কক্সবাজারে সৈকতের সীমানা নির্ধারণ-উচ্ছেদের জন্য ৭০০ স্থাপনা চিহ্নিত by আব্দুল কুদ্দুস

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কক্সবাজারে প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ‘কক্সবাজার সৈকতের সীমানা নির্ধারণ কমিটি’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমানার মধ্যে প্রায় ৭০০ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে।


এখন এগুলো উচ্ছেদে পদক্ষেপ নেবে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলায় প্রায় ৪০০, উখিয়ায় ১০০, রামুতে ১০০ ও টেকনাফে ১০০ স্থাপনা রয়েছে। উচ্ছেদ তালিকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ডসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অনেক স্থাপনাও রয়েছে।
সীমানা নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, চার মাসের বেশি সময় ধরে সরেজমিনে কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার সৈকত পরিদর্শন করে ওই সীমানা নির্ধারণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এখন সৈকত ও বালুচরে তৈরি সব স্থাপনা উচ্ছেদ করে সীমানা খুঁটি পুঁতে দেওয়া হবে। যেন আর কেউ সৈকত দখল করে কোনো ধরনের স্থাপনা তৈরি করতে না পারে।
জসিম উদ্দিন আরও জানান, নাজিরারটেক থেকে সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন ঝাউবাগান এবং লাবণী পয়েন্টের হোটেল কল্লোলের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া সড়ক ও কলাতলী-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাইরে (পশ্চিমে) সমুদ্র থেকে ৫০০ গজের মধ্যের সব স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝাউবাগান, বালিয়াড়িসহ জোয়ারের সর্বোচ্চ সীমাকে সৈকত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত বছরের ১০ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মো. জাকির হোসেনের একটি বেঞ্চ সাত দিনের মধ্যে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সব স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ এবং তিন মাসের মধ্যে সৈকত এলাকার সীমানা নির্ধারণ করতে জেলা প্রশাসককে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। এরই ভিত্তিতে গঠিত কমিটি সৈকতের সীমানা নির্ধারণ করেছে। কমিটিতে বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ, ভূমি অফিস, গণপূর্ত, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সদস্য হিসেবে ছিলেন।
সীমানা প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের লাবণী পয়েন্টের সৈকত ও বালুচরে তৈরি করা পাঁচতলা পুলিশ ফাঁড়ি, দোতলা সিটিসেল টাওয়ার, তিনতলা জেলা পরিষদ মার্কেট ও তিনতলা দুটি বিচ চেঞ্জিং রুম কাম বাংলো, আধুনিকমানের রেস্টুরেন্ট কয়লা, বন বিভাগের দুটি বিশ্রামাগার, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর দুটি বাংলো ও ঊর্মি রেস্টুরেন্ট, ব্যক্তিমালিকানাধীন হোটেল, রেস্তোরাঁ, চিংড়ি হ্যাচারিসহ প্রায় ৭০০ স্থাপনা উচ্ছেদ তালিকায় স্থান পেয়েছে।
২০০৮ সালে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে বিশাল খাসজমি দখল করে সেখানে তৈরি করা হয় শতাধিক দোকান নিয়ে ‘সৈকত ঝিনুক মার্কেট’। এর উত্তর পাশে বিশাল খাসজমিতে ৫৪টি দোকান নিয়ে গড়ে ওঠে ‘মহাজোট মার্কেট’। এসব দোকানপাটও উচ্ছেদ তালিকায় রয়েছে।
সরকারি জমি দখল করে বাংলো তৈরি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজারের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও সৈকত সীমানা নির্ধারণ কমিটির সদস্য বিপুল কৃষ্ণ দাশ বলেন, ‘উচ্ছেদ তালিকায় বন বিভাগের দুটি রেস্টহাউস ছাড়াও পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন দপ্তরের বহু স্থাপনা পড়েছে। অন্যরা যদি স্থাপনা সরিয়ে নেয়, তবে আমরাও বিরোধিতা করব না।’
জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সেলিম মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সৈকতে ভ্রমণে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সরকার থেকে ইজারা নিয়ে ওই জমি ব্যবহার করছে পুলিশ। এখন এই ফাঁড়ি উচ্ছেদ করলে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।’
সৈকতের জমিতে বাংলো ও রেস্টুরেন্ট তৈরি প্রসঙ্গে কক্সবাজার ১৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অপারেশনাল অফিসার মেজর এম এ রকিব জানান, ‘ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা নিয়ে সৈকত তীরে রেস্টহাউস ও রেস্তোরাঁ তৈরি করা হয়েছে। এখন এসব উচ্ছেদ করতে হলে ওপরের সিদ্ধান্ত লাগবে।’
সৈকত ঝিনুক মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির নেতা জহিরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে একসনা ইজারা নিয়ে এই মহাজোট মার্কেট তৈরি করা হয়েছিল। এখন এসব দোকান উচ্ছেদ করলে কয়েক হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জয়নুল বারী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ হয়েছে। এখন সীমানা খুঁটি পুঁতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উচ্ছেদের কাজ শুরু করা হবে।’

No comments

Powered by Blogger.