দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ১১ বছরে ৩০ জন চেয়ারম্যান হত্যা by ফখরে আলম,

ক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গত ১১ বছরে ৩০ জন পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে হত্যা করা হয়েছে। একের পর এক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক চেয়ারম্যান প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়ে শহরে বসবাস করছেন। ফলে স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরামের নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে খুনিদের বিচার এবং নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা দাবি করেছেন।


অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক বিরোধ, সামাজিক কোন্দল, চরমপন্থীসংক্রান্ত বিরোধ ও কানেকশন, টেন্ডারবাজি, চিংড়ি ঘের, জলমহাল, হাট-বাজার, এলাকার আধিপত্য এবং ইউপি নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে চেয়ারম্যানদের হত্যা করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ১৯৯৮ সালে চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। ওই বছর ছয়জন চেয়ারম্যানকে সন্ত্রাসীরা হত্যা করে। এর পর থেকে প্রতিবছরই চেয়ারম্যান হত্যার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর গুলিবিদ্ধ খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী আবদুল হালিম গত মঙ্গলবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মারা যান। ১৯৯৮ সালে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কালীদাসপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গহর আলী, ঝিনাইদহের মহেশপুরের শ্যামকুড় ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান খায়বার আলী, খুলনার ফুলতলার দামোদার ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম, খুলনার রূপসার ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক এবং বাগেরহাটের ডেমা ইউপি চেয়ারম্যান আকতার আলীকে হত্যা করা হয়।
১৯৯৯ সালেও ছয়জন চেয়ারম্যান হত্যার ঘটনায় চেয়ারম্যানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। কিন্তু এর পরও অনেক চেয়ারম্যান প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি। ১৯৯৯ সালে আবার কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আলী আকবার, মেহেরপুরের কাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল রফিক, খুলনার বটিয়াঘাটার সুরখালী ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা হাবিবুর রহমান এবং রূপসার শ্রীফলাতলা ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেনকে হত্যা করা হয়। ওই বছর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন চারজন চেয়ারম্যান। ২০০০ সালে কুষ্টিয়ার হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদ হোসেন সাচ্চু, ২০০১ সালে যশোরের ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল জলিল, খুলনার ডুমুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গার জেহেলা ইউপি চেয়ারম্যান ইবনে সাঈদ কচি, ২০০২ সালে মেহেরপুরের মহাজনপুর ইউপি চেয়ারম্যান বাগবুল ইসলাম, খুলনার বটিয়াঘাটার ভাণ্ডারকোট ইউপি চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী, ২০০৩ সালে বাগেরহাটের রামপালের বাইনতলা ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, খুলনার বটিয়াঘাটার সুরখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাহান আলী এবং আরেক চেয়ারম্যান আমির আজম, ২০০৫ সালে চুয়াডাঙ্গার ডিঙ্গা শংকর চন্দ্র ইউপি চেয়ারম্যান নূর আলী, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর পৌর চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, ২০০৮ সালে একই জেলার গান্না ইউপি চেয়ারম্যান শরাফত হোসেন, সাতক্ষীরার ধনদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান এবং ২০০৯ সালের ২৫ জুলাই কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া ইউপি চেয়ারম্যান জামিল হোসেন বাচ্চুকে হত্যা করা হয়। ২০১০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যশোরের মণিরামপুর হরিদাসকাঠি ইউপি চেয়ারম্যান প্রকাশ চন্দ্র সাহা, ১৬ আগস্ট খুলনার ফুলতলার দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ বাদল, ১২ অক্টোবর দামুড়হুদা উপজেলার নাতিপোতা ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও ১৬ নভেম্বর যশোরের ঝিকরগাছার নির্বাসখোলা ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেনকে হত্যা করা হয়।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার গভীর রাতে খুলনার সেনহাটি ইউপি চেয়ারম্যান গাজী আবদুল হালিম হত্যাকাণ্ডে এ অঞ্চলের চেয়ারম্যানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরামের যশোরের সভাপতি সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'একের পর এক চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ডে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। অনেক চেয়ারম্যান জীবনের নিরাপত্তার জন্য এলাকা ছেড়ে শহরে বসবাস করছেন। এতে স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। গত মাসে সন্ত্রাসীরা আমাকেও হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।'
ফোরামের সাধারণ সম্পাদক কাশিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব হোসেন বলেন, 'আমরা চেয়ারম্যান হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া হোক।' তিনি আরো বলেন, 'বেশি কথা বলতে গেলে আমাকেও খুন হতে হবে।'

No comments

Powered by Blogger.