প্রতিক্রিয়া- মেঘকে জিজ্ঞাসাবাদ যদি করতেই হয় তবে... by কুর্রাতুল-আইন-তাহিমনা

নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘকে আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব সদর দপ্তরে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে গতকালের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে র‌্যাবের মুখপাত্র অবশ্য বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদ নয়, তাঁরা কথা বলার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করছেন।


জিজ্ঞাসাবাদ বা গল্পচ্ছলে তথ্য জানা—যেটাই হোক না কেন, আশা করব ঠিক এই প্রক্রিয়ায় আর তা করা হবে না। মেঘের নিকটজনদেরও সেটাই প্রত্যাশা।
ছোট্ট মেঘের মনের ভেতরটা এখন কেমন? কেউ কি সে কথা পরিষ্কার ধারণা করতে পারবে?
গত ১১ ফেব্রুয়ারির সেই রক্তাক্ত সকাল দেখার পর প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেছে। তার মামা নওশের রোমান গতকাল ফোনে বললেন, মেঘ আর নিজে থেকে ওই বিষয়ে কথা বলতে চায় না। এখন তাকে অনেকটাই পরিণতবুদ্ধি ও চাপা স্বভাবের বলে মনে হয়। এমনিতে রোজকার কাজকর্মে সে সহজ ও স্বাভাবিক।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ছয় বছরের শিশুটির ভালো থাকার বিষয়টা? তার কল্যাণই কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া, তদন্ত কি আর মেঘের জন্যই ঠেকে আছে? তার পরও তদন্তের জন্য অত্যাবশ্যক বিবেচনায় যদি আবার তাকে সেসব কথা মনে করাতেই হয়, তবে যথাসম্ভব সহনীয় করে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েই সেটা করতে হবে।
র‌্যাব বলছে, এর আগে মনোবিজ্ঞানী মেঘের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন (কাউন্সেলিং)। অর্থাৎ এভাবে তাকে কথা বলার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু মেঘের মামা গতকাল বললেন, সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত সেই আলাপচারিতাগুলোয় মেঘ যেতে চাইত না এবং খুব বেশি সে যায়নি। সুতরাং প্রক্রিয়াটি নিয়েই প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।
তা ছাড়া, মেঘের সঙ্গে কথা বলার সময় পরিবারের অনুমোদিত কোনো শিশু মনোবিজ্ঞানীর উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। মেঘের সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্য থাকাটাও বাঞ্ছনীয় হবে। কথা বলার সময় শিশুটির আস্থাভাজন অভিভাবকস্থানীয় কারও থাকা দরকার। তাকে সুস্থ-স্বচ্ছন্দ রাখা এবং তার স্বার্থ দেখার জন্য এটা বিশেষ জরুরি।
কথা বলার জন্য মেঘকে র‌্যাবের অফিসেই বা যেতে হবে কেন? তার পরিচিত কোনো সাধারণ স্থানে উর্দিপরিবেষ্টিত পরিবেশের বাইরে কেন নয়? ৩১ অক্টোবর মেঘের মামা যখন তাকে র‌্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে যান, ঘরটি তাঁর কাছে প্রাপ্তবয়স্কদের জিজ্ঞাসাবাদোপযোগী করে সাজানো বলে মনে হয়েছে। র‌্যাবের পোশাক পরা মানুষজনও যেখানে ছিলেন।
তার বাবা-মাকে ফিরিয়ে দিতে কেউ পারবে না। কিন্তু তাকে তো বাঁচতে হবে। তার ভয়ভীতি-ক্লেশ-কষ্ট ও হয়রানির ঝুঁকি নেবেন কোন যুক্তিতে? এযাবৎ মেঘকে অনেকবারই আইনশৃঙ্খলার লোকদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। সে আর এসব চায় না। আর তার পরিবারের মনে হয়েছে, এঁরা মেঘের ভালোমন্দ চিন্তা করছেন না।
মেঘের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে এই যে সতর্কতা ও বিবেচনার প্রশ্ন, এগুলো কিন্তু সাংবাদিকদের জন্যও প্রযোজ্য। ঘটনায় যখন কোনো শিশু জড়িত থাকে, সাংবাদিকতার নৈতিকতা বলে, সে শিশুটির স্বার্থ ও কল্যাণ খবর করার বিবেচনা ও তাগিদের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাবে। শিশুর পরিস্থিতি যত নাজুক, যত স্পর্শকাতর, এই সতর্কতা তত বেশি জরুরি হয়। আমরা সাংবাদিকেরা এ দায়িত্ব কেউ মানি, কেউ মানি না, কখনো মনে রাখি, কখনো ভুলে যাই।
কেবল মেঘ নয়। কেবল ‘ভিকটিম’ নয়। যে পথশিশুটির বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠে, তার প্রতিও একই বিবেচনার দায়িত্ব থাকে। সাংবাদিকের। পুলিশের। র‌্যাবের। সকলের।

No comments

Powered by Blogger.