জুবায়ের হত্যাকাণ্ড ও আমাদের দায়িত্বহীনতা-জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় by আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া

জাতি গঠন থেকে শুরু করে সুসভ্য মানবজাতি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ই ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্র যখন অন্ধকারে নিপতিত হয়, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পথ দেখায়। তাহলে আমরা কেন এ দায়ভার থেকে পিছিয়ে থাকব? রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমরা যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছি সেখান থেকে ফিরে আসার জন্যই আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর
অনুসন্ধান জরুরি সম্প্রতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা অঘটন দেখা যাচ্ছে।


এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়েরকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সেখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিক্ষুব্ধতা। এসব কিছু নিয়ে আমরা হতাশ, বিমূঢ়। তাহলে কি আমাদের আশ্রয়স্থল বলে আর কিছুই থাকল না? এ প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর আমার জানা নেই। তবে এটুকু বুঝতে পারি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক কঠিন সময় পার করছে। এ সংকটের সঙ্গে আমাদের জাতীয় রাজনীতির ক্ষুদ্রতা কোনো অংশেই কম দায়ী নয়। আমরা লক্ষ্য করে দেখব, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা খুব জরুরি হয়ে পড়ে। এই আধিপত্য বিস্তারে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিটি আরও কদর্য চেহারা পায়। কর্তৃপক্ষ হওয়ার বাসনায় আমরা শিক্ষকরা রাজনীতিবিদদের কাছে ধরনা দিই। দলীয় মদদপুষ্ট ছাত্ররা হলগুলো দখল করে নেওয়ার মহড়ায় নামে। এই মহড়ায় কোন গ্রুপের কতটুকু শক্তি রয়েছে তা প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় গোষ্ঠীস্বার্থ আর এটিই তাদের মধ্যে দল, উপদল সব মিলিয়ে সৃষ্টি করে কোন্দল। জুবায়ের হত্যাকাণ্ডটি এরই পরিণতি।
জুবায়ের হত্যাকাণ্ডটিকে নিছক একটি হত্যা বললে কম বলা হবে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আমাদের শিক্ষকরা, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার মসনদে বসে আছেন, তাদের দায়দায়িত্বও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের নামে হত্যাকাণ্ড হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক হত্যার নামে যেসব হত্যাকাণ্ড হয় বরাবরই সেসব হত্যাকাণ্ডের আইনি কোনো বিচার হয় না। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় খুনিরা। তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না, হাজতবাস করতে হয় না। বরং অনেক সময় তারা পুরস্কৃত হন, দলীয় নেতৃত্বে বেশ পাকাপোক্ত আসন পেয়ে যান। এই হলো হত্যাকারীদের জন্য পুরস্কার। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কাঠামোর সমীকরণগুলোও এতে যুক্ত হয়। জুবায়ের হত্যাকাণ্ডে আমরা এটা তীব্রভাবে প্রত্যক্ষ করেছি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ এবং উপাচার্যের ক্ষমতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাভ-লোকসানের হিসাব-নিকাশ থেকেই এর যাত্রা শুরু। অনিয়মতান্ত্রিকভাবে উপাচার্য হওয়ার পর থেকেই তিনি দুটি বিষয়ে খুব মনোযোগ দিয়েছিলেন_ প্রথমত, ছাত্রলীগের ওপর তার অবাধ আধিপত্য বিস্তার করা; দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডেমোক্রেটিক ফোরাম, যেমন সিনেট, সিন্ডিকেট, ডিন এবং শিক্ষক সমিতিতে কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য গণনিয়োগ। শুরুতে তিনি হোঁচট খেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ কমিটি তার সব মতের সঙ্গে একমত হয়নি। তারাও টেন্ডারের অংশীদারিত্ব চায়, নিয়োগ এবং ছাত্রভর্তিতে ক্ষমতা কাঠামোর সুযোগগুলোতে ভাগ বসাতে চায়। উপাচার্য যে একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন, ছাত্রলীগের তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি তাতে বাদ সাধে। সংকটের প্রাথমিক উৎসটি এখানে অন্তর্নিহিত। তারপর ছাত্রলীগের একপক্ষ কর্তৃক আরেক পক্ষকে হলের ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া, হামলা-পাল্টা হামলা এবং পুলিশের পক্ষপাতিত্বমূলক উপস্থিতি_ এসবই সে সময় মঞ্চস্থ নাটকের উপকথা। পরিশেষে ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত, সেই কমিটির অনেকের ছাত্রত্ব বাতিল, বহিষ্কার এবং তদস্থলে গোপালগঞ্জ এবং শরীয়তপুরের (উপাচার্য নিজেও গোপালগঞ্জবাসী) কাউকে কাউকে দিয়ে ছাত্রলীগের কার্যক্রম চালানোর দায়িত্ব প্রদান। এসবের নেপথ্যে উপাচার্য প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং পর্যবেক্ষণে আমরা তা-ই জানতে পেরেছি।
জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের মূল গল্পটি কিন্তু এখানেই অন্তর্নিহিত। সময়ের পালাবদলে জুবায়ের কারও কারও প্রতিপক্ষ হয়ে যায়, সেই প্রতিপক্ষরাই তাকে পরীক্ষা শেষে ফেরার পথে কলাভবনের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যায়। নির্মাণাধীন ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পেছনে তাকে নৃশংসভাবে পেটানো হয়। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ইউনাইটেড হাসপাতালে জুবায়েরের মৃত্যু হয়। গোটা ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের দায়ভার নিয়ে প্রশ্ন আসছে। শিক্ষক সমাজের ব্যানারে শিক্ষকরা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা যে দাবিটি করছেন তাহলো, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পৃক্ততা। আমি বলব, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রশাসন প্রথম সম্পৃক্ত হয়েছে ছাত্রলীগের কোন্দলকে ত্বরান্বিত করে একটি গ্রুপকে ক্যাম্পাসছাড়া করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়। অন্যটি জুবায়েরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যর্থতা থেকে।
আশা করি, সরকার গোটা বিষয়গুলো অনুসন্ধানে উদ্যোগী এবং উদ্যমী হবে। তাহলে হয়তো ঘটনার অন্তরালের অনেক ঘটনা আমরা জানতে পারব। অন্তত একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য এ সত্যগুলো জানা খুবই জরুরি।
আর জ্ঞান তো সত্যকেই আবিষ্কর করে। সেই বিজ্ঞানই হোক আর সমাজবিজ্ঞানই হোক। সব বিজ্ঞানেরই কাজ হলো সত্য প্রতিষ্ঠা করা। নিজেদের গায়ে বিজ্ঞানীর তকমা লাগিয়ে সত্য আবিষ্কারে গড়িমসি করা, সত্য প্রতিষ্ঠায় যেসব শিক্ষক আন্দোলনে রয়েছেন তাদের সম্পর্কে কটূক্তি করা অবৈজ্ঞানিক আচরণ করার শামিল। এ ধরনের ক্লেমোফ্লেজিং থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের আরও বেশিমাত্রায় গণতান্ত্রিক হওয়াও জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মজীবী হিসেবে বুঝি, উপলব্ধি করি প্রশাসনের কর্তা হওয়ার পর আমরা এই শিক্ষকরাই কতটা অশিক্ষক হয়ে যাই, অগণতান্ত্রিক হয়ে যাই।
বিশ্ববিদ্যালয় তো মৃত্যু উপত্যকা নয়। এ জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান নির্মাণের জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু ডিগ্রি বিতরণ নয়। বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং নৈতিক মানুষ সৃষ্টি করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস পাঠ করলেই আমরা তার কাজের কথা বুঝে নিতে পারি। পেল্গটো যে আদর্শ রাষ্ট্রের কথা ভেবেছিলেন তার সঠিক বাস্তবায়নের জন্যই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'একাডেমী', এরিস্টটল তার যুক্তিবাদকে বিস্তৃত করতে চেয়েছেন লাইসিয়ামের মাধ্যমে। আমাদের এলাকার তক্ষশিলা এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্পিরিটও ছিল ন্যায় ও যুক্তিবাদী মানুষ সৃষ্টি করা। পশ্চিমের অক্সফোর্ড, উপসালা ও কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ও ইতিহাসের এ দায়ভারই গ্রহণ করেছিল। পশ্চিম আজকে যে এনলাইটমেন্টের কথা বলে, রেনেসাঁসের কথা বলে তাও কিন্তু ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত পণ্ডিত ব্যক্তিদেরই অবদান। এসব কিন্তু পলিটিশিয়ানদের হাত ধরে সম্পন্ন হয়নি। তা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পণ্ডিত এবং দার্শনিকদের প্রচেষ্টায়ই। জাতি গঠন থেকে শুরু করে সুসভ্য মানবজাতি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ই ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্র যখন অন্ধকারে নিপতিত হয়, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পথ দেখায়। তাহলে আমরা কেন এ দায়ভার থেকে পিছিয়ে থাকব? রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমরা যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছি সেখান থেকে ফিরে আসার জন্যই আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান জরুরি।

আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.