গুরুতর অপরাধে পুলিশ-অবিলম্বে এই প্রবণতা রোধ করতে হবে

অনেক দার্শনিকই রাষ্ট্রহীন সমাজের কথা ভেবেছেন। অনেকে রাষ্ট্রকে 'প্রয়োজনীয় আপদ' বা 'নেসেসারি ইভিল' বলেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত সব দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মানুষের জীবন, সম্পদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।


অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাটাই হচ্ছে রাষ্ট্র তথা পুলিশ বাহিনীর প্রধান কাজ। সেই বাহিনীর সদস্যরা যদি ক্রমাগত বেশি করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সমাজের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলার অভাববোধ এবং হতাশা বাড়তে থাকবে। পুলিশ মানুষের আস্থা হারাতে থাকবে। প্রকারান্তরে তা আরো বেশি অপরাধকে উৎসাহী করে।
সম্প্রতি পুলিশ বাহিনীর কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো রীতিমতো ভয়াবহ। শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া গুলি চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের হাতে শান্তি ভঙ্গের কাজে। শুধু তাই নয়, পুলিশ সদস্যদের কাছে অবৈধ অস্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ পুলিশের কিছু লোক নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া নিরীহ লোকজনকে ধরে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা, ঘুষ খেয়ে অপরাধী ছেড়ে দেওয়া, তদন্ত রিপোর্ট বিকৃত করা, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা, এমনকি হত্যার পরিকল্পনা করা এবং হত্যা সংঘটিত করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে পুলিশ বাহিনীর কিছুসংখ্যক সদস্যের বিরুদ্ধে। কারো কারো বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে পুলিশ সদস্যদের জড়িত হওয়ার পরিমাণ কমছে না, বরং তারা ক্রমেই গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ, গৃহীত ব্যবস্থা যথেষ্ট দৃষ্টান্তমূলক নয়। অপরাধী পুলিশ সদস্যরা শাস্তির বিষয় নিয়ে মোটেও ভীত নয়।
দেশের মানুষ এক বেলা খেতে না পেলেও এতটা আতঙ্কিত হয় না, যতটা না তারা হচ্ছে বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে। পুলিশ বাহিনীর ওপর এত দিন তাদের যে সামান্য আস্থাটুকু ছিল, সেই আস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েও মানুষ পুলিশের সাহায্য নিতে দ্বিধান্বিত থাকে। পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা রাষ্ট্রের কর্ণধাররা কি এই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নন? পত্রপত্রিকা কিংবা গণমাধ্যমে বিষয়গুলো যেভাবে আলোচিত হচ্ছে, তাতে অবগত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাহলে পুলিশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান এ অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে তাঁরা যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন?
কথায় বলে, যে সর্ষে দিয়ে ভূত তাড়াবেন সেই সর্ষেতেই যদি ভূত থাকে, তাহলে ভূত তাড়াবেন কী দিয়ে। আমাদের পুলিশ বাহিনীর অবস্থাও অনেকটা সে রকমই। পুলিশ বাহিনীর অন্যায়-অপরাধ দমনের জন্য যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় কর্ণধাররা থাকেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত খুলনার এরশাদ শিকদার নাকি দম্ভ করে বলেছিলেন, 'আমাকে ধরবে কে? এমন কোনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছে, যে এরশাদ শিকদারের পয়সা খায়নি?' এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে খুনসহ ১০ বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া বহু গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠেছিল। একাধিক মামলায় মৃতুদণ্ডের রায়ও হয়েছিল; কিন্তু গুরুতর সব অপরাধ করেও সে বহাল তবিয়তে থেকেছে। অভিযোগ আছে, পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ ও বদলির জন্য লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। সাধারণত সেই ঘুষ নেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিবেচনায় পুলিশের নিয়োগ-বদলি মামুলি ব্যাপার হওয়ায় পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকেই বা আমরা কতটা সততা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ আশা করতে পারি? আশা করি, অবনতিশীল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কর্ণধাররা বিষয়গুলো দ্রুত এবং যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখবেন। পুলিশেরই কিছু সদস্য যদি এভাবে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে হাত মেলায়, অস্ত্র ও গুলি সরবরাহ করে, তাহলে এই সমাজ আর মানুষের বসবাসযোগ্য থাকবে না। মানুষের জীবন অসহনীয় হয়ে পড়বে।

No comments

Powered by Blogger.