তারুণ্যের রাজনীতি-ডাক পড়েছে, কিন্তু ন্যাড়া আবার বেলতলায় যাবে? by ফারুক ওয়াসিফ

রুণদের আবার ডাক পড়েছে। গত নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ যত্ন করে তাদের ডেকেছিল—সেই ডাক বিফলে যায়নি। ভোটারদের বেশির ভাগই ছিল তরুণ এবং তাদের ভোটেই মহাজোটের মহাবিজয় হয়েছিল। কিন্তু সেই বিজয়ের সুফল তারা পায়নি। সন্ত্রাস-দখলদারির শিক্ষাঙ্গন, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, তরুণী-নিগ্রহসহ নানাবিধ সমস্যা তাদের অনেককেই পেরেশান করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের ভরসা দিতে পারছে না।


এরই মধ্যে আবার তাদের ডাক পড়েছে। এবারের ডাকনেওয়ালা বিএনপি নেতারা। গত ১৫ অক্টোবর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম বিডিনিউজ ২৪ ডটকম-এ ‘প্রিয় তরুণ প্রজন্ম’ শিরোনামে একটি মনগলানো লেখা লেখেন। এই লেখার আবেদন একটাই—হে তরুণ, ভবিষ্যৎমুখী দল হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করে দেশ গঠনে শামিল হোন। মহৎ আবেদন সন্দেহ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশ আর ঘরে ঘরে চাকরির প্রতিশ্রুতি যখন কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে, তখনই তো নতুন প্রতিশ্রুতির ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাকের সুবর্ণ সময়।
অন্যরাও বসে নেই। ফেসবুক প্রজন্মের মধ্যে সাড়া জাগাতে নেমেছেন বিকল্পধারা দলের অন্যতম নেতা মাহী বি. চৌধুরী। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি নেতা এবং বিকল্পধারার সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পুত্র। পুত্র পিতার পদাঙ্কই অনুসরণ করছেন, কোনো নতুন প্রস্তাব বা রূপরেখা তাঁর ঝুলিতে নেই। গত শুক্রবার রাজধানীর বনানী মাঠে ফেসবুক-ভিত্তিক তরুণদের একাংশকে নিয়ে ‘ব্লু ব্যান্ড কলে’র ব্যানারে তাঁরা সমাবেশ করেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা রাজনৈতিক আন্দোলন, তবে কোনো দলীয় আন্দোলন নয়’ (প্রথম আলো, ৩ ডিসেম্বর)। তাঁরা প্রধান দুটি দলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ‘হয় সমঝোতা নয় অবসর।’ দলের নামে হোক বা সমিতির নামেই হোক, যে কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাব বা তাৎপর্য আছে, সেটাই তো রাজনৈতিক আন্দোলন। মাহী বি. চৌধুরী স্বয়ং একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং অতীতে তাঁর সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র মহাসচিব তারেক রহমানের সখ্যের কথাও অজানা নয়। বিটিভির অনুষ্ঠান সংক্রান্ত ব্যাপারে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও সুবিদিত।
তাহলে কী দাঁড়াল? তরুণদের যাঁরা ডাকাডাকি করছেন, তাঁদের রেকর্ডও মোটেই তরুণবান্ধব নয়। তবু তাঁদের এটা করে যেতেই হবে। কারণ, তরুণেরা বর্তমান বাংলাদেশে রাজনীতির ধ্রুব ফ্যাক্টর বা এক্স ফ্যাক্টর হিসেবে হাজির হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রথমবার ভোটার হওয়া তরুণেরাই ছিলেন মোট ভোটারদের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের একভাগও ১৫-৩৪ বছর বয়সী তরুণ। ভোটারের অনুপাত আর জনসংখ্যার অনুপাতে তরুণদের এই প্রাধান্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তারুণ্য নামক মিথের রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক ব্যবহারও তাই থেমে নেই। কিন্তু এক বেলতলায় ন্যাড়া ক’বার যাবে?
আধুনিক ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তরুণদের উঠে দাঁড়ানোর নজির অঢেল। ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসের প্রধান চরিত্র এই তারুণ্যই। সম্প্রতি আরব জাগরণ থেকে শুরু করে ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনও মূলত তাদেরই সৃষ্টি। রাজনীতির কলাকুশলীরা এ ব্যাপারে ভালোভাবেই হুঁশিয়ার। কিন্তু কেউ কি খোঁজ করেছে যে তরুণেরা কি চায়? তাদেরও তো শ্রেণী অবস্থান আছে, আছে সচ্ছল বা অসচ্ছল পিতা-মাতা-ভাই-বোন। সমাজ-বাস্তবতার বাইরের তরুণ বিজ্ঞাপনে মিলতে পারে, জীবনে মিলবে না। তরুণদের পারিবারিক অবস্থানের উন্নতি ছাড়া, তাদের শিক্ষা-কর্মসংস্থান ও মানসিক নিশ্চয়তা ছাড়া সুন্দর সুন্দর কথা বলা এক ধরনের হাওয়াই মিঠাই, স্পর্শেই যা মিলিয়ে যায়।
গত বছরের জুন মাসে ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের তারুণ্যের ওপর নেক্সট জেনারেশন নামে একটি জরিপ প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী ৯৮ শতাংশ তরুণই সমাজসেবায় আগ্রহী। অন্যদিকে তাদের ৭৪ শতাংশই রাজনীতির প্রতি উদাসীন। যে সমাজসেবায় ইচ্ছুক, তার তো রাজনীতির প্রতি বিরাগ থাকার কথা নয়! তাহলেও বিরাগটা থাকার অর্থ, সমাজের মঙ্গলকারী রাজনীতি তাদের সামনে হাজির নয় বা থাকলেও তারা তা দেখতে পাচ্ছে না। বিদ্যমান রাজনীতি ও অর্থনীতি সুযোগ ও সম্ভাবনার দুয়ার যেভাবে আটকে রাখে, তাতে তারা এতই হতাশ যে জরিপ বলছে, উন্নত জীবনের জন্য তাদের ৪১ শতাংশই সুযোগ পেলে দেশ ছাড়ার প্লেনে সিট পেতে চাইবে। যে দেশের মাটিতে লাখো তরুণ মুক্তিযোদ্ধার কবর, যে দেশের ইতিহাসের ধাপে ধাপে তরুণের রক্তদানের দাগ, সেই দেশের প্রায় অর্ধেক তরুণের চোখে প্রবাসই প্রিয় হয়ে ওঠা দিনবদলের স্লোগানের এক মর্মান্তিক পরিহাস। ওই জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৩০.৫ শতাংশ রাজনীতিতে জড়াতে চায়। সমানসংখ্যক তরুণই আবার রাজনীতিতে অনাগ্রহী। তার মানে বিদ্যমান রাজনীতি নিয়ে তরুণেরা দ্বিধাবিভক্ত। একই সঙ্গে ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্লগসহ তরুণদের জমায়েতের ভাষা পড়লে বোঝা যায়, দেশের জন্য কিছু একটা করার ষোলোআনা আগ্রহ তাদের মনকে চঞ্চল করে।
সত্যি হলো, তরুণদের বড় অংশই বিদ্যমান রাজনীতিতে ক্ষমতাহীন এবং অর্থনীতিতে পরিত্যক্ত। দেশের হালচাল না বদলালে ২০২০ সালের মধ্যে একাত্তরের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করবে। তাদেরও বড় অংশ হবে তরুণেরা। এদের উপেক্ষা করে চলা বেশি দিন সম্ভব নয়, সাম্প্রতিক লন্ডন রায়ট এবং আরব জাগরণে তরুণদের উত্থান তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত আজকের সমাজ ক্রেতা সমাজ। এ সমাজে ক্রয়ক্ষমতাই সুখী হওয়ার প্রধান মানদণ্ড। সেই মানদণ্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ অযোগ্য আনফিট। তাহলেও পণ্যকাতর জীবনের হাতছানি তাদেরও ডাকে, তাদের মনেও জমে ব্র্যাণ্ডেড অভিলাষ। শপিং মলের কাচের শোকেসের বাইরে দাঁড়িয়ে অন্তরজ্বলুনি সামলাতে হয় তাদের। কিন্তু কত দিনই বা তাদের কেবল দর্শক করে রাখা যাবে? এ অবস্থা যে দেশে বিরাজ করে, সে দেশের সমাজ হয়ে ওঠে মাইনফিল্ডের মতো—যেখানে মাটির তলায় যত্রতত্র মাইন পোঁতা থাকে। নিশ্চিত থাকতে পারেন, হঠাৎ হঠাৎ কোনো না কোনো মাইন ফাটবেই। কিন্তু কখন কোন জায়গায় কটা মাইন ফাটবে কেউ তা আগাম বলতে পারবে না। মাইন পুঁতে রাখে এক সেনাদল, সেগুলোকে খুঁজে খুঁজে নিষ্ক্রিয় করার জন্য আরেক দল সেনাকে পাঠাতে পারেন। কাজটা বিপজ্জনক। বলা হয়, মাইন-খোদকেরা ভুলের সুযোগ একবারই পায়, কারণ ভুল মানেই মৃত্যু। সামাজিক বৈষম্য যখন সমাজটাকেই মাইনক্ষেত্র বানিয়ে ফেলে, তখন তার হাত থেকেও রেহাই পাওয়া কঠিন। প্রকট বৈষম্য স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনতে না পারলে যতই পুরোনো মাইন নিষ্ক্রিয় করুন, নতুন মাইনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুলাতে পারবেন না। আবার নিষ্ক্রিয় করতে হলেও আপনাকে নামতে হবে সেই মাইনভরা মাঠে। যতই সতর্ক থাকুন না কেন, কোনো না কোনো লুকানো মাইনে আপনার পা পড়বেই। বৈষম্যের মাইন পোঁতা আর তার শিকার হওয়া এক প্যাকেজেরই অংশ।
বাংলাদেশে এখন সাড়ে পাঁচ কোটি তরুণ বিরাজ করছে। এদের প্রায় ১৩ শতাংশ বেকার (ডেইলি স্টার, ১৫ আগস্ট, ২০১০)। এদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই; এদের ৯০ ভাগই জমিতে, কারখানায়, সেবা খাতে আর অল্প আয়ের পেশায় নিয়োজিত। বিএনপি বা আওয়ামী লীগ বা মাহী বি. চৌধুরীরা কি এই তরুণদের ডাকছেন? নাকি তাঁদের লক্ষ্য শহুরে-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সন্তানেরা? ২০০৯ সালের হিসাবে প্রায় ২০ লাখ তরুণ বেকার। প্রায় ৩০ লাখ তরুণ-তরুণী পোশাকশিল্পে শ্রমিকতা করছে, প্রায় ৫০ লাখ তরুণ প্রবাসে চালাচ্ছে জীবিকার সংগ্রাম। মহাজোটের ক্ষমতাসীন হওয়ার বছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ৩৬.৫ শতাংশ, এখন তা হয়েছে ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় চার কোটি মানুষ মানবেতর জীবনে পড়ে আছে, যাদের অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ সাবালক তরুণ-তরুণী। এত বিপুল বিক্ষুব্ধ, হতাশ, ভাগ্যবদলপিপাসু তরুণদের উপেক্ষা করে, সমাজটাকে মাইনফিল্ড বানিয়ে রেখে অর্থবহ বদল কীভাবে সম্ভব?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.