে লিয়াকত আলী খান, গজনফর আলী খান থেকে ফিরোজ খাঁ নূন, পীরজাদা আবদুস সাত্তার থেকে কাইউম খান বা দৌলতানারা_কেউ বাঙালিবিরোধিতার মানসিকতা থেকে মুক্ত ছিলেন না। বিষয়টা ক্রমে এতই নগ্নতা নিয়ে প্রকাশ পায় যে আতাউর রহমান খানের মতো 'পাক-বাংলাবাদী' রাজনীতিকের গায়েও সে আঁচ লাগে। এবং তা এতটাই যে ১৯৫৫ সালে গণপরিষদের অধিবেশনে এক বক্তৃতায় তাঁদের বাঙালিবিরোধী মানসিকতার উদাহরণ টেনেছেন তাঁর উদ্দেশ্যে এক পাতি পাঞ্জাবি নেতার মন্তব্য উল্লেখ করে_'তো ইয়ে বাংলা-ওয়াংলা কি বাত ছোঁড়ো।' বিষয়টা অবাঙালি পাকিস্তানের কাছে ডালভাতের মতো, আর 'মছলি' খাওয়া নিয়ে কত স্থূল রসিকতা নিজ কানেই শুনেছি। ওঁদের লেখা বইতেও এ বিরূপতা স্পষ্ট।
সে সময় ঢাকা এয়ারপোর্টে ফ্লাইট তথ্যাদির ঘোষণা ইংরেজি ও উর্দুতে, বাংলায় নয়। অথচ এ অঞ্চলটা বাংলা, যাত্রীদের সিংহভাগ বাঙালি। পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের দশকে এসব সাংস্কৃতিক দিক ছাড়িয়ে বৈষম্যের নানা দিক নিয়ে এক পাকিস্তানের দুই অঞ্চলে দুই অর্থনীতির প্রকাশ এতটা নগ্ন হয়ে ওঠে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারা তো বটে, মধ্যপন্থীরাও পূর্ব পাকিস্তানের শোষণ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, কেন ছয় দফা বাঙালি-মানসে ব্যাপক উদ্দীপনা ছড়িয়েছে।
ষাটের দশক এ বিষয়ে সচেতনতার কাল এবং শুধু রাজনীতিকরাই নন_শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সাহিত্যিক-সাংবাদিকরা জাতীয়তা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে অনমনীয় মনোভাব পোষণ করতে থাকেন। সব নিয়মেরই যেমন ব্যতিক্রম থাকে বা বলা যায়, ব্যতিক্রমই নিয়মের বাস্তবতা প্রমাণ করে, সেই সূত্রে এই বৈষম্য, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবজ্ঞার বাস্তবতা কিছুসংখ্যক অবাঙালি পাকিস্তানি চৈতন্যে আঘাত করে। বিষয়টা সম্বন্ধে তাঁরা সচেতন হয়ে ওঠেন।
এরা সংখ্যায় আঙুলে গোনা রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ক্বচিৎ দু-একজন সামরিক পেশাজীবী। আমরা এদের ভূমিকা বা মানসিকতা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে গিয়ে দেখতে পাই, পাঞ্জাবের মিয়া ইফতেখার উদ্দিন বা তাঁর পুত্র আরিফ ইফতেখারকে, সিন্ধুর জি এম সৈয়দ বা আবদুল মজিদ সিন্ধি, সীমান্ত প্রদেশের বাদশা খান বা ওয়ালি খানকে। তেমনি বালুচ নেতা গাউস বঙ্ বেজেন্ধোকে। মনে রাখতে হয় ভাইস অ্যাডমিরাল এস এম আহসান ও জেনারেল ইয়াকুব খানের কথা।
পাশাপাশি অধিকতর আন্তরিকতায় একান্তজন হিসেবে চিনে নেই সাংস্কৃতিক জগতের কিছুসংখ্যক অসাধারণ মানুষকে। যেমন_ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, সাজ্জাদ জহির, মাহমুজ্জাফর ও তাঁর স্ত্রী রশিদ জাহান, মাজহার আলী খান ও তাঁর পুত্র ছাত্রনেতা তারিক আলীর মতো কবি রাজনীতিক সাংবাদিকদের। শেষোক্তজন বাদে বাকিদের কথা গভীর ভালোবাসায় উল্লেখ করেছেন বামপন্থী বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদ হীরেন মুখোপাধ্যায় ব্যক্তিগত চিঠিতে। যাঁদের কথা এখানে বলা হয়েছে, তাঁরা সবাই সমাজবাদী চেতনার মানুষ এবং পাকিস্তানি কুশাসকদের বিরুদ্ধবাদী। ফয়েজ আহমদ ফয়েজ বারকয়েক বাংলাদেশে এসেছিলেন, কিন্তু অন্যরা সম্ভবত আসেননি, তবে তারা ছিলেন বাঙালি প্রগতিবাদী চেতনার সঙ্গে এক কাতারে, এমনকি তারিক আলীও।
এদের সূত্র ধরেই আরো দু-একজন পাকিস্তানির কথা বলতে চাই, যাঁরা পাকিস্তানি হয়েও বাঙালির শুভাকাঙ্ক্ষী, শুধু কথায় নয়, কাজেও। আজকের এ লেখার নেপথ্য কারণ পাকিস্তানি অপশাসন বা পাকিস্তানি সমাজের রক্ষণশীলতা নিয়ে সমালোচনার জন্য নয়, বরং কাগজে প্রকাশিত ছোট এক টুকরো খবরের সূত্রে : 'বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চান পাকিস্তানের এয়ার মার্শাল আজগর খান।' খবরটা পড়ে চমকিত হয়েছি এ জন্য যে ষাটের দশকের মধ্যবর্তী সময় থেকে সত্তরের নির্বাচন-পরবর্তী ঘটনাবলিতে আরো কয়েকজনের মতো আসগর খানের ভূমিকা ছিল গণতন্ত্রসম্মত, ইতিবাচক ও যুক্তিবাদিতায় বাংলার পক্ষে।
মেহেদী হাসানের প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই এ জন্য যে আমরাও জানি, পাকিস্তানি সারিক শাসকদের রক্তচক্ষুর তোয়াক্কা না করে এয়ার মার্শাল আসগর খান তাঁর ছোট রাজনৈতিক দল নিয়ে গণতান্ত্রিক সত্য সমর্থন করে গেছেন। বিরল কয়েকজন পাকিস্তানির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি শাসকদের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তাঁর এ ভূমিকা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সুস্পষ্ট বিজয় নস্যাৎ করার বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত বক্তব্যে।
মেহেদী হাসানের প্রতিবেদনেও একই সত্য উঠে এসেছে। তাঁর ভাষায়_'১৯৭১ সালের ৪ মার্চ করাচি প্রেসক্লাবে 'তেহরিক-ই-ইস্তেকলাল' পার্টির প্রধান হিসেবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি (অর্থাৎ আসগর খান) বলেছিলেন : 'সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পাকিস্তান বিপর্যয়ের কাছাকাছি পেঁৗছে গেছে। এ অবস্থা থেকে ফিরে আসতে সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে প্রকৃত অর্থেই ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো বিকল্প নেই।'
ওই সংবাদ সম্মেলনে আসগর খান আরো বলেন : 'পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের ওপর আক্রমণ চালালে আমার যেমন অনুভূতি হতো, পূর্ব পাকিস্তানের ভাইদের জন্যও আমার সেই অনুভূতি হচ্ছে। আমার পূর্ব পাকিস্তানের ভাইদের প্রতি এ আচরণ আর দেখতে চাই না। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে বুঝতে হবে, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও হতাশায় পূর্ব পাকিস্তান এখন ধিকিধিকি জ্বলছে। এখন ক্ষমতায় তাদের বৈধ অধিকার। সে ক্ষমতা তাদের দিতে হবে।'
ওই প্রতিবেদন-মাফিক ক্ষমতা দ্রুত হস্তান্তরের ওপর জোর দিয়ে আসগর খান বলেন 'পশ্চিম পাকিস্তান তো তেইশ বছর দেশ শাসন করেছে এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রচণ্ড ভুগেছে। এখন পূর্ব পাকিস্তান শাসন করবে, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবে। আর এতে পশ্চিম পাকিস্তানকে যদি একটু ভুগতে হয় তো ভুগবে।' একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান সরকারের ক্ষমা চাওয়া নিয়ে বিতর্ক উপলক্ষে ওই সূত্র মতে আসগর খান ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করে বলেছিলেন : 'এটাই হবে ইসলামাবাদের পক্ষে সবচেয়ে সম্মানজনক পথ।'
মেহেদী হাসানের প্রতিবেদন বাদ দিয়েই একাত্তরের সংকটময় দিনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বিদেশি পত্রপত্রিকায় পশ্চিম পাকিস্তানের গণতন্ত্রমনা রাজনীতিকরা ভুট্টো ও সেনা কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রের বিরোধী।
মধ্যপ্রাচ্যে বালুচ নেতা আকবর খান বুপতি, মাহমুদুল হক উসমানি, এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান ও পাখতুন নেতা ওয়ালি খানের মতো রাজনীতিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে অনুরোধ করেছেন, নির্বাচনে জয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। তাঁরা, বিশেষ করে আসগর খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর উচ্চাভিলাষী চক্রান্তের বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক করে দেন। এমনকি ভুট্টোর ষড়যন্ত্রমূলক দ্বিভাজিত পাকিস্তান ও দুই গণপরিষদের প্রস্তাবের বিপদ সম্পর্কেও আসগর খান, ওয়ালি খান আওয়ামী প্রধানকে হুঁশিয়ার করে দেন।
সম্প্রতি বর্তমান সরকার একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিদেশিদের অবদান খতিয়ে দেখে, তাঁদের সম্মাননা দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে যুক্তিসংগত। এ সিদ্ধান্ত এক-দুই দশক আগে হলেই বরং ভালো হতো, বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী অনেককেই জীবিত পাওয়া যেত। দেরিতে হলেও এটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ উদ্যোগে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খানের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত বলে মনে করি। কারণ বাঙালির ওই দুঃসময়ে সামান্যসংখ্যক বিদেশি বাঙালির পক্ষে সমর্থন জানাতে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। আর পাকিস্তানের বিশিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক নেতার পক্ষে এ কাজ অসম্ভবই ছিল। সে ক্ষেত্রে আসগর খানের 'নির্ভয় ভূমিকা' অবশ্যই স্বীকৃতিযোগ্য, বিশেষ করে যখন ৯০ বছর বয়সী এই সারিক-রাজনীতিক নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে আগ্রহী।
তাঁর এ আগ্রহের প্রতি আমাদের সম্মান জানানো উচিত যথাযথ স্বীকৃতির মাধ্যমে, বিশেষ করে আরো এ কারণে যে তাতে পাকিস্তানের বাঙালিবিরোধী শাসক ও নাগরিকদের জন্য এক ধরনের শিক্ষার পথ তৈরি হবে_উদাহরণ হিসাবে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে হয়তো আবেদন করেননি, বিষয়টি সম্বন্ধে পূর্বাহ্নে নিশ্চিত হওয়ার জন্য। তাই তাঁর কাছে সম্মতিসূচক বার্তা পাঠাতে পারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তিনি আবেদন না করলেও প্রেস মাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর ইচ্ছায় আমাদের সম্মতি থাকা উচিত। সেই সঙ্গে দুঃসময়ের সমর্থক জীবিত অন্য দু-একজন পাকিস্তানির নামও বিবেচনায় আসতে পারে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা ভেবে দেখতে পারে।
প্রসঙ্গত একজন বাংলাদেশপ্রেমী সামরিক কর্মকর্তার নাম পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তিনি আইয়ুব শাসনে পূর্ববঙ্গের গভর্নর লে. জেনারেল আযম খান। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অক্টোবর অভ্যুত্থানের (১৯৫৮) পেছনে তাঁর স্বপ্ন ছিল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন। এমন বিশ্বাস নিয়ে তিনি অভ্যুত্থানে যোগ দেন। কিন্তু আইয়ুবকে চিনতে ভুল করেছিলেন তিনি। ঢাকায় এসে দুই পাকিস্তানের বৈষম্য তাঁর নজরে পড়ে, এখানে ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর সার্বিক লক্ষ্য ছিল ঢাকা তথা পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তাঁর চেষ্টা এতই আন্তরিক ছিল যে তাঁর স্বল্পমেয়াদি শাসনে আবেগপ্রবণ বাঙালি তাঁকে 'আপন' করে নেয়। তাঁর জনপ্রিয়তায় ভয় পান আইয়ুব। তৎকালীন ঢাকাই সংবাদপত্রে এর প্রমাণ মিলবে।
ক্রমে নানা বিষয়ে আইয়ুবের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ, যেমন শাসনতন্ত্র নিয়ে, তেমনি রাজনৈতিক কড়াকড়ি নিয়ে। শানতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল_'জনগণের মৌলিক অধিকার ও বিচার বিভাগের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, সেই সঙ্গে রাজনীতির পুনরুজ্জীবন।' সর্বোপরি পূর্ব বাংলার উন্নয়নে তার সক্রিয় ভূমিকা নিয়েও দ্বন্দ্ব। অবশেষে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তারে অনাগ্রহের কারণে দুজনের সম্পর্ক চরম তিক্ততায় পেঁৗছায়। বিরক্ত আযম খান পদত্যাগ করে ক্ষমতার বলয় থেকে সরে দাঁড়ান, অসময় অবসর নিয়ে রাজনীতি থেকেও দূরে থাকেন। তবু সময়ে-অসময়ে বাঙালি সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী কারো কারো সঙ্গে নিজ বাসগৃহে সাক্ষাতে তিনি বরাবর বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহ ও শুভেচ্ছার পরিচয় রেখেছেন। বলা বাহুল্য, এঁরা পাকিস্তানে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। ঢাকায় থাকাকালীন এবং অব্যবহিত পরে আইয়ুবের মতো তাঁর পত্রবিনিময় ইতিহাসমনস্ক বাঙালির অবশ্য পাঠযোগ্য। তাতে বাংলাপ্রেমী ও গণতন্ত্রী আযম খানের পরিচয় মিলবে। মিলবে নির্ভয়ে আইয়ুবকে মোকাবিলার পরিচয়। আযম খান আমৃত্যু বাংলাদেশের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিত।
সব শেষে স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অধিনায়কের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ঢাকার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার সাহসী ঝুঁকি নিয়েছিলেন যুদ্ধের যে পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লে. জেনারেল জ্যাকব, সম্মাননা অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
লেখক : ভাষা সংগ্রামী, কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক

No comments

Powered by Blogger.