ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের চাপ কমছে by ওবায়দুল্লাহ রনি

ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার চাপ কিছুটা কমেছে। নতুন করে ঋণ না নেওয়া এবং আগের ঋণ পরিশোধ করায় ঋণ গ্রহণের প্রবণতা নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। নভেম্বরের শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা, যা বাজেটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এ চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক


করে দিয়েছেন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। বাজেট ঘোষণার পরপরই ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় টাকা ধার নেয় সরকার, যা পরে বাড়তে থাকে। অক্টোবর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। নভেম্বরের শেষে যা ১৯ হাজার ৮০৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। মূলত আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ায় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সরকার। অর্থনীতিবিদসহ নানা মহলের সমালোচনার মুখে সম্প্রতি নতুন করে ঋণ না নেওয়ায় এবং মেয়াদ পূর্তি হওয়া ঋণ পরিশোধ করায় এ ব্যবস্থায় সরকারের ঋণ কমেছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ১২ মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকার ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০ নভেম্বর ওই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১৯ হাজার ১৫ কোটি টাকা। নভেম্বর শেষে যা আরও বেড়ে ১৯ হাজার ৮০৫ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার অস্বাভাবিক হারে ঋণ গ্রহণের ফলে অস্বস্তিতে পড়ে ব্যাংকিং খাত। এ কারণে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরকারের ব্যাংক ঋণ নিয়ে সতর্ক করা হয়। যদিও ওই সতর্কতার পরও ঋণ গ্রহণ বন্ধ করেনি সরকার। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এসে দেখা গেছে, সরকার নতুন করে আর ঋণ নেয়নি। অন্যদিকে আগের নেওয়া কিছু ঋণের মেয়াদ পূর্তি হওয়ায় তা পরিশোধ করেছে। ফলে সরকারের ব্যাংক ঋণ ১৭ হাজার ৮৩০ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। এ হিসাবে এক সপ্তাহে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণ কমেছে ১ হাজার ৯৭৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নানা কারণে অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, সে চাপ কিছুটা কমেছে। এটি অব্যাহত থাকলে তা হবে ইতিবাচক। তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে সরকার ঋণ নেয়। চলতি অর্থবছর অন্যান্য উৎস থেকে তুলনামূলক কম ঋণ পাওয়ায় ব্যাংকিং খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত তারল্য না থাকায় তারা সরকারকে চাহিদা অনুপাতে ঋণ দিতে পারছে না। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তা সরবরাহ করতে হচ্ছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত নতুন নোট ইস্যু করে টাকা সরবরাহ করে থাকে, যা মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেয়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সরকারের নেওয়া এসব ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করেছে ১০ হাজার ৯০৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় এ খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ ছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। তারপরও গত অর্থবছর শেষে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ২০ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১৫ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও পরে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১৮ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে সব লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে অর্থবছর শেষে সরকারের নিট ঋণ ২০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে। অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন, সরকারের অতিমাত্রায় ঋণ গ্রহণ মূল্যস্ফীতি উস্কে দেয়। যে কারণে বরাবরই ঋণ কমানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছেন তারা।
অর্থবছরের শুরুতে সরকারের খরচ বাড়লেও আয় সেভাবে বাড়েনি। বিশেষ করে রাজস্ব আয় কমে যাওয়া, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে শ্লথগতি, বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগ কমাসহ নানা কারণে সরকারকে বাজেট ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যে কারণে বছরের শুরু থেকেই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তা কিছুটা কমেছে। সরকারের এ ধারা ঠিক থাকলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট কমে আসবে। তাতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিও সহজ হবে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.