কেমন আছ মা-প্রতিদিন দুই মুঠো চাল বেশি রাঁধতে বলি-কুলসুম বেগম

খনো প্রতিদিন দুই মুঠো চাল বেশি রাঁধতে বলি। জানালার শিক ধরে অপলক রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি_ওই বুঝি এল ওমর ফারুক। ৪০ বছর পরও বিশ্বাস হয় না_আমার মেধাবী, আপসহীন, সংগ্রামী ছেলেটি একাত্তরে শহীদ হয়েছে। ফারুকের বাবা, আমার স্বামী সৈয়দ শরীফ এক বছর আগে পাড়ি জমিয়েছেন ওপারে। ১৯৭১ সাল থেকে ভাঙা রেডিও আগলে ছিলেন ফারুকের বাবা। প্রতিদিন খবর শুনতেন। তাঁর ধারণা ছিল, কোনো এক খবরে বলা হবে_ওমর


ফারুকের খোঁজ পাওয়া গেছে। ফারুক শহীদ হয়নি, বেঁচে আছে। ঘরে ফিরে আসবে সে। একাত্তরের সেই সময় ফারুক ছিল খুবই ব্যস্ত। নামকরা ছাত্রনেতা, পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ভিপি। ফারুকের বাবা বলত, দেশের জন্য ফারুকের অনেক টান। ওর ভাষণ শুনলে মানুষ বিদ্রোহী হয়। আমার শরীর শিউরে ওঠে। দেখে নিও ফারুকের মা, ফারুক একদিন অনেক নাম করবে। আমার ফারুক ঠিকই নাম করছে; কিন্তু ৪০ বছর ধরে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি আমি।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সময় ছাত্ররাজনীতি শুরু করে ফারুক। পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশ রক্ষার তাগিদ অনুভব করে কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্বাধীন বাংলা নিউক্লিায়াসে। গড়ে তোলে পিরোজপুর মহকুমা ছাত্রলীগ।
পিরোজপুর টাউন হল ময়দানসংলগ্ন শহীদ মিনারের পাদদেশে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ফারুক প্রথম উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলার পতাকা। ছাত্রদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৭ মার্চ পিরোজপুরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সঙ্গে ট্রেজারি লুট করে; অস্ত্র সংগ্রহ করে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ। ফারুক তখন বিকম শ্রেণীর ছাত্র। পড়ালেখার চেয়ে দেশ বড়, জীবনের চেয়ে স্বাধীনতা বড়_এই ছিল তার মূলমন্ত্র।
৩০ এপ্রিল ফারুক স্বরূপকাঠির আটগর-কুড়িয়ানা ও ঝালকাঠির কীর্তিপাশায় গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে এবং সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহে যায়। এদিকে ২ মে পিরোজপুর দখল করে নেয় হানাদার বাহিনী। ট্রেজারি লুটের দায়ে ফারুকের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে তারা। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হলে পিরোজপুরে প্রকাশ্যে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। পিরোজপুরে না আসতে পেরে স্বরূপকাঠির আটগাও-কুড়িয়ানায় নানাবাড়িতে আশ্রয় নেয়_উদ্দেশ্যে পালিয়ে ইন্ডিয়ায় যাওয়া। মাটিভাঙা হয়ে ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে ফারুক। ২৯ মে ১৯৭১, সকাল ৬টায় বালুকান্দা ফেরার পথে পুলিশ সদস্য হানিফ তাকে চিনে ফেলে। আলবদরদের সহায়তায় আটক করে প্রথমে তাকে নেওয়া হয় বরিশালে। ৩০ মে ১৯৭১ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বরিশাল ৩০ গোডাউনের টর্চার সেলে (যেখানে আটকে রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন করা হতো)।
সহযোদ্ধাদের নাম এবং অবস্থান জানার জন্য তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। কিন্তু ফারুক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের কাছে হার মানেনি। তাই ওরা তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে তাকে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' বলতে বলা হয়। কিন্তু মৃত্যুর মুখেও, শত অত্যাচারের পরোয়া না করে সে বলে, 'জয় বাংলা'। এরপর হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের পতাকা মাথায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ফারুকের মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ তথ্য আমাদের জানায় ওই টর্চার সেলের এক বন্দি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক। সেই থেকে আমার প্রতীক্ষার প্রহর শুরু, আজও শেষ হয়নি। আজও জানতে পারিনি_কোথায়, কিভাবে তাকে দাফন করা হয়েছে। আবদুল হক জানিয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের শিক্ষা দিতে তিন দিন গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল তার লাশ।
এখনো আমার চার মেয়ে ও দুই ছেলে আছে। তাদের মধ্যে ওমর ফারুকের অতি আদরের বড় বোন হাসি প্রতিবন্ধী। হাসির একমাত্র মেয়ের জন্য সরকারের কাছে আমাদের একটি চাকরির দাবি ছিল, যা আজও পূরণ হয়নি। রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে খুব বেশি চাওয়ার নেই। কিন্তু সম্প্রতি এক ঘটনায় বড় মুষড়ে পড়েছি। যে সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের তুখোড় ছাত্রনেতা ও ভিপি ছিল ফারুক, সেই কলেজের দুই ছাত্র আমার দুই মেয়ের ঘরের দুই নাতির ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে। সেজ মেয়ে সালমা রহমান হ্যাপির বড় ছেলে তানভির মুজিব অভি ও ছোট মেয়ে রেশমা পারভিনের বড় ছেলে মোহাইমিনুল ইসলাম সাজিদ। আমি বুঝি না, কেমন সরকারের লোক! বিনা অপরাধে ফারুকের দুই ভাগিনার ছাত্রত্ব বাতিল করে কলেজছাড়া করা হয়েছে। মামার রক্ত তো ওদের শরীরে। তাই রাজনীতি ওদেরও টানে। তখন হানাদাররা মেরেছে; কিন্তু এই সরকারের লোক আমার নাতিদের মারে কেন?
কুলসুম বেগম : কাউখালি উপজেলার আমড়াজুড়ি গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুকের মা। বয়স ৯০ বছর। বর্তমানে পিরোজপুর সদর উপজেলার শহীদ ওমর ফারুক সড়কে সরকারের বরাদ্দ করা একটি সাধারণ বাড়িতে থাকেন।
অনুলিখন : শিরিনা আফরোজ, পিরোজপুর প্রতিনিধি।

No comments

Powered by Blogger.