যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অপেক্ষায় তারা by সাবি্বর নেওয়াজ

রীরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে খান সেনাদের ছোড়া বুলেটের আঘাতের চিহ্ন। এখনও নিজ দেহে বয়ে নিয়ে চলেছেন পাক বাহিনীর ছুড়ে দেওয়া গ্রেনেডের স্পিল্গন্টার। কামানের গোলার আঘাতে ভেঙে গেছে মেরুদণ্ড। এ অবস্থাতেই ৪০ বছর ধরে হুইল চেয়ারে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। ওরা অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। জীবন সায়াহ্নে এসে এখন একমাত্র চাওয়া, '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখে যাওয়া।


যাদের কারণে জীবনের এতগুলো বছর পঙ্গু অবস্থায় কাটাতে হয়েছে, সেই কলঙ্কিত মুখগুলোর ফাঁসি দিয়ে রাষ্ট্রকে কলঙ্কমুক্ত করে যাওয়া। নিজেদের রক্তস্নাত বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের আস্ফালন আর দেখতে চান না তারা। মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা
কেমন আছেন দেখতে গেলে সমকালের কাছে তারা এভাবেই নিজেদের চাওয়াগুলো দৃঢ়কণ্ঠে ব্যক্ত করেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাসভবনে গিয়ে আলাপ করতেই বেরিয়ে এল তাদের হৃদয়ের গহীন থেকে উৎসারিত স্মৃতি। অশ্রুসজল নয়নে বর্ণনা করলেন জীবনের সর্বোত্তম সুখস্মৃতিটুকু। যা আমৃত্যু লালন করবেন তারা। গভীর শ্রদ্ধায় লালন করবে বাংলাদেশও।
মোঃ সামসুদ্দিন বীরপ্রতীক :মোহাম্মদপুরের ১/৬ বীরউত্তম এএনএম নূরুজ্জামান (সাবেক গজনবী) সড়কের বাসায় নিচতলায় টিনের ছোট্ট দুটি ঘরে স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সামসুদ্দিন বীরপ্রতীক। বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। ৪০ বছর ধরে জীবন কাটছে হুইল চেয়ারে। কাছে যেতেই আলাপ-পরিচয়ের পর তার মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে শুরু করলেন। ১৯৭১ সালে ছিলেন ৩০ বছর বয়সী টগবগে যুবক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর থানার বিষ্ণুপুর গ্রামে ছিল তার বাড়ি। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে আসেন সে সময়ের রেসকোর্স ময়দানে। ভাষণ শেষে উদ্দীপ্ত হয়ে যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। পরিবারের কাউকে না জানিয়ে চলে যান ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায়। স্বল্প প্রশিক্ষণ নিয়ে আসামের ইন্দিরানগর ট্রেনিং সেন্টারে যান। সেখানে ট্রেনিং নেন ১ মাস ৭ দিন। ট্রেনিংয়ে হাই এক্সক্লুসিভ, প্লাস্টিক এক্সক্লুসিভ, ইএনটি, এন্টি পার্সোনাল মাইন, এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন, এসএমজি, এসএলআর, থ্রি নট থ্রি, এলএমজি আগ্নেয়াস্ত্র চালানো শেখানো হয়। ট্রেনিংয়ে ব্যাঙ্কার ইনচার্জ ছিলেন কর্নেল পাকশি। ট্রেনিংয়ের পর তাকে পাঠানো হয় ৪ নম্বর সেক্টরের সিআর দত্তের কাছে। এরপর সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার জালালপুরে পাঠানো হয়। সে সময় সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মাহবুব-উর সাদী চৌধুরী। ৩ জুলাই সিলেটের কানাইঘাট থানা রেইড করতে যান। সেই অপারেশন অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে শেষ হয়। অপারেশনে ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার দল ৯০ জন খান সেনাকে খতম করে। অপারেশনের পর নিজেদের হাতিয়ার বাদে পাক সেনাদের আরও ২টি চায়নিজ হাতিয়ার নিয়ে পুনরায় জালালপুর ক্যাম্পে যান। এভাবে মিলে ৪ নম্বর সেক্টরের ছোটখাটো বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন।
এরপর সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখে বদলি হয়ে ৩ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হোজামারায় আসেন। এখান থেকে আবার তাকে ২ নম্বর সেক্টরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন জেনারেল এম এ মতিন। জেনারেল এম এ মতিনের নেতৃত্বে আখাউড়ার আজমপুর স্টেশনে পাকসেনাদের সঙ্গে সামনাসামনি যুদ্ধ করেন। ডিসেম্বরের ৪ তারিখে পাক বাহিনীর শেলের আঘাতে বাঙ্কার বিধ্বস্ত হয়ে সামসুদ্দিনের ওপর পড়ে। এতে তার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। তখন থেকেই তার শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন। এরপর কল্যাণ ট্রাস্টের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হন '৭৬ সালে। বীরত্বের জন্য পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় 'বীরপ্রতীক' খেতাব। সমকালকে বললেন, যুদ্ধে রক্ত দিয়ে এনেছি দেশের স্বাধীনতা। এতেই বুকভরা সুখ। তবে স্বস্তি নেই। কেননা, যাদের বেইমানি ও যুদ্ধাপরাধের কারণে জীবনের এতগুলো বছর পঙ্গু অবস্থায় হুইল চেয়ারে দুঃসহ জীবনযাপন করছি তাদের বিচার না দেখে মরেও শান্তি পাব না। সরকারের কাছে দাবি, আমাদের জীবদ্দশায় যেন আমরা এ বিচার দেখে যেতে পারি।
কালীপদ দাস : পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম কালীপদ দাস। '৭১ সালের ৬ আগস্ট যশোরের অভয়নগর থাকার হিদিয়া নামক নিজ গ্রামে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী। হিদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ছিল ইপিআরের কাছ থেকে পাওয়া থ্রি নট থ্রি আর পাক বাহিনীর হাতে চায়নিজ রাইফেল। গোলাগুলির একপর্যায়ে হঠাৎ পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলি বন্ধ করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কালীপদ সামনে এগিয়ে দেখতে চান কেন গুলি বন্ধ করল তারা। উঠে দাঁড়াতেই স্কুলঘরের জানালা দিয়ে হানাদারদের একটি গুলি এসে তার ডান ঊরু দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। এতে তিনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। সহযোদ্ধারা পরে তাকে ভারতের বারাকপুর মিলিটারি হসপিটালে পাঠিয়ে দেয়। দুই দুইবার অস্ত্রোপচার শেষে তিনি কিছুটা সুস্থ হন। তবে তার ডান পা তিন ইঞ্চি ছোট হয়ে যায়। চার দশক ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা একই বিমানে ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধুও তাদের আরেক দফা চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেন।
কালীপদ দাস সমকালকে বলেন, এখন একটি প্রার্থনা, রাজাকার আর আলবদরদের বিচার হোক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তিনি মনে-প্রাণে কামনা করেন। এ ছাড়া তিনিসহ তার সহযোগী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থান থেকে একটি প্রভাবশালী মহল উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন।
মোঃ আবুল হোসেন :ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মিনগ্রামের সন্তান মোঃ আবুল হোসেন। একাত্তরে মাত্র ১৮ বছরের তরুণ এ মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বারবার ধরা পড়ে পাকি সেনাদের হাতে মারাত্মক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যে কারণে দেশ স্বাধীনের পরও তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বহুদিন কাটিয়েছেন। হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেন স্ট্রোক করে '৯৮ সালে তিনি মারা যান। তার স্ত্রী সুরাইয়া পারভীন স্বামীর যুদ্ধের নানা তথ্যসহ সহযোদ্ধাদের লেখা 'রক্তে রাঙা বিজয়-৭১' নামক বইটি এ প্রতিবেদকের হাতে তুলে দেন। তিনি জানান, ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে তার স্বামী মাগুরার লাঙ্গলবাঁধ এলাকায় সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন। এখানে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের একটি দলের হাতে ধরা পড়ে যান। পরে সেনাক্যাম্পে নিয়ে নাকে গরম পানি ঢালাসহ নির্মম নির্যাতন করা হয়। আবুল হোসেনকে পরে যুদ্ধে নিহত এক খান সেনার লাশ দাফনের নির্দেশ দেয় পাক সেনারা। দাফনের নাম করে তিনি পালিয়ে যান ফরিদপুরের কামারখালীতে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের অপর এক দলের সঙ্গে যোগ দেন। স্থানীয় কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর দুর্ভাগ্যক্রমে আবারও হানাদারদের হাতে আটক হন। তিন দিন তিন রাত ধরে তাকে গাছে ঝুলিয়ে পেটানো হয়। ১৮ বছরের এ তরুণ বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়েন। নাক-মুখ দিয়ে বের হতে থাকে রক্ত। ইনজেকশন দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে এনে আবারও পেটানো হয়। পাকিস্তানে সেনা ক্যাম্পে রান্নার কাজে নিয়োজিত থাকা এক বৃদ্ধার কাতর অনুনয়ে পড়ে অজ্ঞান অবস্থায় আবুল হোসেনকে গড়াই নদীর পাড়ে ফেলে আসা হয়। সুস্থ হয়ে আবারও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন আবুল। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর রাজবাড়ী মুক্ত করতে গিয়ে সম্মুখযুদ্ধে তিনি বাম হাতের কবজির নিচে পরপর তিনটি গুলি খান। অঝোরে ঝরতে থাকে রক্ত। যুদ্ধাহত এ মুক্তিযোদ্ধাকে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসা হয়। সুরাইয়া পারভীন জানান, পাকিস্তানি ক্যাম্পে নির্যাতনের কারণে আবুল হোসেন প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। পরিশ্রমের কোনো কাজ তিনি করতে পারতেন না। যার কারণে তার বিয়ের পর মাত্র ৫ বছর তারা একসঙ্গে সুস্থভাবে দাম্পত্যজীবন পার করতে পেরেছেন।
প্রয়াত এ মুক্তিযোদ্ধার চার সন্তান নিয়ে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা বাসস্থানে বসবাস করছেন বিধবা সুরাইয়া পারভীন। তিনি জানান, কয়েক দিন আগে প্রভাবশালী একটি মহল অন্য মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর সঙ্গে তাকেও হুমকি দিয়ে বলেছেন বাসা ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে। নইলে ১৬ ডিসেম্বরের পর লাথি দিয়ে তাদের বের করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
মোঃ মতিউর রহমান :'৭১ সালে মোঃ মতিউর রহমানের বয়স ছিল ২১ বছর। যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাশেই গরীবপুর গ্রামে মতিউরের বাড়ি। ২৬ মার্চ যশোর শহরের মনিহার সিনেমা হলে সিনেমা দেখে ফেরার পথে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হওয়া পাক সেনাদের সাঁজোয়া যান দেখে অবাক হন। একই রাস্তা ধরে তাদের আসতে দেখে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেন জঙ্গলে। সকালে লোকমুখে শুনতে পান পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারের খবর। এপ্রিলের মাঝামাঝি মতিউর রহমান এবং তার কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। ৬ জনের গেরিলা দল গঠন করেন। এ গেরিলা দলের তিনি ছিলেন গ্রুপ কমান্ডার। এরপর ছোটখাটো বিভিন্ন অপারেশনে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যান। ৪ ডিসেম্বর যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ২ মাইল দূরে 'খোজার হাট' নামক এক বাজার। এ বাজারে বিকেলে প্রতিদিন বাজার বসত। সেদিন জানতে পারেন এ হাটে ৭ জন পাঞ্জাবি সৈন্য এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে গেরিলা টিম নিয়ে বাজারে হাজির হন। তারপর ছদ্মবেশ ধারণ করে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে যান। পাশের একটি বাড়িতে তাদের জন্য বিশাল খাবারের আয়োজন করেন। এক সময় সুযোগ বুঝে খাওয়ার ফাঁকে তাদের হাতিয়ারগুলো নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেন। চারদিক থেকে ঘেরাও দিয়ে মতিউর রহমান তাদের আত্মসমর্পণ করতে বলেন। মতিউরের এক সঙ্গী নিজের উত্তেজনা দমাতে না পেরে ওই হাতিয়ার দিয়ে হানাদারদের গুলি শুরু করে দেন। তাদের একজনের কাছে গ্রেনেড ছিল মতিউর জানতেন না। সেই লোকটি সঙ্গে সঙ্গে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণে তার কপালে স্পিল্গন্টার বিঁধে যায়। সেদিন গেরিলারা সব ক'জন পাঞ্জাবি সৈন্যকে মারতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই অপারেশনে আহত হওয়ার পর ভারতের আলীপুর ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ার পাশাপাশি মতিউর রহমান সমকালকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানীভাতা এমন হওয়া উচিত যেন তা দিয়ে তারা সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারেন। অসম্মানের সঙ্গে নয়।

No comments

Powered by Blogger.