কৃষি-মনস্যান্টো কি 'প্রজাতির' সংজ্ঞা বদলে দেবে? by পাভেল পার্থ

জুম জমিনের এসব ভুট্টাই আদিবাসীদের খাদ্যের চাহিদা মেটাত। মনস্যান্টো যে হাইব্রিড ভুট্টা আমদানি করেছে তা মানুষ নয়, পোলট্রি খাদ্য। হয়তো সেজন্যই মনস্যান্টো তাদের হাইব্রিড ভুট্টা জাতকে 'প্রজাতি' বলছে। মানুষের খাদ্য থেকে ফসলকে বাণিজ্যিকভাবে পোলট্রি খাদ্যে রূপান্তরের এই কৌশলকেই হয়তো তারা 'নতুন চিন্তাধারা' বলতে চাইছে


প্রাণ ও প্রকৃতি সবসময় বেশকিছু সূত্র মেনে চলে। আর এর নামই বিজ্ঞান। এভাবেই আমরা বেঁচেবর্তে থাকি, সম্পর্কিত হই, আসর জমাই, বিকশিত হই, ঝরে পড়ি কি আবার গড়ে উঠি। কিন্তু প্রকৃতির এই চলমান বিকাশমানতা বারবার রুদ্ধ হয়, হয় লুণ্ঠিত, দশাসই সব মুনাফা মারদাঙ্গায়। মুনাফার বিস্তৃত বাজার সব বদলে দেয় জোরপূর্বক, নাম-পরিচয়, আস্তানা, প্রতিবেশ আর আঁতুড়ঘরের আওয়াজ। কোথা থেকে কে এসেছে, কী পরিচয় তার, কীভাবে তার চলনবলন সবকিছুই বাণিজ্য-ছলের দখলে চলে গেছে। নয়া উদারবাদী বিশ্বায়িত দুনিয়ায় আমরা যাকে বলছি করপোরেটায়ন। হাতেগোনা কিছু বহুজাতিক করপোরেট কোম্পানি দুনিয়ার আগাপাছতলা সূত্র ও সম্বন্ধগুলো উল্টেপাল্টে নিজের জবরদস্তির ঘেরে আটকে রাখছে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য একতরফা বাণিজ্য। হয়তো এখন ওলন্দাজ কি পর্তুগিজ নাবিকদের মতো কেউ নৌকা বোঝাই করে মসলা, পাথর, সুগন্ধি, নীল রঙ বা মিহি বস্ত্র কি খাদ্য নিয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু সেই ঔপনিবেশিক বাণিজ্য মনস্তত্ত্বই এখনও বহাল আছে দুনিয়ায়। গরিবের যাবতীয় সম্পদ ও জ্ঞান লুটপাট করে বদলে ফেলা হচ্ছে নিজের মতো, নিজের নামে, নিজের বাণিজ্য ক্ষমতার জোরে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যায় লুটতরাজ আর শাসনের দুঃসহ স্মৃতি আমাদের আছে। কিন্তু নয়া উদারবাদী দুনিয়ায় এই দুঃসহ যন্ত্রণার বিষ নতুন করে ছড়িয়ে দিচ্ছে মনস্যান্টো, সিনজেনটা, কারগিল, বিএএসএফ, বায়ার ক্রপ সায়েন্স, ওনডিউ, জেনারেল ডিনামিক্স, থামেস, কোকাকোলা, পেপসির মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। কৃষিতে বিনিয়োগ ও উন্নয়নের শোরগোল তুলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বদলে দিচ্ছে 'কৃষির চলমান ধারণা ও বিজ্ঞান'। আমাদের গ্রাম জনপদে এখনও আমরা চাষ করি নানা জাতের শস্য ফসল। বীজ রাখি এখনও নিজের মতো। আমাদের একেকটি ধান জাতের বয়স হাজার বছর। যাদের অনেকেই এখনও টিকে আছে, যাদের ওপরই নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যতের টিকে থাকা। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের এসব আদি দেশি জাত বদলে দিচ্ছে। 'সবুজ বিপ্লবের' নাম করে জাতীয় রাষ্ট্রগুলোকে কোলে নিয়ে চালু করেছে 'উচ্চফলনশীল জাত'। 'উচ্চফলনশীল' জাতে বাজারটা চাঙ্গা না হওয়ায় 'হাইব্রিড' বীজের আমদানি হলো বাংলার সর্বংসহা মাটিতে। 'হাইব্রিডের' টিকে থাকার শর্তগুলোও ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়ায় এখন 'জিন প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত বিকৃত বীজ (জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড সিড/জিই সিড)' চাষের অনুমোদনের জন্য হন্যে হয়ে পড়েছে এসব কোম্পানি। তারা জোর করে আমাদের কৃষি ও বীজের ধারণা বদলে দিচ্ছে।
২. দুনিয়ার শীর্ষ কৃষি বাণিজ্য সন্ত্রাসী কোম্পানি মনস্যান্টো তার ডিকাল্ব হাইব্রিড ভুট্টার বিজ্ঞাপনে ঘোষণা দিয়েছে, এই হাইব্রিড ভুট্টা হলো 'নতুন প্রজাতি এবং নতুন চিন্তাধারা'। বাংলাদেশে মনস্যান্টো কোম্পানি মূলত চা বাগানে 'রাউন্ডআপ' নামে নৃশংস এক বিষ বিক্রি করে। বাংলাদেশে মনস্যান্টো হাইব্রিড ভুট্টা বীজের প্রধান বিক্রেতা। মনস্যান্টোর ডিকাল্ব হাইব্রিড ভুট্টা বীজ বাজারজাত করে কৃষি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, থ্রি জি এগ্রো সার্ভিসেস লিমিটেড ও লারসেন সিড অ্যান্ড ফার্টিলাইজার লিমিটেড নামের তিনটি কোম্পানি। মনস্যান্টো বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে হাইব্রিড ডিকাল্ব ভুট্টার যে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে তাদের লিফলেট-পোস্টার ও প্যাকেটের মোড়কে সবখানেই তারা তাদের হাইব্রিড ভুট্টাকে 'নতুন প্রজাতি' বলে উল্লেখ করেছে। বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যাচ্ছে, কোনো মানুষ নয়, একটি মুখ ঢাকা রোবট হাইব্রিড ভুট্টার প্যাকেট হাতে ভুট্টা ক্ষেতের মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসছে। হয়তো মনস্যান্টোর মতো কোম্পানি এভাবেই তাদের পণ্যের মাধ্যমে কৃষককে যান্ত্রিক দাস কি রোবট বানাতে চায়, হয়তো এটিই মনস্যান্টোর 'নতুন চিন্তাধারা'। আমরা জানি, সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতাবানের মতো ও চিন্তাধারাই টিকে থাকে কি বহাল করে রাখা হয়। অধিপতির ভাষাজ্ঞানই সবার ভাষা হয়ে ওঠে। প্রাণবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও শ্রেণীবিন্যাসবিজ্ঞান অনুযায়ী ভুট্টা একটি প্রজাতি। ঠিক যেমন বর্তমান সময়ের মানুষ একটি প্রজাতি। প্রজাতি হলো প্রাণজগৎ ও শ্রেণীবিন্যাসের ক্ষুদ্রতম একক। প্রজাতি হলো সেই একই সদস্যের দল, যারা নিজেরা নিজেদের ভেতর প্রজননের মাধ্যমে উর্বর বংশ তৈরি করে। শ্রেণীবন্যাসবিজ্ঞান অনুযায়ী এটিই প্রজাতির বিশ্বজনীন সংজ্ঞা। দুম করেই এ সংজ্ঞা বদলে ফেলা যায় না, বিজ্ঞানের চলমান প্রমাণ ও যুক্তির ভেতর দিয়েই তাকে চলতে হয়। আমাদের মুদ্রিত দুনিয়ায় প্রজাতি ধারণাটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শুরু করেছিলেন গুরু চার্লস ডারউইন। ঘাস বা পোয়েসি পরিবারের অন্তর্গত ভুট্টা এক বহুল পরিচিত দানাজাতীয় শস্য। এর উদ্ভিদতাত্তি্বক নাম তবধ সধুং খ. এবং এই নামটি দিয়েছিলেন শ্রেণীকরণবিদ লিনিয়াস। এটি একটি একক প্রজাতি এবং এ কারণেই যে এটি কোনোভাবেই ধান বা বাঁশ বা কাক কি সাপ নয়। কারণ এ প্রজাতির সদস্যরা নিজেদের ভেতর আন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে উর্বর বংশ মানে বীজ তৈরি করতে পারে। দুনিয়ায় অনেক প্রজাতির কচু কি ধান থাকলেও ভুট্টার অনেক প্রজাতি নেই, আছে ভিন্ন ভিন্ন জাত বা ভ্যারাইটি। মনস্যান্টো শ্রেণীবিন্যাসবিজ্ঞানের সব সূত্র ছিন্ন করে তাদের উদ্ভাবিত হাইব্রিড ভুট্টাকেই 'নতুন প্রজাতি' বলে ঘোষণা দিচ্ছে। আবার বলছে এটি নাকি 'নতুন চিন্তাধারা'। তার মানে কি চলমান বিজ্ঞানের সূত্র ও সম্বন্ধগুলো থেকে আমাদের উদ্বাস্তু হতে হবে? নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে আমাদের প্রজাতির ধারণা ও দুনিয়ায় টিকে থাকার নিজস্ব শর্ত ও ভঙ্গিগুলো? আমরা কি মগজ ও শরীর নিয়ে মনস্যান্টোর মতো কোম্পানির খাদ্য ও চিন্তার দাস হয়ে যাব? এই গুরুতর অপরাধের জন্য মনস্যান্টোর বিচার হওয়া জরুরি।
৩. জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদে (সিবিডি ১৯৯২) প্রাণবৈচিত্রের তিনটি ধরনের ভেতর একটিকে 'প্রজাতিবৈচিত্র্য' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 'বিপন্ন বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিদকুলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত কনভেনশন ১৯৭৩'-এ 'প্রজাতি' বলতে যে কোনো প্রজাতি, এর উপ-প্রজাতি অথবা ভৌগোলিকভাবে পৃথক হয়ে যাওয়া অংশবিশেষকে বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান নীতি ও আইনগুলো যদি আমরা ব্যাখ্যা করি তবে দেখব যে, একমাত্র 'বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১০'-এর প্রথম অধ্যায়ের সংজ্ঞায়ন অংশে প্রজাতির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে : 'প্রজাতি' অর্থ একই আকৃতি ও প্রকৃতির ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা পৃথক ক্ষুদ্রতম সুনির্দিষ্ট জীবগোষ্ঠী, যাহারা নিজেদের মধ্যে প্রজননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করিয়া থাকে, জেনেটিক ও বাস্তবগত একক অভিন্ন এবং প্রজননিকভাবে অন্য গোষ্ঠী হইতে ভিন্ন। রাষ্ট্রীয় এই প্রজাতির সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনোভাবেই মনস্যান্টোর হাইব্রিড ভুট্টা কোনো 'প্রজাতি' নয়, এটি ভুট্টার একটি জাত কি ভ্যারাইটি। মনস্যান্টো যতই নতুন চিন্তাধারার মাধ্যমে একে প্রজাতি হিসেবে প্রচার করুক না কেন, প্রকৃতি একে কোনোভাবেই একটি প্রজাতি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য নয়। বাংলাদেশের বীজ অধ্যাদেশ (১৯৭৭) এবং বীজ (সংশোধন) আইন, ১৯৯৭ অনুযায়ী বীজের যে সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অস্পষ্টতা থাকলেও মনস্যান্টোর হাইব্রিড বীজকে এই সংজ্ঞায় 'বীজ' হিসেবে স্বীকার করা যায় কিন্তু কোনোভাবেই একটি 'প্রজাতি' হিসেবে নয়। বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মধুপুর গড় ও বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীরা একটা সময় নানা রঙের ও স্বাদের ভুট্টা আবাদ করতেন। জুম জমিনের এসব ভুট্টাই আদিবাসীদের খাদ্যের চাহিদা মেটাত। মনস্যান্টো যে হাইব্রিড ভুট্টা আমদানি করেছে তা মানুষ নয়, পোলট্রি খাদ্য। হয়তো সেজন্যই মনস্যান্টো তাদের হাইব্রিড ভুট্টা জাতকে 'প্রজাতি' বলছে। মানুষের খাদ্য থেকে ফসলকে বাণিজ্যিকভাবে পোলট্রি খাদ্যে রূপান্তরের এই কৌশলকেই হয়তো তারা 'নতুন চিন্তাধারা' বলতে চাইছে। প্রজাতির সংজ্ঞায়ন ও ধারণা নিয়ে মনস্যান্টোর এই জবরদস্তিমূলক প্রচারণা ও নতুন চিন্তাধারার নামে বাণিজ্যের ছলাকলা বন্ধ করতে জরুরি তুমুল কৃষক আন্দোলন।

পাভেল পার্থ : গবেষক
animistbangla@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.