বহে কাল নিরবধি-ভারত-চীন যুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তিতে প্রাসঙ্গিক ভাবনা by এম আবদুল হাফিজ

চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত যুদ্ধের অর্ধশতাব্দী পূর্তি হলো এ বছরই। এই যুদ্ধে ভারতের অপমানজনক পরাজয় নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে আজও আত্মসমালোচনার অন্ত নেই, তেমনই চীন ও ভারত সম্পর্ক এবং আগামী বিশ্বে দুই দেশের সমন্বয়ে এশিয়ার অবস্থান নিয়েও হিসাব-নিকাশের কমতি নেই।


দুটি বৃহৎ শক্তি- ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেকোনো সময় ও কারণে যে তিক্ত হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। আয়তন, জনসংখ্যা ও সম্পদে বৃহৎ হলেই কোনো দেশ প্রশ্নাতীতভাবে শক্তিশালী হয় না। তাদের দুর্ভাবনার একাধিক কারণ থাকতে পারে, থাকতে পারে বিক্ষত হওয়ার উৎস ও সম্ভাবনা (Vulnerability)। কোনো জাতিই প্রশ্নাতীতভাবে সুরক্ষিতও নয়। তাই ভারত ও চীনের অব্যাহত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং যুগপৎ সমৃদ্ধি বিপথগামিতায় নিপতিত হলে উভয়ের মধ্যে একটি ভয়াবহ সংঘাতের আশঙ্কা থাকতেই পারে।
১৯৬২ সালে এসব কোনো কিছু না থাকা সত্ত্বেও, উভয়ের মধ্যে একটি অভাবনীয় সম্প্রীতি বিরাজ করলেও এবং পঞ্চাশের দশকের বান্দুং সম্মেলনের চেতনা পঞ্চশীলার ভিত্তিতে উপনিবেশিকতা থেকে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর সহাবস্থানের অঙ্গীকার থাকলেও ভারত-চীন যুদ্ধ ঠেকানো যায়নি। ১৯৪৯ সালে চিয়াং কাই সেকের জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের পর বিজয়ী চীনা কমিউনিস্টরা যখন বেইজিংয়ে প্রবেশ করে, ভারতই তাদের সর্বপ্রথম স্বীকৃতিদানকারীদের অন্যতম। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর তখন উভয় শক্তিশিবিরে প্রচণ্ড কদর থাকা সত্ত্বেও নেহরু চীনের দিকেই ঝুঁকেছিলেন। মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ভারতকে তাদের পক্ষে পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও নেহরু চীনের সঙ্গে সখ্য গড়তেই অধিক আগ্রহী ছিলেন।
চীনের আগেই স্বাধীনতা লাভকারী ভারত তখন একপ্রকার হাতে ধরে চীনাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে আসে। ১৯৫৫ সালে বান্দুংয়ে সদ্য স্বাধীন উপনিবেশিকতামুক্ত দেশগুলোর সম্মেলনে যোগদানকারী চৌয়েন লাই এবং নেহরুর মধ্যে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব আরো প্রগাঢ় হয়। তাঁরা দুজনই ছিলেন একটি নতুন বিশ্ব গড়ার স্বপ্নে। সেই ভারত ও চীনের মধ্যে এক দশকের মধ্যেই একটি প্রচণ্ড যুদ্ধের সূত্রপাত- ভাবাই যায় না। কৈশোরে সংবাদপত্রে পড়তাম ভারত-চীন সম্পর্কের রমরমা সৌহার্দ্যের কথা- সেই বহুল উচ্চারিত 'হিন্দি-চিনি ভাই ভাই' স্লোগানটির কথা।
আজ সেই যুদ্ধের ৫০ বছর পরও মানুষের কৌতূহল এতটুকু হ্রাস পায়নি যে কী ঘটেছিল সেই ঝঞ্ঝাসঙ্কুল যুদ্ধ বিস্ফোরিত হওয়ার কারণ হিসেবে। জাতীয় স্বার্থের সংরক্ষণ? তা তো বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের মধ্যে শান্তি বজায় রেখেও অর্জন সম্ভব। তবু একেবারে সরাসরি কারণ হিসেবে যা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা সে সময় এবং এখনো চিহ্নিত করেছেন এবং করছেন- তা ছিল বিতর্কিত সীমান্ত ও চীনাদের কথিত 'বিদ্রোহী' দালাই লামাকে ভারতে আশ্রয়দান। প্রথমটি ছিল ভারতের এবং দ্বিতীয়টি চীনাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
তবে এ কারণগুলোর সংঘটক হিসেবে ইংরেজদেরই সম্পূর্ণভাবে দোষারোপ করা যায়। সিমলায় ১৯১৪ সালে স্যার হেনরি ম্যাকমাহান ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের সীমান্তের এই নামকরণ করেছিলেন এবং এই সীমান্ত ঘিরেই পরবর্তী সময়ে স্বাধীন ভারত ও চীনের মধ্যকার যুদ্ধটি ১৯৬২ সালে সংঘটিত হয়েছিল। ১৯১৩-১৪ সালে সিমলা কনভেনশনটি ছিল মূলত তিব্বতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে ঘিরে। চীনারা তিব্বতে ইংরেজদের 'ফরওয়ার্ড পলিসি' পছন্দ করেনি। তিব্বতিরা সব সময়ই তাদের একটি স্বাধীন অবস্থানের (Status) পক্ষপাতী ছিল। তারা ব্রিটিশ-ভারত এবং রিপাবলিকান চীন উভয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ারও বিরোধী ছিল।
অনেকেই ভাবে যে একটি গভীর সম্প্রীতির পরিবেশে ১৯৬২ সালে তুচ্ছ ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে একটি প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধ ঘটতে পারলে আরেকবার কি এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে না? এটা হোক বা না হোক- এমন আশঙ্কার কথা কেউ উড়িয়েও দেয় না। কেননা যে ইস্যুগুলো ঘিরে বাষট্টির সংঘাত হয়েছিল, সেই ইস্যুগুলোর অনেকই এখনো অমীমাংসিত, যদি দুই দেশই আজ এশিয়ার আঞ্চলিক পরাশক্তি এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতির মাপকাঠিগুলোতে সমান্তরাল পথে সম্মুখে ধাবমান। অগ্রগতির এই দৌড়ে যে কেউ এগিয়ে বা পিছিয়ে পড়তে পারে। যেকোনো একজন পিছিয়ে পড়লেই অগ্রগামীকে ধরে ফেলার ঝুঁকির মধ্যে তার ভ্রান্তি হবে এবং তা থেকেই সংঘর্ষের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠতে পারে। তা না হলে গত ৫০ বছরেও নিষ্পত্তির কাছাকাছি এসেও দেশ দুটি পঞ্চাশের দশকের স্বপ্নে ফিরতে পারেনি কেন? অন্তত এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ এই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির হাতে নেই কেন?
যুগের পর যুগ ধরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা স্বল্প যে কয়টি বিষয়ে শেখেন, তা হলো- রাজনীতির পরিসরে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। অসংগতিপূর্ণ দেশগুলো কখনো কখনো মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে, আবার মতাদর্শগত কমরেডরাও একে অন্যের মুখোমুখি হয়। দৃশ্যত বলিষ্ঠ একটি দেশ বা সাম্রাজ্য আশ্চর্য দ্রুততার সঙ্গে ভেঙে পড়ে, আবার দুর্বলরা একই রকম দ্রুততার সঙ্গে আবির্ভূত হয়। এমন মতবাদ যে যুদ্ধ-বিগ্রহ সেকেলে এবং পুরনো ধারার কার্যক্রম- বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মিথ্যা প্রমাণিত যে বিজয়ের দাবিদার শুধু অধিক শক্তিশালীরা। তাহলে ভারত ও চীনের মধ্যে আবার একটি যুদ্ধ সংঘটিত হতে পারে? অবশ্যই তা অসম্ভব নয়।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস

No comments

Powered by Blogger.