অনুবাদ-ওয়াল স্ট্রিটে অরুন্ধতীর বক্তৃতা...

রুন্ধতী রায়। জন্ম ভারতের শিলংয়ে ১৯৬১ সালের ৭ নভেম্বর। নয়াদিলি্লতে তিনি স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ালেখা করেন। তিনি এ সময়ের একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা, সমাজকর্মী এবং সব কিছু ছাপিয়ে একজন খ্যাতিমান লেখিকা। গত ১৬ নভেম্বর ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন নিয়ে ওয়াশিংটন স্কয়ারে তিনি বক্তব্য দেন। তাঁর ওই বক্তব্যটি পাঠকের জন্য ভাষান্তর করেছেন কল্লোল কর্মকার গত মঙ্গলবার (১৫ নভেম্বর) ওয়াল স্ট্রিট থেকে বিক্ষোভকারীদের


সরিয়ে দিতে অভিযান চালায় পুলিশ। সকালবেলায় তারা প্রায় খালি করে ফেলে জুক্কোত্তি পার্ক। তবে আজ এই পার্কে জনগণ ফিরে এসেছে। পুলিশের ভালো করেই জানা উচিত এই আন্দোলন কোনো ভূখণ্ড বা অঞ্চল দখলের যুদ্ধ নয়। আমরা এখানে পার্ক দখল করার জন্য যুদ্ধ করছি না। আমরা ন্যায়বিচারের জন্য লড়ছি। আর এই ন্যায়বিচার শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য নয়, বরং তা সবার জন্যই।
সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রে 'ওয়াল স্ট্রিট দখল করো' নামে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাতে একটি নতুন ধারণা এবং একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষার জন্ম হয়েছে খোদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হৃৎপিণ্ডে। এ এমন একসময় যখন মানুষ আকণ্ঠ ভোগবাদিতা আর অনুভূতিহীন 'জোম্বি'তে পরিণত হচ্ছে। ঠিক এই ব্যবস্থার মধ্যে অধিকার প্রতিষ্ঠায় পুনর্জাগরণ আবারও স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করছে আমাদের।
একজন লেখক হিসেবে আমি মনে করি, এটা একটা বিশাল অর্জন। আর এ জন্য আমি আপনাদের শুধু ধন্যবাদ দিতে পারি না। আমরা ন্যায়বিচার নিয়ে কথা বলছি। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এখনো ইরাক এবং আফগানিস্তান দখল করতেই ব্যস্ত। পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের বাইরে ড্রোন (মনুষ্যবিহীন বিমান) হামলায় মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। ১০ হাজার মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে অতিরিক্ত ঘাতকবাহিনী আফ্রিকায় তাদের অবস্থান সুসংহত করেছে। ইরাক এবং আফগানিস্তানে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করার পরও আবারও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছে আজ। তবুও অস্ত্র নির্মাণ আর রপ্তানির মধ্য দিয়েই অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্দেশে সৌদি আরবের সঙ্গে ৬০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে মরণঘাতী বাংকার বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রিরও পাঁয়তারা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আমার দেশ ভারতের কাছেও সামরিক বিমান বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই বিমান বিক্রির অর্থমূল্য পাঁচ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই ভারতেই গোটা আফ্রিকার দরিদ্র জনগণের চেয়েও বেশি দরিদ্র জনগণ বাস করে। নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করার নামে অতীতে হিরোশিমা, নাগাসাকি থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, কোরিয়া, লাতিন আমেরিকায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
'মার্কিনদের জীবনাচারণ' সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি। তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী জীবনাচারণের দিকে পৃথিবীর অবশিষ্ট অংশকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে তারা। আর এর ফলাফল হিসেবে সমগ্র মার্কিন মুলুকের অর্ধেক জনসংখ্যার যে সম্পদ থাকার কথা তা শুধু ৪০০ জনই কুক্ষিগত করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন সে দেশের ব্যাংক এবং করপোরেশনগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দিতে শুরু করে, তখন অনেক মার্কিন নাগরিক তার সর্বস্ব হারায়। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ (এআইজি) এককভাবেই ব্যাংকসহ করপোরেশনগুলোকে ১৮২ বিলিয়ন অর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে।
এদিকে ভারত সরকার মার্কিনদের অর্থনৈতিক নীতির অন্ধ অনুকরণ শুরু করেছে। ফলে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভারতের ২০ বছর থাকার পর ভারতের ১০০ জন মানুষের হাতে এসেছে মোট জিডিপির এক-চতুর্থাংশ সমপরিমাণ অর্থ। অন্যদিকে এই ভারতেরই ৮০ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় মাত্র ৫০ সেন্টের নিচে। আড়াই লাখ কৃষক ঋণের দায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে আত্মহত্যার দিকে। আমরা একেই বলি উন্নতি এবং নিজেদের সুপারপাওয়ার ভাবতে শুরু করেছি। আজ আপনাদের মতো আমরাও সুসজ্জিত। আমাদেরও পারমাণবিক বোমা এবং অশ্লীল বৈষম্য বিরাজ করছে। কিন্তু সুসংবাদ হলো, মানুষ বেশি দিন একে সহ্য করছে না। ওয়াল স্ট্রিট দখল আন্দোলনের প্রতি বিশ্বের নানা জায়গা থেকে বিভিন্ন পেশাজীবী বিক্ষোভকারী সংহতি জানিয়েছে। এতে দরিদ্র দেশটির সবচেয়ে গরিব মানুষটি যিনি, তিনিও ধনিক লুটেরাদের বিরুদ্ধে এই সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে আমাদের পাশে পাব। একেবারে সাম্রাজ্যবাদের হৃৎপিণ্ডে বসে চালিয়ে যাবে ওই আন্দোলন। আমি জানি না, এই বিশালত্বের সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ করা যায়। তাদের মধ্যে এক শতাংশ বলছে, 'তাদের কোনো চাহিদা নেই।' সম্ভবত তারা জানে না আমাদের ক্রোধের আগুনেই তারা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এর পরও কিছু কথা থেকে যায়। আমাদের চিন্তাচেতনায় কিছু প্রাক-বিপ্লবী ভাবনা রয়ে গেছে। আমাদের নিজেদের জন্যই আমরা আরো একবার ভেবে দেখতে পারি পুরো বিষয়টি নিয়ে। যে ব্যবস্থা আমাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে তা ঝেড়ে ফেলতে হবে। ব্যক্তি এবং করপোরেশনগুলোর যে অর্থ কুক্ষিগত করার বন্দোবস্ত তার ওপর টুপি পরাতে চাই আমরা। একই সঙ্গে ক্যাপ-ইস্টস এবং লিড-ইটস হিসেবে আমাদের দাবিগুলো হচ্ছে।
এক. বহু মালিকানার ব্যবসায়িক ধারণা বন্ধ করা। উদাহরণস্বরূপ, অস্ত্র নির্মাতাদের নিজস্ব টেলিভিশন থাকতে পারবে না, খনি কম্পানিগুলো নিজেদের মালিকানাধীন সংবাদপত্র চালাতে পারবে না, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্থসহায়তা দিতে পারবে না, ওষুধ কম্পানিগুলো পারবে না জনস্বাস্থ্য তহবিল নিয়ন্ত্রণ করতে।
দুই. প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগুলো বেসরকারীকরণ করা যাবে না। (পানি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা)।
তিন. প্রত্যেকের বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
চার. ধনীদের সন্তানরা তাদের মা-বাবার অর্থসম্পদের অধিকার পাবে না। এই আন্দোলন আমাদের কল্পনাশক্তিকে বাড়িয়ে দেবে। 'মানবাধিকার' বলতে আসলেই যা বোঝায়, তা পুঁজিবাদ নষ্ট করে ফেলেছে। সম-অধিকারের স্বপ্ন আজও যেন ব্লাসফেমির সমান। আমরা একেবারেই আনাড়ির মতো লড়াই করছি না। আমরা একটা ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই এবং চাই সংশোধন। একজন ক্যাপ-ইস্টস এবং লিড-ইটস হিসেবে আমি আপনাদের সালাম জানাই। সালাম এবং জিন্দাবাদ।

No comments

Powered by Blogger.