তুরস্কের ঘাঁটি নিয়ে ইসরায়েলের ভয়: সিরিয়ায় হামলার আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ করেন মোসাদপ্রধান

রয়টার্সঃ সিরিয়ায় সম্প্রতি ইসরায়েলের বিমান হামলার কয়েক দিন আগে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধানের সঙ্গে সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি ফোনালাপ হয়েছে। এ ফোনালাপে তাঁরা সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মোসাদপ্রধান রোমান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির মধ্যে ১৪ আগস্ট এ ফোনালাপ হয়। এটি সিরিয়ার ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রশাসনের সঙ্গে ইসরায়েলের এযাবৎকালের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। ফোনালাপের ঠিক চার দিন পর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সাধারণত মোসাদ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলার পর গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দামেস্ক প্রশাসন সিরিয়ায় তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। নেতানিয়াহুর দাবি, সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েন করা হলে তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে। এ বিষয়ে তারা সিরিয়াকে বারবার সতর্ক করলেও আল-শারা প্রশাসন তা আমলে নেয়নি।

দুটি সূত্র বলছে, হামলার চার দিন আগে মোসাদপ্রধান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মধ্যে এ ফোনালাপ হয়। এতে সিরিয়াকে দেওয়া তুরস্কের সামরিক সহায়তার বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। সূত্র আরও জানায়, ফোনালাপে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, অস্ত্র বিক্রি, ড্রোন সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েল নানা তথ্য জানতে চায়। সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে তুরস্ক অস্ত্র সরবরাহ করছে কি না, গফম্যান সেটিও জানতে চান।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় আরেকটি সূত্র ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়েই মূলত কথা হয়েছে।

এদিকে এ ফোনালাপের বিষয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তুরস্ক-সিরিয়া সম্পর্ক নিয়ে নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি

সিরিয়ায় ২০২৪ সালে ‘স্বৈরশাসক’ বাশার আল-আসাদ সরকারকে হটিয়ে দেন আল-শারার নেতৃত্বে দেশটির বিদ্রোহীরা। এর পর থেকে তুরস্ক শারা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। এর আগেও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্ক বাশার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়। সিরিয়ায় তুরস্কের এ ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইসরায়েলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিরিয়ার শাসক আল-শারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। গত জুলাই মাসে তিনি জানিয়েছিলেন, সিরিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তাচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ইসরায়েল যেন সিরিয়ার প্রতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে, সে জন্য অন্যান্য প্রভাবশালী দেশকে যুক্ত করে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টাও চালাচ্ছে দামেস্ক।

নেতানিয়াহু গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তায় সিরিয়াকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে পারে, সিরিয়ায় তুরস্কের এমন কোনো সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি ইসরায়েল সহ্য করবে না।’

সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলার দিকে ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমরা তুরস্ককে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, এমনটা করবেন না। তারা স্পষ্টত আমাদের বার্তা শোনেনি। তাই আমরা (সিরিয়ায় বিমান হামলা চালানোর মাধ্যমে) নিশ্চিত করেছি, যেন তারা (তুরস্ক) বার্তাটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে।’

তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় গত বুধবার ইসরায়েলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এগুলো ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তুর্কি প্রশাসনের মতে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর চালানো ‘অবৈধ বিমান হামলা’ বৈধতা দিতেই ইসরায়েল এ ধরনের অভিযোগ তুলছে।

তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বৈধ উপায়ে সিরিয়া সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। তবে নিজেদের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি।

তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক মঙ্গলবার বলেন, ইসরায়েলের এ বিমান হামলা ‘একটি অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে এ হামলা কোনো ভূমিকা রাখবে না’।

মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া আরেক বক্তব্যে টম বারাক বলেন, ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত না বাধে, সে জন্য ওয়াশিংটন একটি সমঝোতার উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। তিনি আরও জানান, এ তিন দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে অপেক্ষা করছেন রোমান গফম্যান। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে অপেক্ষা করছেন রোমান গফম্যান। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স