মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান সংরক্ষণে কমপ্লেক্স ও স্তম্ভ নির্মাণ দাবি

মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান সংরক্ষণ করতে কমপ্লেক্স ও একটি স্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে এক সেমিনারে এ দাবি করা হয়। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ও রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস এ্যান্ড ডেভেলপ সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘একাত্তরে নির্যাতিত


নারী ও তাদের সম্মান’ বিষয়ক সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। বক্তব্য রাখেন ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনসুর মুসা, ডা. অধ্যাপক নায়লা জামান, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু, মানবাধিকার কর্মী নূরজাজান বোস, নাঈমুল ইসলাম খান ও কবি কাজী রোজি। সেমিনার সঞ্চালনা করেন ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ডা. এমএ হাসান। সভাপতির বক্তব্যে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন সরকারের কাছে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন। নারী মুক্তিযোদ্ধা ও ’৭১ সালে নির্যাতিত নারীদের সম্মাননার জন্য তিনি সরকারের কাছে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে এই বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে সরকার বড় সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রী নারীদের রাষ্ট্রীয় সম্মান দেবেন। এতকাল তাদের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে তার জন্য জাতির পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইবেন। সম্মেলনে দেশের সব নারী মুক্তিযোদ্ধা ও ’৭১ সালে নির্যাতিত নারীরা থাকবেন। দ্বিতীয় প্রস্তাব হচ্ছে এসব নারীর মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পরও নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদানের জন্য একটি কমপ্লেক্স, মনুমেন্ট ও আর্কাইভ করতে হবে। এই সাহিত্যিক বলেন, ’৭১ সালের পর কেন এই নির্যাতিত নারীদের জীবন পাল্টানো হয়নি। এখনও আইন, সমাজ, প্রথা নারীদের মর্যাদা দেয়ার বিপক্ষে। অনেক শিক্ষিত জনও তো এসব দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করতে আসেন না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আমাদের মূল্যবোধ পরিশীলিতভাবে আমরা ধারণ করতে পারিনি। এদেশের সরকার পরিচালনায় যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা তাদের এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। অনেক নারী যুদ্ধ থেকে আসার পর ভালবাসার মানুষ পাননি, পরিবারে স্থান পাননি। অনেকেই অপমান ও বঞ্চনায় পাগল হয়েছিলেন। নারীদের এই অমর্যাদা কোন সমাজের জন্য ভাল নয়। এখনই সময় নারীদের তার সম্মান দেয়ার। কারণ অনেককেই হয়ত আর পরে পাওয়া যাবে না।
ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনসুর মুসা বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তারা সব সময় মুক্তিযুদ্ধে চেতনা বাস্তবায়ন থেকে বিমুখ থেকেছেন। তিনি বলেন, দেশের নির্যাতিত নারী ও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া, স্তম্ভ ও কমপ্লেক্স নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি মাত্র।
কবি কাজী রোজি বলেন, নির্যাতনের কথা তুলে ধরে বলেন, কবি মেহেরুন নেছাকেও কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা মেরে তার মাথা ফ্যানে ঝুলিয়েছিল। নারীরা অনেকভাবে বার বার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের অবদানকে মূল্যায়ন করা হয়নি।
ডা. অধ্যাপক নায়লা জামান বলেন, আমরা এ ব্যাপারে বিশ্বের অনেক দেশের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছি। সরকার যদি এক খ- জমি দান করে তাহলে এই প্রক্রিয়া চালু হতে পারে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও এই দেশপ্রেমিক নারীরা অবহেলিত জীবনযাপন করছেন। অথচ এই নারীরাই স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে গিয়ে তাদের সম্মান ও সম্পদ হারিয়েছেন।
লিখিত বক্তব্যে ডা. এমএ হাসান বলেন, স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও ’৭১-এর নির্যাতিত নারীরা ঝরা পাতার মতো এক অবহেলিত, লাঞ্ছিত এবং বিড়ম্বিত জীবনযাপন করছেন। অথচ এই নারীরা ’৭১ সালে স্বাধীনতার মূল্য দিতে গিয়ে তাদের জীবনের সব সম্মান এবং সম্পদ হারিয়েছেন। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত নারীরর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার। তাদের ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন ডা. হাসান। স্তম্ভ ও কমপ্লেক্স নির্মাণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হলে সেখানে ’৭১-এ নারীর অবদানসংক্রান্ত সব তথ্য, চিত্র ও দলিলকে সংরক্ষণ করে রাখা যাবে। আর স্তম্ভ নির্মাণ করা হলে নির্যাতিতদের সম্মানে সব প্রজম্মের সেই স্থানে যেতে পারবে। তাছাড়া নয়া প্রজন্মের কাছে কমপ্লেক্স ও স্তম্ভ আরেকটি ইতিহাস হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজটি করার উদ্যোগ নিলে প্রধানমন্ত্রী জন্য এটি একটি অন্যন্য কৃতিত্ব হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, যুদ্ধের সময় নির্যাতিত অনেক নারী সামাজিক কারণে মুখ খুলে নির্যাতনের কথা বলেননি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। এই সময়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সঙ্গে আত্মীয়তা করেছেন। ইতিহাসে প্রকৃত চিত্র জানা থাকলে এমনটি হতো না, বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ময়মনসিংহের ফুলপুর থানার বীরাঙ্গনা ময়মুনা খাতুন বলেন, আমি অতি দুঃখি ও অসহায় মানুষ। আমাকে যুদ্ধের সময় অনেক অত্যাচার নির্যাতন করেছে পাঞ্জাবী আর্মিরা। তখন আমার কেবল বিয়ে হয়েছে আমি স্বামীর বাড়িতে থাকতাম। তখন আমার বয়স ১২ বছর। আমাদের বাড়িতে একদিন আর্মিরা হামলা করল। নিজের নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি কেঁদে বলেন, পাক সেনারা আমার মুখ বেঁধে ফেলে। আমি ভয়ে বেহুশঁ হই। দুই আর্মি আমার ওপর নির্যাতন চালায়। তারা চলে যাওয়ার পর গ্রামের মানুষ আমার অবস্থা দেখেছে। আমি নিজের জীবন নিজে ত্যাগ করতে চেয়েছিলাম মানুষের কথার ভয়ে। আমার স্বামী আমাকে বুঝিয়েছে- কোন দিন কোন কথা বলেনি। কিন্তু গ্রামের মানুষ নানা মন্দ কথা বলত। ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট থানার বীরাঙ্গনা পরিমুন নেছা তাঁর অভিজ্ঞতায় বলেন, ’৭১ সালে আমার বয়স ১৪ বছর। আমার বিয়ের পর এক ছেলে হয়েছে। আমি আমার ছেলেকে খাওয়াচ্ছিলাম। হঠাৎ তিন আর্মি আমাদের বাড়িতে আসে। তারা আমাকে পাশের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। পরে ১০-১৫ জন মিলে অত্যাচার করে। আমি মরার মতো হয়ে যাই। তারপর মানুষের নানা কথা শুনে দিন পার করছি।

No comments

Powered by Blogger.