মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্তে নিয়ে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। এ ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধ শেষে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কীভাবে রাখা হবে, তা মূল্যায়ন করছে পেন্টাগনের নীতি বিভাগ। একই সঙ্গে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও জয়েন্ট স্টাফ।

পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পর্যালোচনার নির্দেশ দেননি। তবে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হবে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ঘিরে দেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। এমনকি তার নিজের কিছু সমর্থকও প্রশ্ন তুলেছেন, কারণ নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প ‘আর কোনো বিদেশি যুদ্ধ নয়’- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

গত মাসে হেগসেথ জানিয়েছিলেন, ইরান সংঘাতে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক ডজন উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এগুলো ইরাক, সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে অবস্থিত। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি। সেন্টকমের হিসাবে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পেন্টাগনের প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে বেশি হতে পারে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা হয়।

ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর। এই নৌবহর পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশে দায়িত্ব পালন করে।

কাতারে অবস্থিত ২৪ হেক্টরের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। ২০২৫ সালের সংঘাতের সময় এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও ঘাঁটিটি ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মার্কিন স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে।

সংঘাতের ধরন অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনার সংখ্যা গত কয়েক দশকে ওঠানামা করেছে। সিএফআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক অভিযানের সময় সেখানে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সেনা মোতায়েন ছিল। ২০১১ সালে আফগানিস্তানেও ছিল প্রায় ১ লাখ মার্কিন সেনা।

এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়িয়েছিল ওয়াশিংটন। ওই সময় বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান ও বিমানবাহী রণতরী ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়।

তবে যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন নৌসেনাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজে মোতায়েন থাকা সেনারা তাদের পরিবারের কাছে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনের কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

সূত্র : দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট 

কাতারের আল-উদেদ বিমান ঘাঁটিতে সেনা পরিদর্শনে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
কাতারের আল-উদেদ বিমান ঘাঁটিতে সেনা পরিদর্শনে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি