লাল-সবুজের ক্যানভাস

৬ ডিসেম্বর বিজয়ের চলি্লশ বছর উৎসব পালন করবে বাংলাদেশ। বিজয় দিবসের ঠিক আগে বাঙালির মনেও লেগেছে উৎসবের রঙ। স্বাধীনতা ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে সেজে উঠেছে লাল-সবুজ রঙে মাসজুড়ে। লিখেছেন সুরবি প্রত্যয়ী ১৯৭১ সালে যেই শিশুটির বয়স ছিল এক বছর, তার বয়স আজ চলি্লশ বছর। খুব কম সময় কিন্তু নয় এটি! একজন মানুষের জীবনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যায় এই চলি্লশ বছরে। ঠিক তেমনি বাংলাদেশেরও চলি্লশ বছর


পূর্ণ হবে এবার, স্বাধীনতার চলি্লশ বছর। নয় মাসের যুদ্ধ, তিরিশ লাখ প্রাণ, অনেক ত্যাগ, অশ্রু ও রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীনতা, পেয়েছি বাংলাদেশ। সঙ্গে পেয়েছি বিজয়ের প্রতীক_ ওই লাল-সবুজ পতাকা।
এ প্রজন্ম কী ভাবছে দেশকে নিয়ে? ১৯৫২ সালে বা ১৯৭১ সালে ছাত্ররা যেই সাহসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করেছিল বাংলা ভাষাকে, বাংলাদেশকে, সেই একই সাহস কি রাখে আজকের তরুণরা? কথা হচ্ছিল এ প্রজন্মের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে, দেশ সম্পর্কিত তাদের ভাবনা নিয়ে, বিজয়ের চলি্লশ বছর নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ বললেন, 'আমার দাদু ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ছোটবেলা থেকেই তার কাছে দেশের ইতিহাস, যুদ্ধের একেকটি অপারেশন, শহীদের আত্মত্যাগ_ এসব কিছু জেনেছি। যে বয়সে শিশুরা রূপকথার গল্প শোনে, আমি তখন শুনেছি বাংলাদেশের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার ইতিহাস। তখন আমার ভীষণ রাগ হতো হানাদার বাহিনীর ওপর। রাগ হতো নিজের ওপরও। ভাবতাম, আমি কেন সে সময়ে ছিলাম না! তাহলে আমার দাদুকে এত কষ্ট পেতে হতো না, আমি তার হয়ে যুদ্ধ করতাম! মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দাদুর একটাই দুঃখ ছিল, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখতে পারলেন না।'
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আনিকা তাসনীম বললেন, 'আমাদের বড়দের ধারণা যে, আমরা দেশকে ভালোবাসি না, দেশ নিয়ে ভাবি না। এটি একদমই ভুল। হ্যাঁ, এটি ঠিক যে, আমাদের প্রজন্মের কিছু ছেলেমেয়ে রয়েছে, যারা দেশ নিয়ে উদাসীন। এককথায় বলে দেয়, 'উই হেট পলিটিক্স'! তারা এমনটা ভাবে, কারণ তারা মনে করে রাজনীতি আর দেশ একই কথা। কোনটি রাজনৈতিক ব্যাপার আর কোনটি জাতীয়_ সেটি তারা পার্থক্য করতে পারে না। এটি সঠিক ইতিহাস না জানার জন্য। তবে সবাই কিন্তু এমন নয়। আমাদের প্রজন্ম দেশ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে, আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে একটি আলাদা দেশ হিসেবে তুলে ধরব আর একবার; ঠিক যেমনটি করেছিলেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা।'
একটি অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিতে কর্মরত পাভেল আলম বললেন, 'আজকাল বিজয় দিবসের সময় সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুকে দেখা যায় চমৎকার একটি জিনিস। ডিসেম্বর মাসজুড়ে অথবা ১৬ ডিসেম্বরে প্রত্যেক বাঙালি ফেসবুক ব্যবহারকারী, তথা দেশপ্রেমিকের প্রোফাইলে থাকে লাল-সবুজ রঙ, আমাদের পতাকার রঙ। তবে এটি নিয়েও রয়েছে কিছু মানুষের 'উদ্বেগ'। আমরা নাকি এক মাস বা একদিনের জন্য বাঙালি। তবে আমি ব্যাপারটা দেখি অন্যভাবে। যদি বিজয়ের অজুহাতে এক মাসের জন্য দেশপ্রেমিক হই, মন্দ কী! আর আমরা যারা প্রকৃতই দেশকে ভালোবাসি তারা সারা পৃথিবীর কাছে জানিয়ে দিচ্ছি_ এটি আমাদের বিজয়ের মাস, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মাস।'
তরুণ সমাজের দেশ নিয়ে এমন ভাবনাগুলো আমাদের স্বপ্ন দেখায় নতুন এক বাংলাদেশের। আর যেখানে তরুণ সমাজের কথা ওঠে সেখানে ফ্যাশনের উপস্থিতি তো অনিবার্য। সেই ধারাকে অব্যাহত রেখেই এবারও তারা বেছে নিচ্ছে লাল-সবুজ রঙকে বিজয়ের উৎসব পালনের জন্য। ফ্যাশন হাউস 'কে-ক্র্যাফট'-এর কর্ণধার ও ডিজাইনার শাহনাজ খান বললেন, গত প্রায় এক দশক ধরে উৎসবভিত্তিক পোশাক পরার চলটি শুরু হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। যদি স্বাধীনতার লাল-সবুজকে মনে ধারণ করে পোশাকে ফুটিয়ে তোলা যায়, তবে মন্দ কী? এই ধারণা থেকেই এবারও 'কে-ক্র্যাফট' তৈরি করেছে বিজয় দিবসের পোশাক। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, টি-শার্ট, বাচ্চাদের পোশাক, ভ্যান্ডানা_ সবই পাওয়া যাবে আউটলেটগুলোয়। প্রাধান্য পেয়েছে লাল-সবুজ রঙ দুটো।
স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে কিন্তু স্বাধীনতা রক্ষা করাটা বেশি কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন নতুন প্রজন্মের সচেতনতা। আর তার দায়িত্ব আমাদেরই। আট বছর বয়সী শায়ানের মা-বাবা বললেন, 'আমরা এখন থেকেই আমাদের ছেলেকে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানানোর চেষ্টা করি বিভিন্নভাবে। গল্পের ছলে, ছবি এঁকে অথবা বই পড়ে_ ও জানুক ও যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছে সে দেশটির জন্ম একদিনে হয়নি। ও যখন টিভিতে শোনে 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই' তখন ও নিজেও সেটি বলে চিৎকার করে! সব অভিভাবকেরই উচিত সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস শিক্ষা দেওয়ার। স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস জানলেই কেবল সে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়তে পারবে।'
চলি্লশ বছরের বিজয় উৎসব পালন করবে এবার বাঙালি জাতি। লাল-সবুজের রঙে নিজেকে রাঙাব আমরা; পোশাকে, সাজে, চুড়িতে অথবা ভ্যান্ডানায়। যেই মনোবল নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা, বীরাঙ্গনারা এবং শহীদরা ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়, সেই মনোবল নিয়েই আমরা রক্ষা করব স্বাধীনতাকে_ বিজয়ের চলি্লশ বছরে এই হোক আমাদের সংকল্প।

No comments

Powered by Blogger.