জাতীয় শোক দিবসে শিল্পকলায় দিনব্যাপী নানান আয়োজন- সংস্কৃতি সংবাদ

বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৭তম শাহাদাত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী বুধবার দিনব্যাপী নানারকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সকালে একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর নেতৃত্বে একাডেমীর সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিল্পীরা ধানম-ি জাতির


জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। পরে একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালা প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ শীর্ষক শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এরপর জাতীয় নাট্যশালায় চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং শেষে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে সনদপত্র ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
আলোচনানুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দ শামসুল হক বলেন, আজ কোন শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন নয়, আজ বাঙালীর আত্মচেতনার স্বপ্ন ও এর উত্থান নিয়ে গ্রথিত হওয়ার দিন। আমি গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি যার নেতৃত্বে গোটা বাঙালী জাতি মুক্তির নেশায় উজ্জীবিত হয়েছিল সেই মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি যে চার মহান নেতা দেশের জন্য আজীবন যুদ্ধ করে মৃত্যু দিয়ে জীবনের সমাপ্তি টেনেছিলেন। আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি সব মুক্তিযোদ্ধাকে, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের দেশের মতো পৃথিবীর আর কোন দেশে এত রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন আছে বলে আমার জানা নেই। সেদিন যিনি আমাদের সাড়ে সাত কোটি মানুষদের একত্রিত করেছিলেন, যার ইঙ্গিতে এ দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তি সংগ্রামে, তাঁর কোন মৃত্যু নেই। পাঁচ হাজার বছরের মধ্যে বাঙালী জাতির মতো সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে এত রক্ত আর কোন জাতি দেয়নি। বিনিময়ে শত্রুর কালো থাবায় হারাতে হলো আমাদের মুক্তিসংগ্রামের এই মহান নেতাকে। কোন এক সময়ে সেøাগান ছিল ‘কাঁদো বাঙালী কাঁদো’। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যখন খুনী চক্র এ দেশের ক্ষমতা দখল করেছিল-তখন বঙ্গবন্ধুর কথা উচ্চারণ করলে, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে জীবন হারাতে হতো, জেল হাজতে যেতে হতো। আজ আর তা নেই। আজ তাই কোন শোকের দিবস নয়, আমি বলব এটাকে ‘মৃত্যুহীন দিবস’। তার কারণ বঙ্গবন্ধু সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার অর্জিত স্বাধীনতা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে। একারণেই এ মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যু হতে পারে না। আমার সরকারের কাছে একান্ত দাবি, শোক দিবসের পাশাপশি এ দিনটিকে ‘মৃত্যুহীন দিবস’ নামকরণ করা হোক। বাঙালীদের মধ্যে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই অটুট থেকেছেন তাঁর সংকল্পে। অনেকে স্বার্থের জন্য, ভয়ের জন্য ও নানারকম সুবিধার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানীদের সঙ্গে আপোস করেছেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা করেননি। তিনি বলেছিলেন ‘আমি গদি চাই না, আমি মানুষের অধিকার চাই’। তিনি সবসময় বিভিন্ন বক্তৃতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শের বাণী উচ্চারণ করতেন। নতুন প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান, তারা যেন বঙ্গবন্ধুর এ আদর্শের বাণীকে জীবনে ধারণ করে। বাংলার মাটি এখনও রক্তে ভিজে আছে। কিন্তু সে রক্ত আমরা কান্নার জন্য অনুভব করি না, এটা গোলাপের মতো অনুভব করি। সেই অনুভব নিয়ে আজকের বাবা-মা যেন তার শিশুদের অনুপ্রাণিত করেন। আমরা আগস্ট মাসে অনেক মহান ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছি। এ মাসে হারিয়েছি রবীন্দ্রনাথকে, হারিয়েছি নজরুলকে, হারিয়েছি বঙ্গবন্ধুর মতো মহান ব্যক্তিকে। একদিকে রবীন্দ্রনাথের প্রেম অন্যদিকে নজরুলের বিদ্রোহের দাবানল, এর সব কিছু নিয়ে বঙ্গবন্ধু রচনা করেছেন বাঙালীর স্বাধীন সত্তা। এই মহানায়ক এই ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাতেই আমরা মাথা ঠেকাই। ইতিহাসের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন মাথা উঁচু করেই। আমরা যে চেতনা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে, আজকের বাবা- মা যেন শিশুকে সেই সঠিক তথ্য জানায়। তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন প্রতিটি কণায় কণায় স্বাধীন বাংলায় প্রতিবিম্বিত করবে।
আলোচনানুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। তিনি বলেন, যে মহান নেতা আমাদের দেশপ্রেম শিখিয়েছেন, নজরুল রবীন্দ্রনাথকে জানতে শিখিয়েছেন এই দিনে আমাদের প্রত্যয় হওয়া উচিত তাঁর আদর্শকে ধারণ করা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন দেশের মানুষের কাছে শিল্পকলাকে তুলে ধরা। আমরা তাঁর অসমাপ্ত কাজকে সম্পন্ন করতে পারলে তাঁর আত্মার শান্তি হবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন একাডেমীর সচিব মনজুরুর রহমান, চারুকলা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সঙ্গীত ও নৃত্য বিভাগের পরিচালক র আ মাহমুদ সেলিম।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়পর্বে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শুরুতে দুখিনী বাংলা জননী বাংলা ও যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা শিরোনামে পর পর দুটি দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে পিপলস্ থিয়েটারের শিল্পীরা। কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’ কবিতা আবৃত্তি করেন ডালিয়া আহমেদ, মুজিবর আছে বাংলার ঘরে ঘরে গানটি পরিবেশন করেন শিল্পী ইয়াসমিন আলী। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী গানের সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দনের শিল্পীরা। শাহাদাত হোসেন নিপু আবৃত্তি করেন কবিতা ‘আসুন পিতা’। মলয় কুমার গাঙ্গুলী পরিবেশন করেন একক গান ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই।’ ‘ঢাকা সাংস্কৃতিক দল পরিবেশন করে দলীয় সঙ্গীত ‘ধন্য মুজিব ধন্য’ ও ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে।’ শিল্পী শিবু রায় পরিবেশন করে ‘হিমালয়ের মতো যার বিশাল বক্ষ দেখেছি। শিল্পী রীনা আমিন পরিবেশন করেন একক গান ‘ বাতাসে কান পাতলে বজ্রকণ্ঠে শুনতে পাই। রনতা শিল্পী গোষ্ঠী পরিবেশন করে দলীয় সঙ্গীত ‘আয়রে জাদু দেখরে জাদু। সবশেষে চিত্রাঙ্কন প্রেিযাগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার ও সনদপত্র প্রদান করা হয়। ক বিভাগে প্রথম হয় ফাইয়াজ আহমদ, দ্বিতীয় জয়া সরকার, তৃতীয় মুবাশ্বির আহমেদ ও চতুর্থ শাহাদাৎ হোসেন। খ বিভাগে প্রথম হয় আমরিন শাহরিয়ার, দ্বিতীয় সিরাজুম মুনির বিদুষী, তৃতীয় মীর আইমান সারাফ ও চতুর্থ নাফিসা ইসলাম তুল তুল। গ বিভাগে প্রথম হয় মেহেনাজ আহমেদ, দ্বিতীয় নাসিবা নাওয়ার, তৃতীয় সুগফতা তাবাসসুম প্রমি ও চতুর্থ হয় তাবাসসুম ইসলাম তামান্না।

No comments

Powered by Blogger.