ইবিতে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক : হল তল্লাশি

বাসিক হলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুর ২টায় লালনশাহ হলের ডাইনিং ম্যানেজার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হয়। মুহুর্মুহু গুলি, বোমা, পুলিশের টিয়ারশেল আর ফাঁকা গুলিতে এ সময় ক্যাম্পাস যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে উভয় দলের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ও চাপাতির কোপে গুরুতর আহত ৮ শিবির কর্মীকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।


পরিস্থিতি মোকাবিলায় র্যাব, পুলিশ, ডিবি, আর্মড ব্যাটালিয়নসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ৪ শতাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, লালনশাহ হলের ডাইনিং ম্যানেজার তোতা মিয়ার পরিবর্তে ছাত্রলীগ গোলাপ মিয়া নামের নতুন ম্যানেজার নিয়োগ দেয়। এ নিয়ে দুপুর ১টার দিকে ছাত্রলীগ ও শিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে দুপুর ২টার দিকে লালনশাহ হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট তৌফিক এলাহী, ছাত্রউপদেষ্টা ড. মেহের আলী, ছাত্রলীগ ইবি শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, শিবিরের দফতর সম্পাদক আসাদুল্লাহসহ উভয়দলের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসার জন্য হলের প্রভোস্ট অফিসে জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠক চলাকালীন সময়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা রেজোয়ান নামের এক শিবির কর্মীর পেটে ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনার পর শিবির কর্মীরা একযোগে ছাত্রলীগ কর্মীদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী শেখপাড়া বাজারে অবস্থান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪নং গেট দিয়ে শিবির কর্মীদের উদ্দেশে গুলি, বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। শিবির কর্মীরা বিভিন্ন হলে অবস্থানের পাশাপাশি ৪নং গেটে ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে একাধিক শিবির কর্মী গুলিবিদ্ধ ও ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হলেও অবস্থান না ছেড়ে ছাত্রলীগকে প্রতিহত করে। প্রায় দুই ঘণ্টা মুখোমুখি সংঘর্ষের পর পুলিশ, র্যাব ও ডিবি পুলিশ লাঠিপেটা ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শিবির কর্মীদের হলে ঢুকিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে পুলিশ প্রায় ৫০ রাউন্ড টিয়ারশেলসহ রাবার বুলেট ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে বলে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এদিকে সংঘর্ষ শুরু হলে শিবির কর্মীরা লালনশাহ হলের প্রভোস্ট অফিসে তালা দিয়ে হল গেটের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় প্রভোস্ট অফিসে লালনশাহ হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট তৌফিক ইলাহি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ড. মেহের আলী, ইবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন সাংবাদিক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ২ ঘণ্টা শিবির কর্মীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়া শিক্ষক ও ছাত্রলীগ নেতাদের সাড়ে ৩টার দিকে কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ শাহার নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ এসে মুক্ত করে।
সংঘর্ষে শিবিরের প্রায় ৩০ নেতাকর্মী আহত হয়। আহতরা হলেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের মনির, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাসুম, সাব্বির, আল-হাদিস বিভাগের রেদওয়ান, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মিজানুর রহমান, মামুন, আল-কোরআন বিভাগের ফরিদ, যুবায়ের, ফলিত রসায়ন বিভাগের হাসনাত, আল-ফিক্হ বিভাগের খলিলুর রহমান প্রমুখ। সংঘর্ষে ছাত্রলীগের মনির, মেহেদী, মাসুম, বেলাল, বকুল, লেলিন, জাপান, সাগরসহ প্রায় ২০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে।
প্রত্যাক্ষদর্শীরা জানায়, সংঘর্ষ শুরু হওয়ার প্রায় আধ ঘণ্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারসহ প্রক্টরিয়াল বডির কয়েকজন সদস্য ঘটনাস্থলে আসেন। কিন্তু তারা সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। এ সময় ছাত্রী হলের এক প্রভোস্ট সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা না করে উল্টো ছাত্রলীগের দলীয় ক্যাডারের ভূমিকা পালন করে ছাত্রলীগ কর্মীদের উত্তেজিত করে তোলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাত্রলীগ কর্মীদের মুহুর্মুহু গুলি ও বোমা নিক্ষেপের সময় পুলিশকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এ সময় শেখপাড়া বাজারের একটি দোকানের ওপর থেকে পুলিশের হেলমেট পরিহিত এক যুবককে ক্যাম্পাসের দিকে তাক করে গুলি ছুড়তে দেখা যায় বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানায়।
আবাসিক হলগুলোতে পুলিশ তল্লাশি চালায়। লালনশাহ হল তল্লাশি শেষে সেখান থেকে একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান, লালনশাহ ও সাদ্দাম হোসেন হলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় ছিল। ইবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব হোসেন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুজর গিফারি গাফ্ফার ও হল সভাপতি সাইফুল ইসলাম নেতাকর্মীদের নিয়ে হলে অবস্থান করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন।
এ ব্যাপারে ছাত্র উপদেষ্টা ড. মেহের আলী বলেন, ‘লালনশাহ হলে সামান্য সমস্যা হলে আমরা বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে বসে সমাধান করার চেষ্টা করছিলাম। এ সময় বাইরে উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ক্যাম্পাস নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

No comments

Powered by Blogger.