চার বিদ্যুত কেন্দ্রের ৯ ইউনিট সংস্কারের জন্য চিহ্নিত- অতিরিক্ত ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব হবে by রশিদ মামুন

চার বিদ্যুত কেন্দ্রের এক হাজার ৬৫৪ মেগাওয়াটের পুনঃক্ষমতায়ন (রিপাওয়ারিং) করে অতিরিক্ত এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করা সম্ভব। ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ, শাহাজিবাজার এবং বাঘাবাড়ী বিদ্যুত কেন্দ্রের ৯টি ইউনিটকে রিপাওয়ারিংয়ের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।


পাওয়ারসেল সূত্র বলছে, এর মধ্যে ঘোড়াশাল বিদ্যুত কেন্দ্রের চতুর্থ ইউনিটকে রিপাওয়ারিং করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারা।
বিদ্যুত বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রিপাওয়ারিং করার সব থেকে বড় সুবিধা হচ্ছে ৩০ ভাগ জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি করলে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা সাধারণত তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। এই প্রক্রিয়ায় নতুন বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের প্রায় অর্ধেক ব্যয়ে প্রতিটি কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
সরকারী পুরনো বিদ্যুত কেন্দ্রের উৎপাদনদক্ষতা ৩০ থেকে ৩৮ ভাগ। সেখানে রিপাওয়ারিং করা হলে ৩০ ভাগ অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ে উৎপাদন দক্ষতা ৫২ ভাগে উন্নীত করা সম্ভব। যদিও এখন কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্টের উৎপাদন দক্ষতা ৫৮ ভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বিদ্যুত বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু আমাদের বিদ্যুত কেন্দ্র রয়েছে তাই কেন্দ্রগুলোর বদলে আবার নতুন করে কম্বাইন্ড সাইকেল নির্মাণ করা সম্ভব নয়। কাজেই যে প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায় তাই করা উচিত। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দামে বেশি বিদ্যুত পাওয়া যাবে। এখন যে জ্বালানির অপচয় হচ্ছে তা বন্ধ হবে।
সূত্রমতে রিপাওয়ারিংয়ের জন্য চিহ্নিত বিদ্যুত কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে ঘোড়াশাল তিন, চার, পাঁচ এবং ছয় নং ইউনিট। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ২১০ মেগাওয়াট। সম্মিলিতভাবে উৎপাদনক্ষমতা ৮৪০ মেগাওয়াট হলেও এখন ক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪০ মেগাওয়াটে। কেন্দ্রগুলো এখন দিনে ৩৯০ এবং রাতে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করছে।
আশুগঞ্জ বিদ্যুত কেন্দ্রের তিন চার এবং পাঁচ নং ইউনিটকে রিপাওয়ারিং করা সম্ভব। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১৫০ মেগাওয়াট। সম্মিলিতভাবে কেন্দ্রগুলো ৪৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন করার কথা থাকলেও এখন কমে ৩৯০ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আশুগঞ্জে ৬২ মেগাওয়াটের আরও দুটি কেন্দ্র রয়েছে যেখানে রিপাওয়ারিং সম্ভব।
বাঘাবাড়ীতে জিটি-১ ইউনিট ৭১ মেগাওয়াট এবং জিটি-২ ইউনিট ১০০ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র রিপাওয়ারিং করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউনিট দুটির সম্মিলিতভাবে ১৭১ মেগাওয়াট উৎপাদন করার কথা থাকলেও ১৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন করছে। এছাড়া শাহাজিবাজারে ৭০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুত কেন্দ্রকে রিপাওয়ারিং করা সম্ভব।
সম্প্রতি পাওয়ারসেল ঘোড়াশাল ৪র্থ ইউনিটকে রিপাওয়ারিং করার উদ্যোগ নিয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারসেলকে খসড়া সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন দিয়েছে। তাতে ২১০ মেগাওয়াটের ইউনিটটির উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ৪০৩ ইউনিটে হবে বলে জানানো হয়েছে। ইউনিটটির রিপাওয়ারিংয়ের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭০ মিলিয়ন ডলার।
রিপাওয়ারিংয়ের জন্য বিদ্যুত কেন্দ্রে স্টিম টারবাইনের দ্বিগুণ ক্ষমতার গ্যাস টারবাইন ছাড়াও বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য হিট রিকভার স্টিম জেনারেটর (এইচআরএসজি) বসাতে হবে। বিদ্যুত বিভাগ সূত্র বলছে, উদ্যোগ নিলে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সব বিদ্যুত কেন্দ্র রিপাওয়ারিং করা সম্ভব। আর যেহেতু কেন্দ্র রয়েছে তাই বিনিয়োগ করতেও দাতারা আগ্রহী হবে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, রিপাওয়ারিং করার ক্ষেত্রে যেসব বিদ্যুত কেন্দ্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে তার বয়স ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। আর যে গ্যাস টারবাইন এবং এইচআরএসজি বসানো হবে তা নতুন। এক্ষেত্রে পুরনো বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোকে আগে পুনর্বাসন করতে হবে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হলেও পুরনো বিদ্যুত কেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি তেমনভাবে আলোচিত হয়নি। উল্টো বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর কম উৎপাদন দক্ষতার কারণে বোঝা মনে করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সম্প্রতি সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয় পাওয়ারসেল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ারসেলের ডিজি মাহবুব সারোয়ার এ কাইনাত বলেন, আরও আগে রিপাওয়ারিংয়ের উদ্যোগ নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের স্থাপিত ক্ষমতা এতটাই কম ছিল যে একটি বিদ্যুত কেন্দ্র বন্ধ করে রিপাওয়ারিংয়ের কাজ করা সম্ভব ছিল না। এখন স্থাপিত ক্ষমতা অনেকটা বেড়েছে। এছাড়া আশুগঞ্জে একটি নতুন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। যে কেন্দ্রটি চালু হলে একে একে রিপাওয়ারিংয়ের কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, রিপাওয়ারিং হলে খুব কম খরচ এবং কম জ্বালানি ব্যয়ে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। এতে করে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

No comments

Powered by Blogger.