সাম্প্রতিক : সরকারি ও বিরোধী দলের ব্যর্থতা-সাধারণ মানুষের ভোগান্তি! by শাকিল ফারুক

বাংলাদেশের রাজধানীর নাম কী? উত্তর_ঢাকা, নাকি দক্ষিণ ঢাকা? এ বিষয়ক কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। কারণ সরকার এসব নিয়ে ভাবার সময় পায়নি। হুট করেই মনগড়া সিদ্ধান্তে দ্বিখণ্ডিত করেছে ঢাকা। ঢাকার ৯০টি ওয়ার্ডে এখন কোনো কাউন্সিলর নেই। কাজকর্ম আটকে আছে। নগরবাসী নাকাল হচ্ছে দুর্ভোগে। এসব নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। অথবা এসব বিষয় সরকারের মাথায়ই আসেনি। সিটি করপোরেশনে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই আওয়ামী লীগের এখন উদ্দেশ্য।


ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতারা ইতিমধ্যেই নগরপিতা হওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছেন। আধিপত্য আর প্রভাব বিস্তারের নানা নজরানা তাঁরা প্রদর্শন করে চলেছেন_পত্রপত্রিকায় সেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আর এই প্রভাব দেখাতে গিয়ে অন্তঃকোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। দেশের অবস্থা ইতিমধ্যেই তথৈবচ। যদিও সরকার বেশ জোরালোভাবে দাবি করে চলেছে, দেশ খুব ভালো আছে। কিন্তু যারা নিজেদের দলই সামলাতে পারছে না, তারা দেশ কতটুকু সামলাবে? এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে বটে, তবে তুলে লাভ নেই। উত্তর দেবে কে?

কথা নয়, কাজ চায় জনগণ!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে জোর গলায় বলে থাকেন, তাঁর সরকার এই করেছে, সেই করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা-কর্মীরাও সে কথা বলেন বুক ফুলিয়ে। এই করাকরির বৃত্তান্ত জানানোর অন্তর্নিহিত কারণ নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা। তিন বছরে সরকারের সফলতা যতটা, ব্যর্থতা তার চেয়ে বেশি। এই ব্যর্থতাগুলো মেনে নিয়েই যদি সরকার তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করত তাহলে জনগণও তাদের পাশেই থাকত। কিন্তু সরকার ব্যর্থতাগুলো মুছে দিতে চায় এবং বারবার নিজেদের সফলতার কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করে, জনগণের জন্য তারা অনেক কিছু করেছে। কিন্তু এটা তো বিশেষ পারদর্শিতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। জনগণের সেবা দেশের উন্নয়ন সাধন করা তো সরকারেরই দায়িত্ব। নির্বাচনে জিতে সরকার এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সেই দায়িত্ব পালন করে তো গলাবাজির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু যে দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে কিংবা যে দায়িত্ব তারা ঠিকমতো পালন করছে না তা নিয়ে কথা হতেই পারে। কিন্তু সরকারের সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা নেই।
নিজেদের গুণগান করার এই মানসিকতার কারণে দেশের মানুষ যতই দুর্ভোগে থাকুক, সরকার জোর গলায় নিজের সাফল্য দাবি করতেই থাকবে। যার কারণে সরকারের মধ্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি চলে এসেছে। এই তুষ্টি বড়ই ভয়ংকর। সে ভয়াবহতা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাঙার একতরফা সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক উদাহরণ হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, দলীয় নেতা সবার দাবি একটাই, দেশ খুব ভালো আছে, দেশের মানুষ ভালো আছে। সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এই সরকার সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ দিতে আসেনি। কোনো সরকারই তো তা করতে আসে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘটনা এমনটাই ঘটতে শুরু করেছে। সরকার নিজেদের ভুলগুলো হালাল করার চেষ্টা না করে ভুল শোধরানোর চেষ্টা করলেও হয়তো সুফল পেত দেশের মানুষ। কিন্তু তা হচ্ছে না। মন্ত্রিসভায় রদবলদ করলেই হবে না, সরকারের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনা চাই। তবে ইতিমধ্যে সময় বয়ে গেছে অনেক। সরকার এখনই নিজের দায়িত্ব নিয়ে সচেতন না হলে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তো আরো নষ্ট করবেই, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়াবে আরো, যা মোটেই কাম্য নয়।

সরকারের জনপ্রিয়তা কমেছে, বিরোধী দলের বাড়েনি
আওয়ামী লীগ সরকার শুরু থেকেই নানা অবিবেচক ও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করেছে। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমে গেলেই স্বাভাবিকভাবে বিরোধী দলের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে তেমনটা ঘটেনি। সরকার যেমন নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়েছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও পরিচয় দিয়েছে নিজেদের ব্যর্থতা। সরকারের তৈরি করে দেওয়া জনসংশ্লিষ্ট নানা ইস্যুকে কেন্দ করে বিরোধী দল আন্দোলনের প্রস্তুতি এবং উদ্যোগ কম নেয়নি, কিন্তু কোনোটাই দৃশ্যত বা কার্যত সাফল্য পায়নি।
৪ ডিসেম্বর ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ করার প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছিল বিএনপি। কিন্তু বিএনপির অন্যান্য হরতালের মতো এ হরতালও বিন্দুমাত্র সাফল্য পায়নি। অথচ ঢাকা ভাগের বিপক্ষেই ছিল অধিকাংশ মানুষ। তাহলে মানুষের পক্ষে কথা বলেও কেন পালে হাওয়া লাগছে না বিএনপির? কারণ বিএনপির যত কর্মসূচি এবং সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড তার কোনোটাই জনকল্যাণে নয়, কেবল ক্ষমতায় যেতে না পারার আক্ষেপ থেকে। গত তিন বছরে বিএনপির কর্মকাণ্ড থেকে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বারবার দাবি উঠলেও, দলটি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদ কার্যকরের কোনো উদ্যোগই দেখায়নি; কিন্তু সংসদ সদস্য পদ টিকিয়ে রাখতে সময়মতো ঠিকই সংসদে হাজির হয়ে আবার ওয়াকআউটও করেছে।
টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও খুব বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। সরকার গায়ের জোরে যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাতে সরকারের দায় তো অবশ্যই রয়েছে। বিএনপিও দায় এড়াতে পারে না। বিরোধী দল হিসেবে সরকারের ভুলের বিরোধিতা করবে তারা, আর এই কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে আমজনতা। কিন্তু বিএনপি আগে থেকেই নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করে রেখেছে, তাই জনগণের জন্য তারা যতই কথা বলুক না কেন জনগণ খুব সহজে তাদের ওপর আস্থা আনতে পারছে না।
জামায়াতসংশ্লিষ্টতা এবং তারেক রহমানকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও সক্রিয় করার যে কর্মসূচি হাতে নিয়ে মাঠে নেমেছে বিএনপি, তাতে সাধারণ মানুষের যোগ না দেওয়ারই কথা। জামায়াত এবং তারেকের কর্মদোষেই তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। ক্ষমতায় থাকাকালের বিএনপি নেতাদের দুর্নীতির যে দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ্যে চলে এসেছে, এরপর দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের আস্থাহানি ঘটেছে স্বাভাবিকভাবেই। বিএনপির হাইকমান্ড খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে এ আস্থা ফেরানোর কাজটি করতে পারেনি। সভা-সমাবেশে লোক সমাগম দেখেই জনসমর্থন ঘুরে গেছে এমনটা ভাবার কোনো মানে নেই। বিএনপিকে আরো কৌশলী হতে হবে।

অস্থিরতা কাটবে কবে!
দরপতনের ধারা অব্যহত এখনো। ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছিল পুঁজিবাজারে, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে এসেও তা প্রশমিত হয়নি। বরং বেড়েছে আরো। দফায় দফায় এই বাড়াবাড়ির গ্যাঁড়াকলে পড়ে শেয়ারবাজারের দফারফা হওয়ার জোগাড়। মতিঝিলকে এখন আর অফিসপাড়া বলার উপায় নেই। নানা পেশার মানুষের পদভারে যে এলাকা মুখরিত থাকত, সেখানে এখন বাতাসে মানুষের বিলাপের সুর। এক বছরের এই অস্থিরতায় শেয়ারবাজারের যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্তপ্রায় তাদের আন্দোলন আর বিক্ষোভের ঝাঁঝ এখন মতিঝিলের নৈমিত্তিক দৃশ্যের একটি। জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন কম হয়নি। কিন্তু লাভ হয়নি কোনো। সরকার এই সংকট থেকে উত্তরণে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু ফলাফল লবডঙ্কা! কেন?
এই 'কেন'র উত্তর জানার জন্য বিস্তর গবেষণা-তদন্ত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। উত্তরটাও অজানা নয় কারোই। কিন্তু উত্তর জেনেই বা কী লাভ! গত এক বছরে পুঁজিবাজারের লেনদেন কমেছে, মূল্যসূচক কমেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন মারফত জানা গেছে, এক বছরে শেয়ারবাজার থেকে এক লাখ তিন হাজার ৭৫৪ কোটি টাকার মূলধন উধাও হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সব হারিয়েছেন। আর এই উধাও হওয়া অর্থ নিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে অনেকের। এই অনেকের তালিকায় কারা কারা আছেন, সে নামও সবাই জানে। সরকারের তদন্তেই বেরিয়ে এসেছিল শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির খলনায়কদের নাম। সরকার পুঁজিবাজার রক্ষার লোকদেখানো নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে বটে, কিন্তু যারা এই অবস্থার জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। কারণ তারা সরকারের নিজের লোক। অপকর্ম ঘটিয়ে, হাজার হাজার মানুষকে পথে বসিয়ে সরকারসংশ্লিষ্ট হওয়ার কারণে সেই খলনায়কেরা নায়কের মতোই বর্তে আছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাই আস্থা উঠে গেছে ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে নতুন বিনিয়োগকারীদের। একবার যেহেতু কিছু হয়নি আবারও সেই খলনায়কেরা আবির্ভূত হলেও তো তাহলে পার পেয়ে যেতেই পারেন। কে চায় জেনেশুনে পায়ে কুড়াল মারতে?
শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে গুচ্ছ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। যার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক নিয়মকানুন শিথিল করেছে। তবুও ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আসছে না। সক্রিয় হননি প্রাতিষ্ঠানিক অন্য বিনিয়োগকারীরাও। কম্পানি পরিচালকদেরও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই শেয়ারের ঘাটতি পূরণে। কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পরও প্রভাব পড়েনি বাজারে। ব্যক্তিশ্রেণীর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সবকিছুর পেছনে একটাই কারণ_দায়ীদের শাস্তি না হওয়া। সরকার নিজস্ব লোকজন রক্ষার নীতিতে অটল থাকতে গিয়ে ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে গেছে দেশের পুঁজিবাজারকে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী তো সরাসরি বলেই দিয়েছেন, 'তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার সময় যে পরিবেশ ছিল তখন যদি আমাদের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে হয়তো বাজার ভালো হয়ে যেত।' ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী বড় বড় সংগঠনের নেতারাও কথা বলেছেন একই সুরে, দায়ীদের ছাড় দিয়ে সরকার শেয়ারবাজারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে। যার ফলে পুঁজিবাজারের এই বেহাল দশা। ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার যে অস্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে, তার দায়ভার তো অবশ্যই সরকারের। তা মেনে নিয়ে সরকারকে অবস্থা উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। আর এ জন্য শুরুতেই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত তদন্ত রিপোর্ট মোতাবেক দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এক বছর চলে গেছে হেলাফেলায়, কিন্তু এভাবেই যে আরো সময় যাবে না, এর নিশ্চয়তা কী?

No comments

Powered by Blogger.