আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র! by গাজীউল হাসান খান

যদিও আরব দেশগুলোর নেতৃত্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ থেকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো এবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রতি পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তাব করেছে, তাতেও দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হচ্ছে না।


সিরিয়ার বর্তমান চলমান সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের তিন দফা প্রস্তাব রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে ভেস্তে যাওয়ার পরই সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে উপরোক্ত উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার আগেই বাশার আল আসাদ ঘোষণা দিয়েছেন যে একমাত্র সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর চলমান লড়াইটিই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে। তাঁর বিশ্বাস, সরকারি বাহিনী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বীরোচিত লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী (ফ্রি সিরিয়ান আর্মি) দেশটিকে অস্থিতিশীল ও জনগণকে নিরাপত্তাহীন করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
গত ১৭ মাসব্যাপী এ লড়াইয়ে এ পর্যন্ত ২৫ লাখ সিরীয় মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে প্রতিবেশী তুরস্কে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এ সংখ্যা আগামী কিছুদিনের মধ্যে ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জানা গেছে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সম্প্রতি একটি গোপন নির্দেশনামায় স্বাক্ষর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বিদ্রোহী সশস্ত্র বাহিনী এবং বিপন্ন সিরিয়াবাসীকে অর্থ সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি আরব রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। এর সঙ্গে সামরিক সাহায্যের বিষয়টি এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে কৌশলগত কারণে। এতে বাশার আল আসাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ ইরান অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করা হলে তা আঞ্চলিকভাবে একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এ বিষয়টিকে কিছুটা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, 'সিরিয়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ছায়া যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।' যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন পেনেট্টা ইতিমধ্যে সফর করে গেছেন ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, লড়াইয়েই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে সিরিয়া ও তার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসাদের ভাগ্য।
একদিকে পশ্চিম আফগানিস্তান থেকে ভূমধ্যসাগরের উপকূল পর্যন্ত ইরান ও সিরিয়ার শিয়া শক্তির প্রভাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক গবেষণা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নি সম্প্রদায়গত ধর্মীয় কারণে যেমন সৌদি আরব ও তুরস্ক বিভিন্ন আশঙ্কার মধ্যে পড়েছে, তেমনি ইরানের পারমাণবিক গবেষণার কারণে ইহুদিবাদী ইসরায়েলসহ তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও এ প্রভাববলয়কে অবদমিত করার জন্য সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে। গত বছরের গোড়ার দিকে আলাওয়াইট শিয়াদের শাসনাধীন সিরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী পুনর্গঠনের এক বিশাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল শক্তিশালী শিয়া অধ্যুষিত ইসলামিক রাষ্ট্র ইরান। এতে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিরিয়ার অধিকাংশ নাগরিকই স্বৈরাচারী আসাদ সরকারের অপশাসন ও মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরো সজাগ হয়ে ওঠে। বাবা হাফিজ আল আসাদ ও ছেলে বাশার আল আসাদের ৪৯ বছরের শাসনকালে সিরিয়ার জনগণের রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে তাঁরা নূ্যনতম কোনো সংস্কার কাজে হাত দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া সিরিয়ায় মোট দুই কোটি ২৮ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৭৪ শতাংশ সুন্নি হলেও সংখ্যালঘু শিয়া জনগোষ্ঠী থেকে আগত (১৩ শতাংশ) আসাদ পরিবার বিভিন্ন কৌশলে ক্ষমতায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সামরিক ও অসামরিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আলাওয়াইট শিয়াদের এবং বিশেষ করে নিজ পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ করে বাশার আল আসাদ তাঁর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সম্প্রতি বিদ্রোহী সেনাদের এক আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আসাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তাঁর এক নিকটাত্মীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত অন্য এক ব্যক্তি। বাবার মৃত্যুর পর ২০০০ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বাশার আল আসাদ। কিন্তু দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কায় রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক কোনো সংস্কারেই হাত দেননি তিনি। তাঁর মতে, সিরিয়া একটি বহু জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক দেশ। আরব সমাজতান্ত্রিক বাথ পার্টির নেতৃত্বে একটি সামরিক প্রভাবাধীন তথাকথিত 'পিপলস্ কাউন্সিলের' অধীনে এত দিন দেশটির শাসন পরিচালনা করেছেন আসাদ। কিন্তু দেশের নতুন প্রজন্ম চায় পরিবারতন্ত্র কিংবা স্বজনপ্রীতির অবসান, গণতন্ত্রের চর্চা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার। তাদের প্রয়োজন ব্যাপক কর্মসংস্থান, যার জন্য প্রয়োজন দেশে বিশাল বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন। গণচীন ও রাশিয়া সেদিকে সার্বিকভাবে মনোনিবেশ করলেও আসাদ পরিবারের স্বৈরাচারী শাসন প্রাচীন সভ্যতার অধিকারী সিরিয়াকে সেদিকে এগিয়ে নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
আসাদ পরিবারের শাসনামলে দেশে যখনই পরিবর্তনের দাবি উঠেছে, তখনই জনগণের ওপর নেমে এসেছে নির্যাতনের খৰহস্ত। কিন্তু 'আরব বসন্ত' সম্প্রতি সিরিয়াবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তরুণ সিরীয় জনগোষ্ঠীর আন্দোলনে অবিশ্বাস্যভাবে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেন দেশের বিদ্রোহী সেনাসদস্যরা। জনগণের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনী লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বারবার। ধীরে ধীরে আরব লিগও আসাদ সরকারের ওপর গণতান্ত্রিক সংস্কার ও পুনর্বিন্যাসের জন্য কঠোরভাবে চাপ দিতে শুরু করে। সিরিয়ার মোট জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশ সুন্নি মুসলিম হলেও সংখ্যানুপাতে কখনোই তাদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া কিংবা বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে আকাশে জঙ্গিবিমান ও রাস্তায় জনগণের আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য সামরিক বাহিনীর ট্যাংক নামিয়ে দেওয়া হয়। সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত প্রতিবেশী তুরস্ক সিরিয়ার জনগণের আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে বিতাড়িত সিরীয়দের আশ্রয় দিতে শুরু করে। তার অনেক পরে সে সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য এগিয়ে আসে সৌদি আরব ও কাতার। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সিরিয়ায় বিরাজিত বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও বাশার আল আসাদের অপসারণের জন্য যে প্রস্তাব সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতার উত্থাপন করেছিল, তার পেছনে ছিল মিসর, জর্দান ও বাহরাইনের সমর্থন। সৌদি আরব লড়াইরত বিদ্রোহী সিরীয়দের বেতন দিতেও নিজেদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে বাশার আল আসাদবিরোধী বর্তমান এ আন্দোলন নতুন মোড় নেয় সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন উচ্চপদস্থ অফিসার, আসাদ প্রশাসনের মন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা এবং বিশেষ করে কূটনীতিকদের বিদ্রোহীদের পক্ষে যোগদানের ফলে। বর্তমানে এর পরিমাণ আরো অনেক গুণ বেড়ে গেছে বলে জানা গেছে। পরলোকগত হাফিজ আল আসাদের কেবিনেটের প্রভাবশালী সুন্নি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোস্তাফা তালাস সম্প্রতি বিদ্রোহীদের প্রতি তাঁর সমর্থন ঘোষণা করে আরব বিশ্বকে চমকে দেন। ছাত্র-জনতা ও সেনাসদস্যদের অধিক হারে আসাদবিরোধী শিবিরে যোগদানের কারণে এখন কেন্দ্রীয় দামেস্ক এবং সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেপ্পোর বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহীদের তৎপরতা আরো অনেক জোরদার হয়েছে। সম্প্রতি আলেপ্পোতে তিনটি পুলিশ স্টেশন দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহীরা। জঙ্গিবিমান থেকে শেল নিক্ষেপ কিংবা রাস্তায় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের মুখেও বিদ্রোহীরা ক্রমে আরো শক্তি অর্জন করে দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে সিরিয়ায় সব কিছুই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের হস্তক্ষেপের ফলে হচ্ছে- এ কথা ঠিক নয়। স্বৈরাচারী আসাদের পক্ষে রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার কারণে সিরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে বাদ দিয়ে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের কাছে সমর্থনের জন্য আকুল আবেদন জানিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা সিরিয়ার আপামর জনগণের স্বার্থে আসাদকে পদত্যাগ করে অবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। আবেদন জানিয়েছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করে সরকারি সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য।
আসাদ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মূল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি সম্প্রদায়ের বিদ্রোহী সেনা এবং স্থানীয় ছাত্র-জনতার একটি নির্দিষ্ট অংশ। চলতি বছরের শুরুতে বাশার আল আসাদ ও তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একটি গোপন নির্দেশনামা সই করার পরই তাঁদের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং অন্য সংস্থাগুলো সিরিয়াকে সহায়তাদানের অনুমতি পায়। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি মিত্র রাষ্ট্র ইতিমধ্যে সিরিয়ার বিদ্রোহী সেনাদের মদদ দিতে শুরু করেছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত কয়েক সপ্তাহে বিদ্রোহীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। বিদ্রোহীদের সহায়তার বিষয়ে পশ্চিমা শক্তির মনোভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তুরস্ক ও তার সহযোগীদের পরিচালিত একটি গোপন কমান্ড সেন্টারে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে পুরোদমে তার সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। আসাদবিরোধী সৈন্যদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এবং যোগাযোগবিষয়ক সহায়তা দেওয়ার জন্য তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতার-সিরিয়া সীমান্তের আদানায় (তুরস্ক) একটি গোপন ঘাঁটি নির্মাণ করেছে এবং সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে বলে জানা গেছে। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের হাতে ইতিমধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য অন্তত ২৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র পেঁৗছেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্রোহী ও শরণার্থীদের আড়াই কোটি ডলারের সাহায্য দেওয়া ছাড়াও আরো ছয় কোটি ৪০ লাখ ডলারের মানবিক ত্রাণসহায়তা দেওয়া হবে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে। এরই সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলীয় কংগ্রেস সদস্যরা চান তাঁদের সরকার সরাসরি বিদ্রোহীদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করুক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশেষ করে ব্রিটেন সিরীয়দের মারণাস্ত্র ছাড়া অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও জানা গেছে। এভাবেই সিরিয়ার বামপন্থী কিংবা প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের সামনে দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিংবা পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তি সিরিয়ার চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণে নিজেদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে নীরবে-নিভৃতে। এতে সিরীয় শরণার্থী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে প্রতিবাদ নয়; বরং যথেষ্ট স্বস্তির ভাব ফিরে এসেছে। কারণ তারা তাদের মুক্তির প্রশ্নে চীন-রাশিয়ার বিরোধিতার মুখে কোনো না কোনো বৃহৎ শক্তির সমর্থন চেয়েছিল। সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত জাতিসংঘ ও আরব লিগের বিশেষ দূত কফি আনানের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় এখন অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আলোচনা ও কূটনৈতিক পন্থায় সিরিয়ায় আর জাতিসংঘ ও আরব লিগের শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সিরিয়ায় যুদ্ধরত কোনো পক্ষই কফি আনানের পরিকল্পনাকে মেনে নিতে রাজি নয়। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ নতুন দূত খোঁজার কাজ শুরু করলেও তত দিনে সিরিয়ার অবস্থা কোথায় গড়াবে তা কেউ জানে না।
রমজানের এই চরম সংযমের মাসেও আলেপ্পোর বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহী সেনাদের হত্যা করার লক্ষ্যে জঙ্গিবিমান থেকে উপর্যুপরি গোলাবর্ষণ করে যাচ্ছে সরকারি সেনাবাহিনী। তাদের লক্ষ্য সিরিয়ার অভ্যন্তরে বিদ্রোহী সেনাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং তাদের দখলমুক্ত রাখা। অন্যদিকে তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে এক তুমুল সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে সিরিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিদের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করাই হচ্ছে 'ফ্রি সিরিয়ান আর্মির' (এফএসআই) চূড়ান্ত লক্ষ্য। একপর্যায়ে তারা সিরিয়া থেকে বাশার আল আসাদকে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে দিতেও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সিরিয়ার সেনাবাহিনীর ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাশার আল আসাদের চূড়ান্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াসংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিবৃতির পর বিদ্রোহীরা এখন তাঁকে আর কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। বিদ্রোহী সৈনিক ও সংগ্রামী জনতার এখন একটাই সিদ্ধান্ত- সিরিয়ার মাটিতে যথা শিগগিরই আসাদের স্বৈরশাসনের কবর রচনা করা হবে তাঁকেসহ। সে লক্ষ্যেই এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারা কাজ শুরু করেছে। রাশিয়া ও চীন সে অবস্থায় গণবিরোধী আসাদ সরকারকে কত দিন রক্ষা করার নিশ্চয়তা দিতে পারবে? সুতরাং আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র!
লন্ডন থেকে
লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
gaziulhkhan@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.