উপন্যাস- আমরা কেউ বাসায় নেই-(ছয়) by হুমায়ূন আহমেদ

‘রগট ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা টগর সাহেব আষাঢ়ি অমাবস্যায় গৃহত্যাগ করিয়াছেন। ঢাকার নিকটবর্তী গাজীপুর শালবনে তিনি কিছুদিন তপস্যায় থাকিবেন এমন আভাস পাওয়া গিয়াছে। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গিয়াছে, তাঁহার কিছু ভাবশিষ্য তাঁহার অনুগমন করিয়াছে। ইহাদের মধ্যে ব্যাঙা ভাইয়ের নাম উল্লেখযোগ্য।’
টগর ভাইয়ার গৃহত্যাগ খবরের কাগজের বিষয় হলে এ রকম একটা খবর হতে পারত। তা হলো না। ভাইয়া ঝড় ও শিলাবৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাত নটায় বাড়ি ছাড়ল। বাবা তখন উঠানে বসে শিলাবৃষ্টি দেখছেন।
মরি নামের মেয়েটা ছাতা মাথায় দিয়ে শিল কুড়াচ্ছে। তার উৎসাহ দেখার মতো। মানুষের স্বভাব হচ্ছে সে অন্যের অতি-উৎসাহী কর্মকাণ্ডে একসময় অজান্তেই নিজেকে যুক্ত করে ফেলে। বাবা তা-ই করেছেন। মরিকে কোথায় বড় শিল আছে বলে দিচ্ছেন, ‘মরি, টিউবওয়েলের কাছে যাও। দুটা বড় বড় আছে। আরে, এই মেয়ে তো চোখেই দেখে না। টিউবওয়েলের উত্তরে।’
এই অবস্থায় ভাইয়া হাসিমুখে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, বাবা! যাই।
বাবা বললেন, কোথায় যাও?
অমাবস্যায় বাড়ি ছেড়ে যাব বলেছিলাম। আজ অমাবস্যা!
বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছ?
হুঁ।
কোথায় যাবে?
গাজীপুরের শালবনের দিকে যাবার একটা সম্ভাবনা আছে। এখনো ঠিক করিনি।
তোমার মা জানে যে তুমি চলে যাচ্ছ?
জানে। তার কাছে বিদায় নিয়ে এসেছি।
তোমাকে আটকানোর চেষ্টা করেনি?
না। মা অস্থির তার পায়ের ব্যথায়। আহ-উহ করেই কুল পাচ্ছে না। আমাকে কি আটকাবে।
বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার মা যখন তোমাকে কিছু বলেনি, আমিও বলব না। শুধু একটি কথা, তুমি বিকৃতমস্তিষ্ক যুবক।
ভাইয়া মনে হয় বাবার কথায় আনন্দ পেল। তার ঠোঁটের কোনায় সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল। বাবা বললেন, মিডিয়কার যদি নষ্ট হয়, তাতে তার নিজের ক্ষতি হয়। সমাজে তার প্রভাব পড়ে না। মেধাবীরা নষ্ট হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমাজ-সংসার ছেড়ে তোমার জঙ্গলে পড়ে থাকা বাঞ্ছনীয়।
ভাইয়া বলল, ‘জি, আচ্ছা।’ বলেই উঠানে নেমে মরির হাত থেকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছাতা নিয়ে বের হয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় মরি হকচকিয়ে গেছে। সে শিলভর্তি মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময় তার মাথায় বড় সাইজের একটা শিল পড়ল। ‘ও আল্লা গো’ বলে সে উঠানে চিত হয়ে পড়ে গেল। সুন্দর দৃশ্য। একটি বালিকা চিত হয়ে পড়ে আছে। তার ওপর বৃষ্টি ও শিল পড়ছে। এমন দৃশ্য সচরাচর তৈরি হয় না। আমি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, বাবার ধমক শুনে সংবিত ফিরল। বাবা বললেন, মেয়েটাকে তুলে আন।
আমি বললাম, থাকুক না।
বাবা বললেন, থাকুক না মানে? থাকুক না মানে কী?
আমি বললাম, থাকুক না মানে হলো, মরি চিত হয়ে উঠানে শুয়ে আছে, থাকুক। শিলাবৃষ্টির মধ্যে এ রকম শুয়ে থাকার সুযোগ সে আর পাবে বলে মনে হয় না।
আমার কথা শুনে বাবা বিকট চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলেন। বাবার চিৎকার শুনে মা তীক্ষ গলায় চেঁচাতে লাগলেন, ‘কী হয়েছে? এই, কী হয়েছে?’ ড্রাইভার ইসমাইল মনে হয় নামাজে ছিল। নামাজ ফেলে সে ছুটে এল। উঠানে মরিকে পড়ে থাকতে দেখে সে হতভম্ব গলায় বলল, স্যার! কী হয়েছে? মারা গেছে? ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন!
হইচই শুনেই মনে হয় মরির জ্ঞান ফিরল। সে এখন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। তার হাতে কাচের পানির জগ। জগ ভর্তি শিল। মরির মাথা ফেটেছে। সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে জগে। ধবধবে সাদা বরফখণ্ডের ভেতর লাল রক্ত। অদ্ভুত দৃশ্য।
পদ্ম এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়। সে হঠাৎ শব্দ করে হেসে ফেলল। এর মধ্যে হাসির কী উপাদান সে খুঁজে পেয়েছে কে জানে!
ভাইয়ার গৃহত্যাগের দ্বিতীয় দিবস। রগট ধর্মমতের সাল গণনায় ০২.০১.০১ রগট সন। এই দিনে বাবার গাড়ি ফিরে এল। ইঞ্জিন মোটামুটিভাবে সারানো হয়েছে। বছর খানেক ঝামেলা ছাড়াই চলবে। গাড়ি সারাইয়ের কাজটা করেছে ছগীর মিস্ত্রি। সে পদ্মর মায়ের বিশেষ পরিচিত। বস্তিতে তার ঘর ছিল পদ্মর মায়ের ঘরের পাশে। গাড়ির সঙ্গে ছগীর মিস্ত্রি এসেছে। কালিঝুলিমাখা একজন হাসিখুশি মানুষ। তার কাছেই জানলাম, গাড়ি সারাইয়ে ত্রিশ হাজার টাকা বিল হয়েছে। পদ্মর মা বললেন, আমার গাড়ি ঠিক করেছ, তার জন্যে তোমাকে বিল দিব কী জন্যে? এক পয়সাও পাবে না।
ছগীর পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল, না দিলে নাই।
পদ্মর মা বললেন, গোসল করো। খাওয়াদাওয়া করে তারপর যাবে।
ছগীর বলল, গোসল করব কীভাবে? কাপড়চোপড় আনি নাই।
পদ্মর মা বললেন, কাপড়ের ব্যবস্থা হবে।
ড্রাইভার ইসমাইলকে পাঠিয়ে নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি কিনে আনানো হলো। ছগীর মিয়া আয়োজন করে কলপাড়ে গোসল করতে বসেছে। তার মাথায় সাবান ঘসে দিচ্ছে পদ্ম। পদ্মর পাশেই তার মা বসা। ছগীর নিশ্চয়ই মজার কোনো কথা বলছে। মা-মেয়ে হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। পদ্ম ছগীর মিস্ত্রিকে ডাকছে ‘দুষ্ট বাবা’। যতবারই পদ্ম ‘দুষ্ট বাবা’ ডাকছে, ততবারই ছগীর বিকট ভেংচি দিচ্ছে। ঘনিষ্ঠ পারিবারিক চিত্র।
বাবা এই দৃশ্য দেখে আমাকে ডেকে পাঠালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, দাড়িওয়ালা ওই লোক কে?
তার নাম ছগীর। সে মোটর মেকানিক। তোমার গাড়ি ঠিক করে এনেছে। পদ্মর মায়ের চেনা লোক।
বিল কত করেছে?
কোনো টাকা-পয়সা দিতে হবে না বলে মনে হচ্ছে।
এখানে গোসল করছে কেন?
গোসল করে খাওয়াদাওয়া করে গেস্টরুমে ঘুমাবে। আমার ধারণা, পদ্মর মা নতুন গেস্টরুম এই লোকের জন্যে নিয়েছে। এতে তোমার যে সুবিধা হবে, তা হলো গাড়ি নষ্ট হলে চিন্তা করতে হবে না। গাড়ি সরাইয়ের মিস্ত্রি ঘরেই আছে।’
বাবা বললেন, তুমি এই ধরনের কথাবার্তা তোমার ভাইয়ের কাছে শিখেছ। নিজের মতো হও, অন্যের ছায়া হবার কিছু নাই।
আমি বিনীত গলায় বললাম, বাবা, এখন তাহলে যাই? একটা জরুরি কাজ করছি।
কী জরুরি কাজ করছ?
মিস্ত্রি ছগীরের গোসল দেখছি।
বাবার হতাশ চোখের সামনে থেকে বের হয়ে এলাম।
মিস্ত্রি ছগীর খাওয়াদাওয়া শেষ করে মাতা-কন্যাকে নিয়ে বের হলো। গাড়ি টেস্টিং হবে। ঘণ্টা দুই তারা গাড়ি নিয়ে ঘুরবে। নিউমার্কেটে নাকি কিছু কেনাকাটাও আছে। মা-মেয়ে দুজনই আনন্দে কলকল করছে।
গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে পদ্ম এবং তার মা রিকশা করে ফিরে এল। গাড়ি আবার বসে গেছে। ছগীর গাড়ি গ্যারেজে নিয়ে গেছে।
আমি ভাইয়ার ঘরে শুয়ে আছি। আমার বুকের ওপর ভাইয়ার একটা বই। এসিমভের লেখা The Winds of Change. বইটা ভাইয়ার মতো উল্টো করে ধরেছি। পড়তে গিয়ে মাথায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে—
‘Sraet otni tsrub dna deddon ehs.’
অনেকক্ষণ এই বাক্যটার দিকে তাকিয়ে দুটি শব্দের খোঁজ পেলাম। dna মানে and এবং ehs-এর মানে she.
বই উল্টা করে ধরে রেখেছেন কেন?
আমি বই নামিয়ে তাকালাম, পদ্ম ঘরে ঢুকেছে। তার হাতে চায়ের কাপ। সে কাপে চুমুক দিচ্ছে। পদ্ম বলল, চা খাবেন?
আমি বললাম, খেতে পারি।
পদ্ম চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, তিনটা চুমুক দিতে পারেন। এর বেশি না।
আমি উঠে বসতে বসতে বললাম, তোমার চুমুক দেওয়া চা আমি খাব কেন?
পদ্ম চেয়ারে বসতে বসতে বলল, খেতে না চাইলে নাই। চা-টা ভালো হয়েছে। এক চামচ খেয়ে দেখতে পারেন।
না।
পদ্ম বলল, ধমক দিয়ে ‘না’ বলার দরকার ছিল না। মিষ্টি করে বললেও হতো। যা-ই হোক, আমি কি কিছুক্ষণ গল্প করতে পারি?
হ্যাঁ, পারো।
হঠাৎ আপনার সঙ্গে গল্প করতে চাচ্ছি কেন, জানেন?
না।
পদ্ম হাসতে হাসতে বলল, আমিও জানি না।
আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। মেয়েটাকে আজ অন্য দিনের চেয়ে সুন্দর লাগছে। সাজগোজ কি করেছে? চোখে মনে হয় কাজল দিয়েছে। মেয়েরা সামান্য সেজেও অসামান্য হতে পারে।
পদ্ম বলল, আমি আপনাকে একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করব। উত্তর দিতে পারবেন?
আমি বললাম, ধাঁধা খেলার মধ্যে আমি নাই।
উত্তর দিতে পারলে পুরস্কার আছে।
কী পুরস্কার?
পদ্ম চাপা হাসি হেসে বলল, টাকা-পয়সা লাগে এমন কোনো পুরস্কার না। এ ছাড়া আমার কাছে যা চাইবেন তা-ই। ভয়ংকর খারাপ কিছুও চাইতে পারেন। ধাঁধাটা হচ্ছে, এমন একটা পাখির নাম বলুন যে পাখি মানুষের কথা বুঝতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে।
পারলাম না।
ইশ! আপনার কপালে পুরস্কার নেই। পাখির নাম হচ্ছে ব্যাঙামা বাঙামি। রূপকথার বইতে পড়েন নাই?
আমি ছাড়াও নিশ্চয়ই অনেককে এই ধাঁধা জিজ্ঞেস করেছ। কেউ কি পেরেছে?
একজন পেরেছিল।
সে কি পুরস্কার পেয়েছে?
সেটা আপনাকে বলব না।
পদ্ম চায়ের কাপ নিয়ে বের হয়ে গেল। আমি বই উল্টো করে ধরে আবার পড়ার চেষ্টা করছি। এর নাম সাধনা। সাফল্য না আসা পর্যন্ত সাধনা চালিয়ে যেতে হবে—
‘em dlot ton dah uoy.’
এই তো, এখন পারছি, em হলো me, dlot হলো told.
ভাইজান, চা নেন।
রহিমার মা চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, চা তো চাইনি, রহিমার মা।
পদ্ম আপা বলেছে, আপনি চা চাইছেন।
আমি উঠে বসে চায়ের কাপ হাতে নিলাম। রহিমার মা ক্লান্ত গলায় বলল, বড় ভাইজানের কোনো খবর জানেন?
আমি বললাম, না।
রহিমার মা বলল, ওনার তো মোবাইলও নাই যে একটা মোবাইল ছাড়ব। মনটা এমন অস্থির হয়েছে, ওনাকে নিয়া একটা বাজে খোয়াব দেখেছি। কী দেখছি শুনবেন?
বলো, শুনি।
স্বপ্নে দেখলাম, উনি শাদি করেছেন।
এটা খারাপ স্বপ্ন হবে কেন? এটা তো ভালো স্বপ্ন।
খারাপটা এখনো বলি নাই। বললে বুঝবেন কত খারাপ! স্বপ্নে দেখলাম, শাদির কারণে দুনিয়ার মেহমান আসছে। কইন্যা যেখানে সাজাইতাছে, সেইখানে সুন্দর সুন্দর মেয়েছেলে। শইল ভর্তি গয়না, চকমকা শাড়ি। আমিও তাহার সাথে আছি, আমোদ-ফুর্তি করতাছি। আমার একটাই ঘটনা, শইল্যে কাপড় নাই। কাপড় দূরের কথা, একটা সুতাও নাই। কেমন লইজ্যার কথা চিন্তা করেন। এখন আমি কী করি, বলেন, ভাইজান?
আমি ভাইয়ার মতো হাই তুলতে তুলতে বললাম, তোমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। নেংটো হয়ে ঘর থেকে বের হবে না।
এটা কেমন কথা বললেন! নেংটা হয়ে ঘর থেকে কী জন্যে বের হব? আইজ পর্যন্ত শুনছেন নেংটা হইয়া কেউ ঘর থাইকা বাইর হইছে?
শুনেছি। জৈন ধর্মের সাধুরা বাড়িতে সব কাপড় খুলে রেখে বের হন। পাগলরাও তা-ই করে।
আপনার কি মনে হয়, আমি পাগল হয়ে গেছি?
এখনো হও নাই, তবে হবে।
রহিমার মা হতাশ চোখে তাকিয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে, পাগল হওয়ার আশঙ্কা সে নিজেও বিশ্বাস করছে।
বড় ধরনের ক্রাইসিসের মুখোমুখি হলে মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখে। সমুদ্রপারের জেলে-স্ত্রীরা প্রতিরাতেই স্বপ্ন দেখে, সমুদ্রে ঝড় উঠেছে। ঝড়ে নৌকাডুবি হয়ে তাদের স্বামীরা মারা গেছে।
আমাদের পরিবারের প্রধান, বাবা, ভয়ংকর ক্রাইসিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কী দুঃস্বপ্ন দেখছেন তা জানা যাচ্ছে না। বাবার ক্রাইসিসগুলো কী দেখা যাক—
১. দ্বিতীয় গেস্টরুম দখল হয়ে গেছে। পদ্মর মা সুচ হয়ে ঢুকে এখন ফাল হয়ে আছেন। কিছুদিনের মধ্যে ট্রাক্টর হবেন, এমন নমুনা দেখা দিয়েছে।
২. বাড়িতে দুটি দল তৈরি হয়েছে। বাবার দল অর্থাৎ সরকারি দল। পদ্মর মার দল অর্থাৎ বিরোধী দল। বিরোধী দল দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। ড্রাইভার ইসমাইল সরকারি দল ত্যাগ করে বিরোধী দলে যোগ দিয়েছে। এখন সে দুই বেলাই পদ্মর মায়ের রান্না খাচ্ছে। তাঁর বাজার করে দিচ্ছে।
৩. মায়ের পা জোড়া লাগছে না। সারা রাত তিনি ব্যথায় চিৎকার করেন। বাবা ঘুমাতে পারেন না। ভোরবেলায় পায়ের ব্যথা খানিকটা কমে, তখন মা ঘুমাতে যান।
৪. যক্ষ্মা রোগগ্রস্ত খড়ম পায়ের যে ভূত গেস্টরুমে থাকত, সে ঘরছাড়া হয়ে বাবার ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। নানা ধরনের ভৌতিক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। বাবা তার আতঙ্কে অস্থির হয়ে আছেন। বাবার পরিচিত এক পীরসাহবে তাবিজ দিয়েছেন। পঞ্চধাতুর তাবিজ। বাবা ডান হাতে বেঁধে রেখেছেন। তাবিজে লাভ হচ্ছে না, বৃদ্ধ ভূত যন্ত্রণা করেই যাচ্ছে। ভূতের যন্ত্রণার নমুনা: মায়ের পায়ে ব্যথার কারণে বাবা অঘুম রাত কাটাচ্ছেন। হঠাৎ একটু চোখ ধরে এল, ঘুম এসে যাচ্ছে ভাব কিংবা ঘুম এসে গেছে, তখনই বাবার কানের কাছে বিকট ভৌতিক কাশি। বাবা ধড়ফড় করে জেগে উঠে দেখেন, কোথাও কেউ নেই। এই ঘটনা একবার ঘটেছে তা না, প্রতি রাতেই কয়েকবার করে ঘটছে। একদিন ইউনিভার্সিটিতে যাবেন, জুতাজোড়া সামনে নিয়ে বসেছেন। বাঁ পায়ের জুতা পরেছেন [তিনি লেফট হ্যান্ডার, তাঁর সবকিছু বাঁ দিয়ে শুরু হয়], ডান পায়েরটা পরতে যাবেন, তাকিয়ে দেখেন জুতা নেই। সেই জুতা পাওয়া গেল বাথরুমের কমোডে। নোংরা পানিতে মাখামাখি। বৃদ্ধ ভূতের কাণ্ড, বলাই বাহুল্য।
ভাইয়া বাসায় থাকলে এই ঘটনার লৌকিক ব্যাখ্যা দাঁড়া করিয়ে ফেলত। ভাইয়া বলত, নানান ঝামেলায় বাবা আছেন ঘোরের মধ্যে। তিনি নিজেই নিজের জুতা কমোডে ফেলে এসেছেন। আর কানের কাছে কাশির ব্যাখ্যা হলো, বাবা নিজের কাশি শুনে জেগে উঠেছেন। তার ক্রনিক খুকখুক কাশি। ঘুমের মধ্যে এই খুকখুক কাশিই প্রবল শোনাচ্ছে বলে তিনি ধড়মড় করে জেগে উঠছেন।
বাবার ছোটখাটো ঝামেলার কথা এতক্ষণ বলা হলো। এখন বলা হবে প্রধান ঝামেলা। তিনি উকিলের নোটিশ পেয়েছেন। নোটিশে লেখা, ‘সালমা বেগমের জমির ওপর অবৈধভাবে ঘরবাড়ি তুলে আপনি বাস করছেন। নোটিশ পাওয়ামাত্র আপনি সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন। অন্যথায় আমরা আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হব।’
নোটিশ পাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে বাবার বয়স পাঁচ বছর বেড়ে গেল। তিনি বেতের ইজিচেয়ারে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শুয়ে রইলেন। সন্ধ্যায় ড্রাইভার ইসমাইলের মাগরেবের আজান শুনে তিনি চেয়ার থেকে উঠলেন। অজু করে নামাজ পড়তে গেলেন। বাবাকে আমি এই প্রথম নামাজ পড়তে দেখলাম।
নোটিশের বিষয় আমি জানলাম রাত আটটায়। বাবা নিজেই নোটিশ হাতে আমার ঘরে ঢুকলেন। আমাকে বললেন, এখন আমাদের করণীয় কী? আমি এক্সট্রিম কিছু করার চিন্তা করছি। কাঁটা তুলতে হয় কাঁটা দিয়ে।
আমি বললাম, তুমি কী করতে চাচ্ছ? খুনখারাবি?
বাবা চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, খুনখারাবির লাইনে চিন্তা করলে ব্যাঙা ভাইকে খবর দিতে হবে। উনি নিমেষে কার্য সমাধা করবেন, কেউ কিছুই জানবে না।
ব্যাঙা ভাইটা কে?
ভাইয়ার অতি পরিচিত একজন। ভাইয়াকে সে ওস্তাদ ডাকে।
এ রকম একটা ক্যারেক্টারের সঙ্গে তোমার ভাইয়ার পরিচয় কীভাবে হলো?
তা জানি না, তবে পরিচয় থাকায় আমাদের কত সুবিধা হয়েছে এটা দেখো। তোমাকে নিজের হাতে খুন করতে হচ্ছে না।
বাবা বললেন, Don’t talk nonsense. তুমি এই নোটিশ নিয়ে মহিলার কাছে যাও। এ রকম একটা নোটিশ পাঠানোর অর্থ কী জেনে আসো।
আমি বললাম, আমি যাব না, বাবা। আমি গেলে ওই মহিলা আমার গায়ে এসিডের বোতল ছুড়ে মারবে। তুমি যাও, তুমি মুরব্বি মানুষ। তোমার গায়ে এসিড হয়তো মারবে না।
বাবা বেশ কিছু সময় অপলক আমার দিকে তাকিয়ে থেকে নোটিশ হাতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
রাত এগারোটা বাজার কিছু আগে বাবার ঘরে আমার ডাক পড়ল। ঘরে ঢুকে দেখি বাবার সামনে পদ্মর মা বসে আছেন। বাবার হাতে উকিলের নোটিশ। আমি বাবার পাশের মোড়ায় বসলাম। বাবা অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমাকে দেখে খুব ভরসা পেয়েছেন, এ রকম মনে হলো না।
পদ্মর মা বললেন, ভাই, কী বলবেন বলুন। পদ্মর জ্বর এসেছে। তার গা স্পঞ্জ করতে হবে।
বাবা কয়েকবার গলা খাকারি দিলেন। তাতেও গলা তেমন পরিষ্কার হলো না। তিনি ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, আজ একটা উকিল নোটিশ পেয়েছি। আমাকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে।
পদ্মর মা বললেন, আপনার হাতে তো সময় আছে। ত্রিশ দিনের সময়। এখনই ঘরবাড়ি ছাড়তে হবে তা তো না। জিনিসপত্র যদি নিয়ে যেতে চান, আমি নিষেধ করব না।
ভাবি, এই সব আপনি কী বলছেন?
পদ্মর মা খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, আপনাকে বিকল্প একটা প্রস্তাব দেই। প্রতি মাসে কুড়ি হাজার টাকা করে আমাকে বাড়িভাড়া দিবেন।
আমি নিজের বাড়িতে থেকে আপনাকে বাড়ি ভাড়া দিব?
এটা আপনার নিজের বাড়ি না। আপনি আমার জমির ওপর অবৈধভাবে বাড়ি তুলেছেন। আমার কাছে কাগজপত্র আছে। আমার যা বলার আমি বলেছি। আপনার যদি তার পরেও কিছু বলার থাকে, কোর্টে বলবেন।
পদ্মর মা উঠে চলে গেলেন। হতভম্ব বাবার দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, বাবা, তোমার জন্যে একটা গুড নিউজ আছে।
বাবা চাপা গলায় বললেন, গুড নিউজটা কী?
তোমার গাড়ি মনে হয় আবার ঠিক হয়েছে। ছগীর মিস্ত্রি গাড়ি নিয়ে এসেছে। এক কাজ করো, মাকে নিয়ে গাড়িতে করে ঘুরে আসো। তোমার ভালো লাগবে।
বাবা মূর্তির মতো বসে রইলেন। কোনো জবাব দিলেন না। মায়ের পায়ের ব্যথা মনে হয় খুব বেড়েছে। তাঁর কাতরানি শোনা যাচ্ছে। পায়ের হাড় জোড়া না লাগলে এ রকম ব্যথা হয় তা জানতাম না। অন্য কোনো সমস্যা না তো?
বাবা ক্লান্ত গলায় বললেন, রহিমার মা বলছে ড্রাইভার ইসমাইলের সঙ্গে জিন থাকে, এই বিষয়ে কিছু শুনেছ?
শুনেছি। জিনের নাম মাহি, তার স্ত্রীর নাম হামাছা। জিনের বয়স তিন হাজার বছর। স্ত্রীর বয়স জানি না। কিছু কম নিশ্চয়ই হবে।
তোমার বিশ্বাস হয়?
না।
বাবা বললেন, শেক্সপিয়ার বলেছেন, ‘There are many things in heaven and earth.’
আমি বললাম, শেক্সপিয়ারের ওপর কথা নাই। উনি যখন বলেছেন তখন বিশ্বাস হয়।
বাবা বললেন, জিনরা ভবিষ্যৎ বলতে পারে। জিনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানতে পারলে হতো।
মাহি সাহেবকে জিজ্ঞেস করব?
বাবা চুপ করে রইলেন। ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো ধরে। এই প্রথমজনকে দেখলাম জিন ধরতে চাইছেন।
রগট সন অনুযায়ী আজ ০৩.০১.০১। সময় রাত নয়টা। ভাইয়ার ঘরে জিন নামানো হচ্ছে। ড্রাইভার ইসমাইল জায়নামাজে বসা। বাবা আর আমি খাটে বসে আছি। আমাদের দুজনই অজু করে পবিত্র হয়েছি। আগরবাতি জ্বলছে। দরজা-জানালা বন্ধ। ঘর অন্ধকার। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ইসমাইল একমনে সূরায়ে জিন আবৃত্তি করছে। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে সূরার শব্দ মিলে অতি রহস্যময় পরিবেশ।
ইসমাইল সূরা আবৃত্তি বন্ধ করে বলল, মাহি উপস্থিত হয়েছেন। কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাইলে আদবের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেন। প্রথমে সালাম দিবেন।
বাবা ভয়ে ভয়ে বললেন, আসসালামু আলায়কুম।
গম্ভীর এবং খানিকটা বিকট গলায় কেউ একজন বলল, ওয়ালাইকুম সালাম।
এই গলা ইসমাইলের না। তার গলা মেয়েলি। সে কি গলা চেপে এমন শব্দ বের করছে? ডেন্ট্রিকুয়েলিজম?
বাবা বললেন, জনাব, আমার বড় ছেলে কোথায় বলতে পারবেন?
তার নাম কী?
ডাক নাম টগর।
ভালো নাম বলেন।
আবদুর রশীদ।
জিন বলল, সে জঙ্গলে আছে। তার শরীর ভালো না।
কী হয়েছে?
বুখার হয়েছে।
তার কি বাড়িতে ফেরার সম্ভাবনা আছে?
এক বৎসর পরে ফিরবে। অল্প সময়ের জন্য। এই বাড়িতে সে থাকবে না।
বাবা বললেন, আমার আর কোনো প্রশ্ন নাই। মনজু, তুই কিছু জানতে চাস?
আমি বললাম, জনাব, আপনার স্ত্রীর কথা শুনেছি। ছেলেমেয়ে কি আছে?
আমার সাত ছেলে। মেয়ে নাই।
আপনাদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কি আছে?
এই প্রশ্নের উত্তরে হুম-হাম শব্দ হলো। তার সঙ্গে খকখক কাশি। ইসমাইল বলল, ভাইজান, আপনার কথায় মাহি বিরক্ত হয়েছেন।
আমি বললাম, সরি।
আমি বললাম, একটা শেষ প্রশ্ন, আপনাদের অসুখ-বিসুখ আছে বুঝতে পারছি। আপনি কাশছেন। পাতলা পায়খানা, যাকে ভদ্র ভাষায় বলা হয় ডায়েরিয়া, তা কি আপনাদের হয়?
মাহি আমার প্রশ্নে খুব মনে হয় রাগল। হুম-হাম শব্দ বৃদ্ধি পেল। আর তখনই বন্ধ দরজায় কেউ ধাক্কাতে লাগল। প্রবল ধাক্কা। দরজা খুলে দেখি ভাইয়া দাঁড়িয়ে।
ভাইয়া বলল, দরজা বন্ধ করে কী করছিস? ঘর অন্ধকার কেন?
আমি বললাম, জিন নামানো হচ্ছে।
ভাইয়া বলল, ভেরি গুড। জিন নেমেছে?
আমি বললাম, নেমেছে, মনে হয় চলেও গেছে। তুমি ফিরে এলে কেন?
ভাইয়া বলল, যেদিন ঘর ছেড়েছি, সেদিন অমাবস্যা ছিল না। তার আগের দিন ছিল। কাজেই চলে এসেছি। এবার পঞ্জিকা দেখে, আবহাওয়া অফিসে খোঁজ নিয়ে বের হব। আরে, তোর ঘরে বাবাও বসে আছে দেখি! বাবা কেমন আছ?
বাবা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। পুত্রের ফেরত চলে আসায় তিনি আনন্দিত না দুঃখিত বোঝা গেল না। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই রহিমার মাকে পোলাও রাঁধতে বললেন। পোলাও ভাইয়ার অতি পছন্দের খাবার।
[চলবে]
===============================
উপন্যাস- আমরা কেউ বাসায় নেই-(পাঁচ)  উপন্যাস- আমরা কেউ বাসায় নেই-(চার)  উপন্যাস- আমরা কেউ বাসায় নেই-(তিন)  উপন্যাস- আমরা কেউ বাসায় নেই-(দুই)  উপন্যাস- আমরা কেউ বাসায় নেই-(এক)  গল্প- পৃথিবীর দীর্ঘতম হাত  কালা পানির অনশন  লেখক না হলে গোয়েন্দা হতাম  অভিবাসী মানুষদের উপন্যাস  আগুনের পরশমণি  প্রেমাংশুর রক্ত চাই  গল্প- কোথায় তুমি  কবিতা বাতাসে অক্সিজেন ছড়ায়  সত্যজিৎ আমার গুরু ছিলেন  গল্প- দৌড়  বাংলা ঋতু-মাসের নামবিচার  যেভাবে মায়ের মন জয় করল বাবা  মানিক পীরের গান  গল্প- চুপি চুপি বাঁশি বাজে  গল্প- বিধুহীন  গল্প- অসমাপ্ত চুম্বনের ১৯ বছর পর...  গল্প- বসন্ত বিলাপ  খোয়াবের প্রতিলিপি  গল্প- জিঞ্জির ফেরা  দুর্লভ সময়ের হলফনামা  ইচ্ছা ছিল কবি হওয়ার  আমার গ্রন্থাগার  সোনার কমলার খোঁজে  রূপবান ঢাকার রক্তক্ষরণ  নারী জীবনের অচলায়তন  'ত্যাগের' মূল্যায়ন ও মুক্তকণ্ঠ তারুণ্য  মূল সংবিধান সংরক্ষণে সরকারের ইউটার্ন  তুরস্কে জেনারেলদের পদত্যাগ কেন?  ছোট দলগুলো ফুরফুরে মেজাজে!  কোচিং ব্যবসা এবং শিক্ষার বেহাল দশা  গল্প- লঞ্চের আপার ক্লাসে বাচ্চা হাতি  গুরুপল্লির আশ্রমে ভর্তি না হয়েই  মুক্তিযুদ্ধের ১০ বই  মগ্নচৈতন্যের বর্ণময় অভিঘাত  গল্প- চিনেজোঁক  পুস্তক প্রকাশনা ও বাংলা একাডেমীর বইমেলা  শাহি মনজিলে সাহিত্য উৎসব by শাহীন আখতার  বাজে জসীমউদ্দীন  নান্দনিক চৈতন্য  গ্রামকে শহরে এনেছি  গল্প- জলঝড়  একাত্তরের অপ্রকাশিত দিনপঞ্জি  রশীদ করীমে'র সাক্ষাৎকার- 'মনে পড়ে বন্ধুদের'  প্রাচ্যের ছহি খাবনামা  গল্প- এভাবেই ভুল হয়  গল্প- মাঠরঙ্গ  ফয়েজ আহমেদঃ স্মৃতিতে চিঠিতে  অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকারঃ উপন্যাসের জগতের জগতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই  ইতিহাস ও জাতি দিয়ে ঘেরা


দৈনিক প্রথম আলো এর সৌজন্যে
লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ


এই উপন্যাস'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.