বর্বরতার সাক্ষী যে গণকবর by বিশ্বজিৎ পাল বাবু

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী যে কয়টি অপরাধের প্রমাণ মিলেছে তার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বর্বরতা একটি। ১৯৭১ সালে গোলাম আযমের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় এখানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। বিভিন্ন সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরেজমিন তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এমন প্রমাণ পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার পৈরতলা রেলগেটের সঙ্গে রয়েছে একটি


গণকবর। অনেকে বলছেন শতাধিক, আবার কারো কারো বক্তব্য তিন-চার শ মুক্তিযোদ্ধা ও নিরপরাধ লোককে এখানে কবর দেওয়া হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বরের ৫ ও ৬ তারিখ কারাগার থেকেও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে এখানে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এমনকি ঈদের দিনে দুষ্কৃতকারী আখ্যা দিয়ে বাবা ও ছেলেকে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
পৈরতলার গণকবরে যাদের লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে তাদের সবার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের হাতে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষ ধরা পড়লে তাদের হত্যা করে এখানে এনে কবর দেওয়া হতো। এমনকি জীবিতদেরও কবর দেওয়ার চেষ্টা হয় বলে মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী নাটাই উত্তরের আব্রু খান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পৈরতলা এলাকার গণকবরে আমিসহ অনেককে হাত বেঁধে আনা হয়। অনেককে হত্যা করা হয় গুলি ও বেয়নেটের আঘাতে। আমি কৌশলে দৌড়ে পালিয়ে যাই। তখন ওরা আমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।'
একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত করতে গত বছরের ২৩ আগস্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মতিউর রহমানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্যের একটি টিম ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসে। টিমের অন্য দুই সদস্য ছিলেন শিমুল চৌধুরী ও প্রবীর ভট্টাচার্য।
এ সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে মতিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, 'নির্মম সব ঘটনা। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর ছেলেকে জেলখানা থেকে বের করে এনে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। মাইকে ঘোষণা করা হয়, দুষ্কৃতকারী ধরা পড়েছে। এ ঘটনা ঘটানো হয় ঈদের দিন। এ সময় কেউ কিছু বলারও সাহস পায়নি।' এসব হত্যাকাণ্ডে গোলাম আযমের সহযোগিতার বিষয়টি তিনি অকপটে স্বীকার করেন।
পৈরতলার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সোনা মিয়া ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জানান, পৈরতলায় রাজাকাররা গুলি করে বহু লোককে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহায়তায়। একজনকে জ্যান্ত কবর দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি কবি জয়দুল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বই লেখার স্বার্থে এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বলি। আমার জানামতে, পৈরতলার গণকবরে তিন-চার শ লাশ কবর দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাকে জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শত্রুমুক্ত হওয়ার পর এখানে কোদাল লাগানো হলে লাশ উঠে আসে।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার হারুন-অর রশিদ বলেন, 'গোলাম আযমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। একাত্তরে এখানে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছাড়া এমন হত্যাকাণ্ড সম্ভব ছিল না। আমরা গোলাম আযমের বিচার চাই।'

No comments

Powered by Blogger.