নেপালে বিপর্যয়: ‘নিমেষেই চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল আমার গ্রাম’

কাঠমান্ডুতে কান্তিপুর পাবলিকেশনসের কার্যালয়ে গত বুধবার সকালে যাচ্ছিলেন সাংবাদিক অর্জুন পৌডেল। এমন সময় তাঁর স্ত্রীর ফোন এল। ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ,‘ত্রিশূলী নদীতে হঠাৎ বন্যা এসেছে। সোলে বাজার আর বেত্রাবতীতে কী যেন একটা ঘটে গেছে। সবাই বলছে, সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। লোকজন রাস্তায় নেমে এসেছে। তাঁদের আতঙ্কের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে।’

স্ত্রীর কথা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি অর্জুন। কারণ, সোলে তাঁর নিজের গ্রাম। এই গ্রামের অলিগলিতে খেলতে খেলতে বড় হয়েছেন তিনি। এখানকার মাঠে কাজ করেছেন। বছরের পর বছর এই পথ ধরে হেঁটে স্কুলে গেছেন। এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকলে সবার আগে তো তাঁরই জানার কথা।

এ ছাড়া অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির কোনো খবরও অর্জুন শোনেননি। তীব্র বর্ষাতেও ত্রিশূলী নদীর পানি কখনো এই জনপদ পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তাই খবরটিকে তেমন গুরুত্ব দেননি অর্জুন। বেলা ১১টায় নিউজের মিটিং থাকায় দ্রুত অফিসের দিকে পা বাড়ালেন তিনি।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের এক নিবন্ধে অর্জুন বলেছেন, বেত্রাবতী বাজারেই তাঁরা কেনাকাটা করেন। এখান থেকেই বাস ছাড়ে, সরাসরি কাঠমান্ডু যাওয়া যায়। বাড়ি ফেরার পথে মা-বাবা তাঁর জন্য এ বাজারেই অপেক্ষা করতেন। এলাকাটির প্রাণকেন্দ্র ছিল এটি।

বেত্রাবতী বাজারে আছে রামমন্দির ও কৃষ্ণমন্দির। রামনবমী ও জন্মাষ্টমীতে মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। এটি প্রাচীন নেওয়ার সম্প্রদায়ের জনপদ। তাই এখানে গাইযাত্রার মতো উৎসবও হতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মাঘসংক্রান্তির ষাঁড়ের লড়াই দেখতে কাঠমান্ডু থেকেও মানুষ আসতেন।

অর্জুন বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর জানতে পারলাম, স্মৃতিঘেরা সেই জায়গাগুলোর অনেক কিছুই আর নেই। স্ত্রীর কথার সত্যতা যাচাই করতে একটি নিউজ পোর্টালে ঢুকলাম। ভেবেছিলাম, তেমন কিছু নয়। কিন্তু শিরোনাম দেখেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল—ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা।

এ খবর দেখার সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক বন্ধু নিরঞ্জনকে ফোন করেন অর্জুন। নিরঞ্জনের পরিবার সোলে বাজারে থাকে। বাজার বড় হওয়ার পর তাঁরা গ্রাম থেকে সেখানে এসে বসতি গড়েছিল। তার কাকার বাড়ি ছিল নদীর আরও কাছে।

‘এক নিশ্বাসে সে বলল, “দাই (বড় ভাই), আমিও এইমাত্র শুনলাম। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। মা, বাবা, কাকা, কাকি—কারও ফোনেই রিং হচ্ছে না।”’

অফিসে যাওয়ার পুরো পথে তাঁরা দুজন বারবার একে অপরকে ফোন করতে লাগলেন। এলাকার পরিচিত যত নম্বর মনে পড়ল, একে একে সব কটিতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনো সংযোগ মিলল না। শেষ পর্যন্ত পরিচিত এক বড় ভাইয়ের বাড়ির নম্বরে ফোন ঢুকল। তাঁর স্ত্রী ফোন ধরে একবাক্যে বললেন, ‘গ্রামে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অধিকাংশ মানুষই ভেসে গেছে।’

কথাটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না অর্জুন। কারণ নদীগর্ভ থেকে সোলে ও টুপচে গ্রামের উচ্চতা প্রায় ১০০ মিটার। কয়েক শতকের ইতিহাসে এমন উচ্চতায় কোনো বন্যা আসার নজির নেই। তাঁর বয়স এখন ৪৪ বছর। এই জীবনে কখনো তিনি নদীর পানি এত দূর উঠে আসতে দেখেননি।

অর্জুন বলেন, ‘গ্রামে আমার ভাই, প্রতিবেশী ও শৈশবের বন্ধুরা থাকেন। পরিচিত ও ভালোবাসার প্রায় সব মানুষই ওই গ্রামের। একে একে সবাইকে ফোন দিতে লাগলাম। সোলের মতো জায়গায় সবাই সবার আত্মীয়। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বয়সের সূত্রে অপরিচিত মানুষও হয়ে ওঠেন “দাই” (ভাই) কিংবা “দিদি” (বোন)। সেখানকার সংস্কৃতিটাই এমন। সবাই আমার আপন, আমিও সবার।’

‘ধীরে ধীরে আমার ফোনে ভিডিও ও ছবি আসতে শুরু করল। সেখানে যা দেখলাম, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।’ এভাবেই জানিয়েছেন অর্জুন।

এই সাংবাদিক বলেছেন, ‘বানের জলে আমার বড় খালা ভেসে গেছেন। তাঁর ছেলে মধু ভাই ও তাঁর স্ত্রীও রক্ষা পাননি। শুনলাম আরেক খালাও বেঁচে নেই। খালার নাতি সিজন ও তাঁর স্ত্রীও ভেসে গেছেন। সিজনের ছেলে ও ছেলের বউয়ের কোনো খোঁজ নেই। সকালে গরু-ছাগলের জন্য ঘাস কাটতে বের হয়েছিলেন আমার মামা। তিনিও আর ফেরেননি।’

এভাবে অর্জুনের ফোনে একটার পর একটা শুধু দুঃসংবাদই আসছিল। অবশেষে স্থানীয় ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালকে ফোন দেন তিনি। ওই চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘ভাই, সকালে পৌরসভা অফিসে এসেছিলাম। এখন এখানেই আটকে পড়েছি। গ্রামে আর কিচ্ছু নেই। বাকিটা আপনি নিজেই বুঝে নেন। কিছু মানুষ কোনোমতে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উঠে প্রাণে বেঁচেছেন।’

এরপর স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অর্জুন। ওই শিক্ষক বলেছেন, ‘ভাই, নিজের পরিবারের লোকজনেরই কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। বেত্রাবতীর ৯০ শতাংশ ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। স্কুলের ভ্যানটিও ভেসে গেছে। আমার পাশে একটি ছেলের পা ভেঙে পড়ে আছে। আরেকজন মানুষের পা ভাঙা, চোখ মারাত্মক জখম। পারলে একটা হেলিকপ্টার পাঠানোর ব্যবস্থা করো, ভাই।’

এর কিছুক্ষণ পর নিরঞ্জনের কাকা ফোন করে অর্জুনকে জানিয়েছে, নিরঞ্জনের বাবা, মা, কাকা, কাকি ও ছোট বোন হিমানী—সবাইকে নদী ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘অর্জুন, আমরা শেষ হয়ে গেলাম। ফোন রাখছি।’ এরপরই তিনি ফোন রেখে দেন।

স্মৃতির বেত্রাবতী এখন ধ্বংসস্তূপ

বেত্রাবতী শুধু সাধারণ কোনো বাজার এলাকা ছিল না। যুদ্ধের পর এখানেই নেপাল ও তিব্বতের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল। এখানেই রয়েছে পবিত্র ‘উত্তর গঙ্গা ধাম’। পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির কামনায় প্রতিবছর পৌষ অমাবস্যায় হাজারো পুণ্যার্থী এখানে আসেন। সেই মন্দির, ঐতিহাসিক চুক্তির স্থান ও তীর্থক্ষেত্র—সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।

এখন আর কোনো রাস্তা অবশিষ্ট নেই। বিদ্যুৎ নেই, মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক নেই, ইন্টারনেটও বন্ধ। নদীর ভাটিতে ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের হেডগেট ও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঢল। এসব দেখে অর্জুনের ২০১০-১১ সালের কথা মনে পড়ে। তখন দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং চললেও তাঁদের গ্রামে কখনো বিদ্যুৎ যেত না।

অর্জুন বলেন, ‘আজ গোটা জেলাই অন্ধকারে নিমজ্জিত। বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে জেলা সদরে যাওয়ার পথে নিজের চোখেই তা দেখেছি। শুধু আমার গ্রাম নয়, পুরো জেলাই যেন আঁধারে ডুবে গেছে।’

সকালে কাজে যাঁরা জেলা সদরে এসেছিলেন, তাঁরা সেখানেই আটকা পড়েছেন। বাড়ি ফেরার কোনো পথ নেই। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও আর বাড়ি ফিরতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাট্টারের সেনা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের দিকে যাওয়া একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের কাছে এক প্রতিবেশীকে দেখেছেন অর্জুন। তিনি হেলিকপ্টারে ওঠার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমার কাকা-কাকি ভেসে গেছেন। ফোন বন্ধ। নিজের বাড়ির কী অবস্থা, তা–ও জানি না।’

স্বজন হারানোর শোক করার সময়ও নেই

অর্জুনের বড় খালার বড় ছেলে কাঠমান্ডুতে থাকেন। এত দূর থেকে তাঁর কিছুই করার নেই। আর ছোট ছেলেটি মাত্রই বিদেশ থেকে কাজ করে দেশে ফিরেছেন। গ্রামে পৌঁছানোর আগেই আকস্মিক ঢল সব কেড়ে নিয়েছে।

ফোনে পরিচিত লোকজন অর্জুনকে জানিয়েছেন, দৌড়ে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিশুদেরও বের করে আনা যাচ্ছে না। স্বজন হারানোর শোক প্রকাশ করার সময়টুকুও কারও নেই। মা, ভাই বা ভাবির মৃত্যুর জন্য কাঁদার চেয়ে গ্রামে আটকে পড়া মানুষদের আগে উদ্ধার করাই এখন বড় লড়াই।

অর্জুন বলেছেন, বন্যা (আকস্মিক ঢল) শুধু গ্রামকেই ভাসিয়ে নেয়নি, জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাও মুছে দিয়েছে। ফলে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যে বাজার থেকে মানুষ রসদ কিনত, সেটিও বিলীন হয়ে গেছে। এখন কেনাকাটার কোনো জায়গা নেই।

ফসলি জমিগুলো তলিয়ে গেছে। বাড়িতে যেটুকু খাদ্যশস্য জমা আছে, তা-ও ধান বা আটা ভাঙানোর উপায় নেই। কারণ, এলাকার সব মিল নদীতে চলে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ধাঙ্গে থেকে ত্রিশূলী বাজারকে যুক্ত করা ১৯৬৭ সালের পুরোনো সেতুটি নদী গিলে খেয়েছে। কয়েক বছর আগে তৈরি হওয়া নতুন সেতুটিও ভেসে গেছে। ভৈঁসে সেতুসহ নদীর ওপরের সব ঝুলন্ত সেতু ভেঙে পড়েছে। ফলে জেলা সদরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। বাঘতারের জেলা হাসপাতালটি এত কাছে হয়েও এখন সম্পূর্ণ নাগালের বাইরে।

ভৈরামকোট, সামারি, টোকসার, দেউরালি, কিসপাং, কাউলে, ভালচে, সালমে ও ধাদিঙের থার্পুসহ দূরের গ্রামগুলোও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পুরো রসুয়া জেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

গ্রামের একজন বাসিন্দা ভারী কণ্ঠে অর্জুনকে বলেছেন, ‘এখন কেউ অসুস্থ হলে ঘরেই মারা যাবে। হাসপাতালে কীভাবে নেবেন? কোনো রাস্তা নেই, ব্রিজ নেই, কোনো গাড়িও চলছে না। এমনকি একটু লবণ কেনার মতো দোকানও খোলা নেই।’

অর্জুন বলেন, ‘এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে মনে হয় না, দ্রুত এসব আবার আগের মতো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

সামনে শুধু অনিশ্চয়তা

অর্জুন বলেছেন, অসংখ্য মানুষ গৃহহীন। বহু মানুষ নিখোঁজ। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী—কেউ জানে না।

গ্রামে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে প্রায় দেড় দিন আগে রওনা হয়েছিলেন অর্জুন। অথচ এখনো জেলা সদর বিদুরেই আটকে আছেন তিনি। কিছুতেই সামনে এগোতে পারছেন না।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদক আরও বলেন, ‘বারবার নিজেকে প্রশ্ন করছি, এই গ্রাম কবে আবার আগের চেহারা ফিরে পাবে? কারও কাছে এর উত্তর নেই। আমাদের কেউই জীবনে এমন দুর্যোগ দেখেনি। এত সবুজ আর সুন্দর একটি গ্রাম চোখের পলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। জায়গাটি কি আর কখনো আগের মতো হবে!’

দুর্যোগের আগে ও পরে নেপালের নুয়াকোটের বেত্রাবতী বাজার
দুর্যোগের আগে ও পরে নেপালের নুয়াকোটের বেত্রাবতী বাজার। ছবি: দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের নিবন্ধ থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট