ইতিউতি-ছোট হয়ে আসছে বাংলাদেশের পৃথিবী by আতাউস সামাদ

দীর পানির হিস্যা, নদীতে প্রবাহ বাড়ানো, সীমান্ত নদীর ধারা এবং সমুদ্রসীমা_এ বিষয়গুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশ চালাচ্ছিলেন অর্থাৎ আমরা স্বাধীন হওয়ার প্রায় পরমুহূর্ত থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।


সমস্যা ও বিরোধগুলোর কিছু ছিল পাকিস্তানি শাসনামল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আর কিছু ছিল নতুন। যেমন_ভারত গঙ্গার পানি কলকাতা বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফারাক্কায় বাঁধ বানানো শুরু করেছিল ১৯৭১ সালের আগেই। পাকিস্তান সরকার এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল, যদিও এই সমস্যা সমাধানের জন্য তারা বিশেষ তৎপর ছিল না। তিস্তার পানি নিয়েও স্বাধীনতা-পূর্ব আমলে কথাবার্তা শুরু হয়েছিল। তবে দুটি সমস্যাই তীব্র আকার ধারণ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। আবার তালপট্টি দ্বীপটি কার এবং সমুদ্রসীমা কিভাবে টানা হবে_এ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত বিরোধ শুরু হয় শেখ মুজিব আমলে। কেননা বঙ্গবন্ধু তখন বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে গ্যাস ও তেল তোলার ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ এই উদ্যোগ নেওয়ার সময়ই প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে আপত্তি তোলে, এমনকি তারা তখন বাংলাদেশকে বাধা দেওয়ার জন্য তাদের নৌবাহিনীর জাহাজও পাঠিয়েছিল। আবার গঙ্গা নদীর পানির হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলতে থাকার মধ্যেই ভারত সরকার ফারাক্কা বাঁধ তৈরির কাজ শেষ করে। এরপর তারা একটুও কালক্ষেপণ না করে বাঁধ প্রকল্পের ফিডার ক্যানালটি চালু করা অত্যাবশ্যক_এই দাবির ভিত্তিতে বাঁধটি দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে একটা অংশ তাদের দিকে নিয়ে যায়। ফিডার ক্যানালটি চালু করার আগে ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে মাত্র এক মৌসুমে পানি ভাগাভাগির ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সিদ্ধান্ত হয় ঢাকায়। তারপর থেকে তিনবার চুক্তি করেও পদ্মা (বাংলাদেশে গঙ্গার নাম) নদীতে পানির অভাবের সমস্যা আর মিটল না।
বাংলাদেশ ও ভারত বহুবার একমত হয়েছে যে দুই দেশের জন্য প্রয়োজনীয় পানি পেতে হলে গঙ্গা নদীর প্রবাহ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ বলেছে, নেপালে পাহাড়ি এলাকায় বাঁধ দিয়ে বর্ষার পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে তা ছেড়ে দিলে গঙ্গা অর্থাৎ পদ্মার পানির ঘাটতি মিটবে। কিন্তু ভারত তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রস্তাব মানতে নারাজ। নয়াদিলি্ল সরকারের প্রস্তাব হলো, ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে গঙ্গার সংযোগ করে দিলেই সমস্যা মিটে যাবে। এ জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে একটা খাল কাটতে হবে। তবে ব্রহ্মপুত্রের যেখান থেকে এ খাল শুরু হবে তা থাকবে ভারতের আসামে আর গঙ্গার যেখানে যুক্ত হবে, তা হবে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কার উজানে।
মানচিত্রের দিকে একনজর দেখলেই বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না যে প্রস্তাবিত এই আন্তনদী আন্তরাষ্ট্রীয় সংযোগ খালটি বাংলাদেশের জন্য হবে একেবারেই গলার ফাঁস। এ খালে পানি প্রবাহের ওপর বাংলাদেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, কারণ এর শুরু ও শেষ হবে ভারতে। অন্যদিকে খাল তৈরির জন্য যে মানুষ ও জমির ক্ষতি হবে তার প্রায় সবই ঘটবে বাংলাদেশে। তাই খুব যুক্তিসংগতভাবেই বাংলাদেশের কোনো সরকার ভারতের সংযোগ খাল প্রস্তাব মেনে নেয়নি। আর ভারতও আমাদের পদ্মার পানির প্রবাহ বাড়ায়নি। শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে গঙ্গার পানি বাটোয়ারার যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয় বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে সর্বনিম্ন প্রবাহের সময় সেই অনুযায়ী পানি পায়নি। ইতিমধ্যে তিস্তা নদীতেও পানি স্বল্পতা নিদারুণ রূপ নিয়েছে। গত শুকনো মৌসুমে আমাদের তিস্তা ব্যারাজ বলতে গেলে চালানোই যায়নি। এখানে মনে রাখা দরকার, পদ্মার পানিনির্ভর গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প কয়েক বছর ধরে আর কাজ করে না পদ্মার পানি তলানিতে ঠেকে যাওয়ার দরুন। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি চুক্তি স্বাক্ষর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির জন্য আটকে যাওয়াটা একটু বেশিই দুঃখজনক। দেখা যাক, অদূর-ভবিষ্যতে কী হয়।
তবে আমি বেশ অবাক হচ্ছি এবং দুঃখও পাচ্ছি যে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর ও তার অববাহিকার যে করুণ দশা হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ভারতের কাছে এ বিষয়ে কিছু বলছি না এ জন্য। সত্তরের দশকে ভারতের সঙ্গে নদীর পানি বিষয়ে আলোচনাগুলোতে বেশির ভাগ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রয়াত প্রকৌশলী বি এম আব্বাস এটি। গঙ্গার পানি বিরোধ সম্পর্কে তাঁর লেখা বইতে আছে, একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে নির্দেশ দেন যে ভারত গঙ্গা থেকে পানি সরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হবে, তা সামাল দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভেতর গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করতে হবে এবং সেটি তৈরি করার টাকা বাংলাদেশকে দেবে ভারত ক্ষতিপূরণ হিসেবে। এই দাবি তিনি যেন তোলেন। বঙ্গবন্ধু যখন সেই ১৯৭৪ বা ১৯৭৫ সালে ক্ষতিপূরণের কথা তুলেছিলেন, তাহলে এখন আমরা কেন সেই কথাটি জোর করে বলতে পারব না? এ ক্ষেত্রে আমরা ছাড় দেব কেন?
তিস্তার পানি বেশি করে পাওয়ার দাবি তুলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন যে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর কোনো বিদ্বেষ নেই, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তার পরও তাঁকে তো তাঁর 'রাজ্যে'র মানুষের স্বার্থ দেখতে হবে। ফারাক্কা বাঁধের জন্য বাংলাদেশে যে বিস্তর ক্ষতি হচ্ছে তা তো এখন খালি চোখেই দেখা যায়। তাই এই ক্ষতি সামাল দিতে যা যা করতে হবে তার খরচটা ভারতের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে চাওয়া হোক। আমাদের সরকারকেও তো বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ দেখতে হবে। আর পদ্মা অববাহিকা, এটা তো শুধু স্বার্থরক্ষার ব্যাপার নয়। এটা তো মানুষ ও প্রকৃতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। এখানে যা করা দরকার তা করতে লজ্জা পাওয়া বা দ্বিধান্বিত হওয়া আর আত্মহত্যা করা এক কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পদ্মা নদী নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করলে ভালো হয়। আরেকটা কথা, নদী নিয়ে চিন্তাভাবনা ও কাজ যা করতে হয় তা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কেই করতে দেওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রীর আমলা বা হঠাৎ বিদেশ থেকে ফেরা উপদেষ্টারা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রসঙ্গে সহযোগী ভূমিকা পালন করবেন। তাঁরা মুখ্য চরিত্রে থাকতে পারেন না। তাঁদের সেই ভূমিকা দেওয়া মারাত্মক ভুল।
আমরা খুব ভয় পাচ্ছি যে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের এক অংশ থেকে অন্য অংশে মালামাল পরিবহনের জন্য দিলি্লর কেন্দ্রীয় সরকার ও সে দেশের প্রাদেশিক সরকারগুলো 'ট্রানজিট' পাওয়ার জন্য যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে এবং বর্তমান বাংলাদেশ সরকার তাদের সঙ্গে যতটুকু এগিয়েছে, তার পরিণতি আমাদের জন্য না ভয়াবহ অমঙ্গল ডেকে আনে কোনো দিক থেকে। এ বিষয়ে ভারতের চাপাচাপি এবং বাংলাদেশ কিছুটা নতি স্বীকার করার প্রমাণ মেলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফর নিয়ে দুই দেশের যৌথ বিবৃতির ৪১তম প্যারাগ্রাফে এবং দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত সহযোগিতার জন্য কাঠামো চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে। যৌথ বিবৃতিতে দুই প্রধানমন্ত্রী অতি শিগগির ট্রানজিট-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। কাঠামো চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী ট্রানজিট-ব্যবস্থা তৈরির কথা বলা আছে। আর তা হবে আমরা মনে করি এমনভাবে, যাতে ভারত তার নিজস্ব বাহন বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ব্যবহার করতে পারে।
প্রশ্ন হলো, তাহলে এ ব্যবস্থায় আমরা কোথায় থাকছি? এখানেও কী প্রস্তাবিত নদী সংযোগ খালের মতো কোনো ফাঁস তৈরির কোনো গোপন পরিকল্পনা আছে? আমাদের সরকার কি সব কিছু খতিয়ে দেখছে?
সহযোগিতার জন্য কাঠামো চুক্তিতে আমরা বারবার উপ-আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার উল্লেখ দেখতে পাচ্ছি অথচ এত দিন জেনেছি যে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী এবং সেগুলোকে মঙ্গলজনক মনে করে। আমরা কি তাহলে আমাদের দুনিয়াটাকে ছোট করে আনছি? ওই সহযোগিতা কাঠামো চুক্তিতে উপ-অঞ্চল হবে কোন কোন দেশ বা এলাকা নিয়ে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি কেন? তা কি এ জন্য যে তিন দিকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশ যাতে একসময় কেবল ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশের কথা ভাবতে না পারে সে জন্য? ভারতকে করিডর ধরনের ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ৫০ বার চিন্তা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মানুষ তা করতে শুরু করেছে। এখন প্রশ্ন, শেখ হাসিনার সরকার দেশের মানুষের সঙ্গে চলবেন, না একলা হেঁটে নিঃসঙ্গ হবেন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

No comments

Powered by Blogger.