এক যুগের বন্দিদশা থেকে মা ও দুই ছেলের মুক্তি by জে এম রউফ

দুই ভাইয়ের একেকজনের হাত-পায়ের নখ হয়েছে বন্য প্রাণীদের মতো। চুল-দাঁড়ি না কাটায় চেহারা হয়েছে কিম্ভূতকিমাকার। দিনের পর দিন ঘরবন্দি থাকতে থাকতে শরীরও হয়ে গেছে ফ্যাকাসে। একই অবস্থা তাঁদের মধ্যবয়সী মায়ের। গতকাল সোমবার বগুড়া শহরের মালতিনগর চানমারি ঘাট লন এলাকার এক নির্জন বাড়ি থেকে তিনজনকে উদ্ধার করে এলাকাবাসী। এ সময় তাঁদের দেখাচ্ছিল ভীত ও অপ্রকৃতিস্থ।


জানা যায়, স্ত্রী ও দুই ছেলেকে প্রায় ১২ বছর ধরে গৃহবন্দি করে রেখেছেন খোদ গৃহকর্তা আবদুল লতিফ। পরিবারের এক নিকটাত্মীয় স্থানীয় পৌর কাউন্সিলরকে জানালে গতকাল পুলিশের সহায়তা নিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় স্থানীয় সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
উদ্ধার করা ফাতেমা খাতুন (৫৫), এস এম ফজলুল করিম মানিক (২৮) ও এস এম নূরুন্নবী রতনকে (২৫) গতকালই বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। উদ্ধারের পর তিনজনকেই মনে হয়েছে অপ্রকৃতিস্থ। বাড়ির গৃহকর্তা আবদুল লতিফ বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলা খাদ্য বিভাগের অফিস সহকারী ছিলেন। বছর দশেক আগে মানিক কলেজের ও রতন স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন।
উদ্ধার অভিযানকালে দেখা যায়, উঁচু প্রাচীরে ঘেরা একতলা পাকা বাড়িতে মোট তিনটি ঘর। এর মধ্যে দুটি ঘর বাস উপযোগী। সেই দুই ঘরে থাকেন লতিফ ও তাঁর মেয়ে মুক্তা। অপর ঘরে একটি নড়বড়ে খাট। তার ওপর নোংরা কাঁথা-বালিশ। এই ঘরেই থাকতেন মানিক। বাড়ির উত্তরাংশে গ্রিল দিয়ে ঘেরা একটি প্রকোষ্ট; গ্রিলের সঙ্গে কয়েকটি ছেঁড়া কাপড় টাঙানো। সেখানে কোনো বিছানা বা কাপড় নেই। সেই প্রকোষ্টে থাকার জায়গা হয়েছিল ছোট ছেলে রতনের। আর ডাইনিং স্পেসের জন্য ঘরে যে ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে, সেখানে থাকতেন মানিক-রতনের মা ফাতেমা খাতুন। উদ্ধারকালেও মেঝেতে দেখা যায় তাঁর নোংরা কাপড়-চোপড়। জানা যায়, এখানেই চলত তাঁর থাকা-খাওয়া, প্রস্রাব-পায়খানা করা। দুই ছেলে ও তাঁদের মা দীর্ঘদিন গোসলই করেননি। ফলে ঘরজুড়ে ছিল দুর্গন্ধ।
জানা যায়, সমস্যার শুরু বেশ কয়েক বছর আগে। মানিক সরকার তখন পড়েন স্থানীয় শাহ সুলতান কলেজে একাদশ শ্রেণীতে। রতন ছিলেন বগুড়া প্রিক্যাডেট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। এরই মধ্যে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে একদম চুপচাপ হয়ে যান রতন। বাড়ি থেকে বেরোতেন না। ছোট ভাইকে সারাক্ষণ নজরদারি করতে করতে একপর্যায়ে মানিকও ঘরকুনো হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে দুজনই বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন। দুই সন্তান এভাবে নিজেদের বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেও তাঁদের সুস্থ করে তোলার কোনো চেষ্টা করেননি আবদুল লতিফ। বাইরের জগতের কাউকে বিষয়টি বুঝতেও দেননি।
এলাকাবাসী ও আবদুল লতিফের শ্যালিকা বুলি বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফাতেমা বেগম অসুস্থ হন আরো আগে, ১৯৯৯ সালের দিকে। কিন্তু স্ত্রীর চিকিৎসা করাননি আবদুল লতিফ। পরবর্তী সময়ে দুই সন্তানও অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়লে তিনজনকেই বাড়িতে বন্দি করে রাখেন।
আনুমানিক ৬০ বছর বয়সী আবদুল লতিফের সঙ্গে কথা বলেও বোঝা গেছে, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন টোটকা চিকিৎসায়ই স্ত্রী-সন্তান ভালো হয়ে যাবে। গতকালও তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তাবিজ খুলে ফেলার ফলেই তাঁর স্ত্রী ও ছেলেরা সুস্থ হতে পারেনি।
উদ্ধার হওয়ার পর ফাতেমা খাতুন বলেছেন, তাঁদের তিনজনকেই মারধর করা হতো। তেমন খাবার দিতেন না তাঁর স্বামী আবদুল লতিফ। মূলত শুকনো খাবার খেয়েই তাঁদের দিন কাটত।
ফাতেমা খাতুন জানান, নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর মাথার চুলও কেটে দেওয়া হয়। বাড়ির বাইরে যেতে চাইলে বা কোনো কিছু দাবি করলেই চলত নির্যাতন। কখনো কখনো বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হতো তাঁদের। কেরোসিন তেল এনে আগুনে পুড়িয়ে মারারও হুমকি দিতেন আবদুল লতিফ। ফাতেমা খাতুনের অভিযোগ, এসব কাজে সহযোগিতা করত তাঁদের একমাত্র মেয়ে মুক্তা।
বুলি বেগমসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তার বিয়ে হয়েছে। তবে মাঝে মাঝেই তিনি বাড়িতে আনেন। গতকাল উদ্ধার অভিযানকালেও আবদুল লতিফ ও মুক্তা বাড়িতেই ছিলেন। লতিফ সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বললেও মুক্তা একটি ঘরে দরজা বন্ধ করে ছিলেন।
আবদুল লতিফ সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর স্ত্রী চাইতেন না বাইরের কেউ বাড়িতে যাতায়াত করুক। এ কারণে তিনি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি। তবে স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ার পরপরই তিনি চিকিৎসা করিয়েছেন দাবি করে বলেন, পরে তিনজনের কাউকেই ডাক্তার দেখাননি বা হাসপাতালে নেননি। এটি তাঁর ভুল হয়েছে বলে তিনি জানান।
অভিযোগকারী বুুলি বেগম বলেন, তাঁর ভগি্নপতি অসামাজিক ধরনের লোক। এ জন্য তাঁরা তেমন যাতায়াত করতেন না। প্রায় ১০ বছর আগে একবার ওই অবস্থায় দুই ছেলেকে উদ্ধার করে চিকিৎসা করানো হয়েছিল।
স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর সিপার আল বখতিয়ার বলেন, 'অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। আগে দুই ছেলেই সুস্থ ছিল। বড় ছেলেটি স্থানীয় মসজিদে আগে মাঝে মাঝেই আজান দিত। নিয়মিত নামাজ পড়ত। পরে তাদের এলাকায় না দেখে আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো বাইরে থাকে। কিন্তু অভিযোগ পেয়ে বুঝতে পারি তাদের আটকে রেখেছে তাদের বাবা। তাই উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের চিকিৎসা করে সুস্থ করার পর চাইলে তারা এ বিষয়ে আইনের সহায়তা নিতে পারবে। আগে তাদের সুস্থ করতে হবে।'
পৌর কাউন্সিলরের সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে আরো অনেকের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন এলাকার বাসিন্দা আবদুল ওয়াজেদ পুটু। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা বিষয়টি জেনেছেন তিন দিন আগে বগুড়া সদর উপজেলার খামারকান্দি গ্রামের বুলি বেগমের মাধ্যমে। অভিযোগ পেয়ে গতকাল তাঁরা ওই বাড়িতে যান। কিন্তু আবদুল লতিফ শুরুতে তাঁদের ঢুকতেই দেননি। পরে বিষয়টি থানা পুলিশসহ সাংবাদিকদের জানানো হয়।
পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করে বাইরে নেওয়ার পর ঘটনা জানতে পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এলাকার নারী-পুরুষ। তারা এই অমানবিক আচরণের কারণে লতিফ ও তাঁর মেয়ে মুক্তার বিচার দাবি করে। রহিমা আক্তার নামে স্থানীয় এক মহিলা বলেন, 'আসলে এই ছেলেদের হাসপাতালে না নিয়ে বরং তাঁদের বাবাকে সেখানে ভর্তি করানো দরকার। কারণ তিনি নিজেই মানসিক রোগী। যে কারণে বাড়িতে এমন পাগলের কারখানা তৈরি করেছেন।'

No comments

Powered by Blogger.