খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন করে দূষণমুক্ত জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি সব এলাকাতেই জনবিরোধিতা ও বেপরোয়া মুনাফার লোভ এখন দেশের গভীরে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এমনভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই ছড়িয়ে পড়া এখন দেখা যাচ্ছে, যা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে পরিচয় না হলে চিন্তা করাও সম্ভব নয়। ১৯৭২ সালেই এই প্রবণতা সৃষ্টি হয়ে এখন দেশে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জনবিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করার মতো কিছুই এখনও পর্যন্ত কোথাও নেই। বিস্তারিতভাবে এ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে না থাকলেও একটি দৃষ্টান্তই দেশের সাধারণ মানুষের চোখ খুলে দেয়ার মতো ব্যাপার। ৩ মে ২০১৭ তারিখে ঢাকার ইংরেজি দৈনিক New Nation-এর সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় 'In Threat to Food Security, Bangladesh moves to burn grain for fuel' শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে Thomson Reuters Foundation-এর পক্ষ থেকে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন দেশে উৎপাদিত শস্যের একটা অংশ ইথানল নামে জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ দেশের মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য তাদেরকে খেতে না দিয়ে, তার থেকে বঞ্চিত করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। বাংলাদেশে এখন খাদ্য উৎপাদন আগের থেকে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর কৃতিত্ব মূলত কৃষকদের। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিজেদের শ্রম দিয়ে খাদ্য পরিস্থিতির এই উন্নতি সাধন করেছেন। কিন্তু এই উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশে জনসংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে উৎপাদনের বৃদ্ধি জনগণের খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করেনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি এবং হঠাৎ করে খাদ্য সংকট এখনও দেশের একটা নিয়মিত ব্যাপার। এই মুহূর্তে সিলেটের হাওর এবং খুলনা অঞ্চলের বিলগুলো আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে বিপুল পরিমাণ ফসল নষ্ট করেছে। এর ফলে এসব এলাকায় খাদ্য সংকট শুধু যে এই মুহূর্তে দেখা দিয়েছে তাই নয়, ভবিষ্যতেও এই সংকট অব্যাহত থাকবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলার ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে যা নেয়া হয়েছে তা নামমাত্র ছাড়া আর কিছু নয়। সরকারি ত্রাণ মন্ত্রণালয় যে কোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা করতে অক্ষম এটা এক পরিচিত ব্যাপার। সিলেটে যে বিরাট আকারে ফসলের ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের পরিবর্তে সরকারি মহল থেকে লম্বা-চওড়া কথাবার্তা ও প্রতিশ্রুতি ছাড়া সাহায্য বলতে সামান্যই দেয়া হয়েছে। এটা কোনো ব্যতিক্রমী ব্যাপার নয়। এই হল জনগণের প্রতি সরকারের দায়িত্ব পালনের সাধারণ রীতি। ভুট্টা, চালের খুদ ও ঝোলাগুড় থেকেই ইথানল তৈরির পরিকল্পনা হচ্ছে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কোনো প্রকট খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ নেই; কিন্তু এটা সবারই জানা যে, এখানে কোটি কোটি লোক এখনও তিনবেলা পেট ভরে খাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। একবেলা খেয়ে গরিবরা কোনোমতে জীবন ধারণ করেন। এবং এই একবেলা খাওয়ার অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই চালের খুদ ফুটিয়ে জাউ তৈরি করে খাওয়া। ধনসম্পদের লাখ লাখ মালিক এবং মধ্যবিত্ত মানুষ এভাবে জাউ ভাত খান না। কাজেই জাউ ভাতের গুরুত্ব বোঝা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এখন এই জাউ ভাত থেকেও দেশের লোক বঞ্চিত হবেন, যদি তাদের খুদ গরিবের খাদ্যের পরিবর্তে ইথানল উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে মুরগিকে খাওয়ানোর জন্য ভুট্টা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এভাবে মুরগির খাদ্য হিসেবে যে পরিমাণ ভুট্টা প্রয়োজন হয় তার অর্ধেক আমেরিকা ও ব্রাজিল থেকে আমদানি করা হয়। ইথানল তৈরির জন্য ভুট্টা ব্যবহার করা হলে এবং সেই সঙ্গে মুরগির খাবার ব্যবস্থার জন্য বাইরে থেকে বিদেশী মুদ্রা খরচ করে আরও ভুট্টা আমদানি করতে হবে।
অর্থাৎ বাইরে থেকে ভুট্টা আমদানি করে ইথানল তৈরি করতে হবে। তাছাড়া এ পরিস্থিতিতে ভুট্টার দাম বেড়ে যাবে এবং ডিম ও মুরগির দামও সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে। সাধারণভাবে মুরগির খামারগুলো এর ফলে সংকটে নিক্ষিপ্ত হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চীনসহ অনেক দেশে এভাবে খাদ্যশস্য থেকে ইথানল তৈরি নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশ এখন এই আত্মঘাতী পথেই অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক সমীক্ষা অনুযায়ী এখানে এক কোটি আশি লাখ লিটার ইথানল তৈরির সম্ভাবনা আছে। এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রতি বছর ৬০,০০০ টন চালের খুদ অর্থাৎ দেশে উৎপাদিত চালের ৩.৫ শতাংশ। ইথানল উৎপাদনের জন্য ভুট্টার প্রয়োজন হবে ৬২,০০০ টন, যা হল মোট উৎপাদিত ভুট্টার ২.৮ শতাংশ। এর জন্য ঝোলাগুড় প্রয়োজন হবে ৯৭,০০০ টন, অর্থাৎ দেশে উৎপাদিত সমগ্র পরিমাণ! বাংলাদেশে দূষণমুক্ত জ্বালানি ব্যবহারের জন্যই সাধারণ মানুষ ও গরিবদের পেটে লাথি মেরে সরকার এখন এই পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য নিযুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের যথেষ্ট জোগান শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও নেই। International Food Policy Research Institute 1916 সালে যে Global Hunger Index তৈরি করেছে, তা অনুযায়ী বিশ্বের ক্ষুধিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান খুব ওপরে। এখানে ২৫ শতাংশ মানুষ ক্ষুধার মধ্যে দিন কাটান। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন ১ কোটি ৮০ লাখ টন চালের খুদ, ১ লাখ টন ঝোলাগুড় ও ৬০ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক। ভুট্টা মুরগি, গরু ইত্যাদির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলেও অনেক মানুষ ভুট্টা খেয়ে থাকেন, অনেক সময় আটার সঙ্গে মিশিয়ে। বাংলাদেশের ১৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। দেশে উৎপাদিত খাদ্য দেশের জনগণের খাদ্য চাহিদা মোটামুটি মেটাতে পারে বলা হলেও তার মধ্যে অনেক ফাঁক আছে। কারণ কোটি কোটি মানুষ তিনবেলা খাওয়ার পরিবর্তে দু’বেলা এবং একবেলা খেয়ে থাকেন।
এর বেশি খাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। কিন্তু এভাবে দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্য প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হলেও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশ ৪৫ লাখ টন গম আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশে মাথাপিছু কার্বন নির্গত হওয়ার পরিমাণ অন্য অনেক দেশের থেকে, বিশেষত ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান থেকে অনেক কম। কাজেই এখানে বায়ুদূষণ কমানোর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন করে ইথানল উৎপাদনের চিন্তা উদ্ভট এবং জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কহীন ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। অনেক কলকারখানা, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ অনেক শহরে আকাশচুম্বী সব ইমারত উঠেছে, পাঁচতারা হোটেলসহ মহার্ঘ হোটেল-রেস্তোরাঁর অভাব নেই, লাখ লাখ ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় চলাচল করছে, বড় বড় ব্যয়বহুল হাসপাতাল হয়েছে, বড় শহরগুলোতে উচ্চ বেতনের হাজার হাজার স্কুল হয়েছে। কিন্তু এই উন্নতি দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে স্পর্শ করেনি। এই উন্নতির ফল তাদের কাছে নেই। কাজেই তাদের জন্য দেশে কোনো উন্নতি নেই। তাদের খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ জ্বালানি তৈরি করে দেশের গরিবদের খাদ্য নিরাপত্তা আরও বিপন্ন করে খাদ্যশস্য থেকে ইথানল উৎপাদনের পরিকল্পনার থেকে জনবিরোধী কাজ আর কী হতে পারে?
০৬.০৫.২০১৭
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

No comments

Powered by Blogger.