প্রসঙ্গ ইসলাম- ই‘তিকাফের গুরুত্ব ও তাৎপর্য by অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

রমাদান মাসের ২০ তারিখের সূর্য অস্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গে জা’মে মসজিদে যে অবস্থান গ্রহণ করেন সায়িম বা রোযাদার তাকে ই‘তিকাফ বলে। ই‘তিকাফের উৎপত্তি হয়েছে ‘আকিফা’ আলায়হি থেকে। ই‘তিকাফ ইবাদতে একাগ্রচিত্ত হবার, একান্তভাবে নিবিষ্ট চিত্তে আল্লাহ্র কুরবত বা নৈকট্য ও রিযামন্দী বা সন্তুষ্টি হাসিল করবার একটা খাস ব্যবস্থা।


ইতিকাফের আভিধানিক অর্থ কোনো স্থানে অবস্থান করা। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছুদিনের জন্য বিশেষ করে মাহে রমাদানের শেষ দশকে মসজিদে অবস্থান করা। বুখারী শরীফে ই‘তিকাফ শীর্ষক একটা অধ্যায় রয়েছে।
রমাদান মাসের শেষ দশক সম্পর্কে প্রিয়নবী সরকারে দো আলম নূরে মুজাসসম হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হিওয়া সাল্লাম বলেছেন : আখিরুহু ইতকুম মিনার নার-এর (রমাদানের) শেষভাগ হচ্ছে দোযখের আগুন থেকে মুক্তির। তিনি রমাদানের শেষ অংশে মসজিদুন নববীতে ই‘তিকাফ করতেন এবং তাঁর সম্মানিত বিবি সাহেবান যাঁর যাঁর হুজরা শরীফে ই‘তিকাফ করতেন। প্রিয় নবী সরকারে দোআলম নূরে মুজাসসম হযরত মুহম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হিওয়া সাল্লাম পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে তাঁর রফীকুল‘আলা আল্লাহ জাল্লা শানুহুর কাছে চলে গেলেন তার প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পূর্বে যে মাহে রমাদান এসেছিল সে রমাদানের শেষ দুই দশকব্যাপী মসজিদুন নববীতে ই‘তিকাফ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতি রমাদানে তিনি শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন। ই‘তিকাফকালে হযরত জিবরাইল ‘আলায়হিস সালাম এসে সেই পর্যন্ত কুরআন মজীদের যেটুকু নাযিল হতো তা শুনতেন এবং শোনাতেন। শেষ দুই দশকে তিনি গোটা কুরআন মজীদের তিলাওয়াত শুনিয়েছিলেন এবং শোনায়ে ছিলেন।
জাগতিক ও সাংসারিক চিন্তা-ভাবনা ও মায়াবন্ধন হতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী, তিলাওয়াতে কুরআন, তসবীহ-তাহলীল, যিকর-আযকারে নিজেকে নিয়োজিত করে নিভৃতে অবস্থান করাটাই হচ্ছে ই‘তিকাফ। ই‘তিকাফ করার জন্য উত্তম স্থান হচ্ছে জামে ‘মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামা’আতের সাথে আদায় করা এবং জুমু’আর সালাত আদায় করার সুবিধার্থে ই‘তিকাফ জামে মসজিদে করাই উচিত।
মসজিদের ভেতরে এক পার্শ্বে প্রয়োজনীয় জায়গা ঘিরে নিয়ে সেখানে ই’তিকাফ করতে হবে। এমনভাবে ঘিরতে হবে যে, সালাতের জামা‘আত যাতে সুষ্ঠুভাবে হতে পারে। জামা‘আতের সময় ঘেরের কাপড় যাতে খোলা যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।
মহিলাগণ যাঁর যাঁর গৃহে নিরিবিলি পরিবেশ সৃষ্টি করে ই’তিকাফ করবেন।
প্রিয়নবী সরকারে দো আলম নূরে মুজাস্্সম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মসজিদুন নববীর তওবার খুঁটির পার্শ্বে ই’তিকাফ করতেন। তাঁর ই‘তিকাফের জন্য সেখানে তাঁবু টাঙ্গিয়ে দেয়া হতো এবং মেঝেতে বিছানা পেতে দেয়া হতো। খাবার-দাবারের ব্যবস্থা সেখানেই করা হতো।
ইস্তিঞ্জা, অযু-গোসল ইত্যাদি অপরিহার্য প্রয়োজন ছাড়া তিনি তাঁবুর বাইরে যেতেন না। অপরিহার্য প্রয়োজন মিটিয়ে দ্রুত তাঁবুতে ফিরে আসতেন। তিনি লায়লাতুল কদরকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
ই‘তিকাফ করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে লায়লাতুল কদরের ফায়দা হাসিল করা এবং সুনির্দিষ্টভাবে লায়লাতুল কদরকে প্রত্যক্ষ করা। লায়লাতুল কদর উম্মতে মুহম্মদীর জন্য আল্লাহ জাল্লা শানুহুর বিশেষ উপহার এবং খাস নি‘আমত।
একবার প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম শাময়ূন নামের বনী ইসরাঈলের একজন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির কথা বলছিলেন, যিনি লাগাতার এক হাজার মাস সারা রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করতেন এবং দিবাভাগে সিয়াম পালন করতেন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করতেন। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আফসোসের স্বরে বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! সৌভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যিনি দীর্ঘ হায়াত পেয়েছেন। আমরাও যদি দীর্ঘ হায়াত পেতাম তাহলে আমরাও তাঁর মতো ইবাদত ও জিহাদ করতে পারতাম। এমনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ জাল্লা শানুহু লায়লাতুল কদরের গুরুত্ব জানিয়ে দিলেন। নাযিল হলো সূরা কদর। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে। আর আপনি কী জানেন কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সেই রাত্রিতে ফেরেশতাগণ এবং রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের রব-এর অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি বিরাজ করে তাতে ফজরের উদয় পর্যন্ত। (সূরা কদর)। এখানে উল্লেখ্য যে, লায়লাতুল কদরে আল্লাহ জাল্লা শানুহু গোটা কুরআন মজীদ লওহে মাহফুজ থেকে পৃথিবীতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট নাযিলের জন্য ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল ‘আলাইহিস্্ সালামের নিকট প্রদান করেন। তিনি তা নিয়ে মক্কার হিরা গুহায় এসে ই‘তিকাফরত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখান এবং পড়তে বলেন। তিনি বলেন : আমি তো পড়তে পারি না, এইভাবে তিন বার বলার পর জিবরাঈল আলায়হিস্্ সালাম প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বুকের সঙ্গে বুক মিলিয়ে চাপ দেন। জ্ঞান রাজ্যের সমস্ত দুয়ার উন্মোচিত হয়ে যায়। তিনি সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াতে কারীমা পাঠ করেন। তখন জিবরাঈল আলায়হিস্্ সালাম প্রথম আসমানে গোটা কুরআন মজীদ সংরক্ষণ করা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ২৩ বছর ধরে কুরআন মজীদের সব অংশ ক্রমান্বয়ে নাযিল হয়। কুরআন মজীদ নাযিলের সূত্রপাতের সেই রাতই হচ্ছে লায়লাতুল কদর। রমাদানের শেষ দশকের যে কোনো বেজোড় রাতে লায়লাতুল কদর বিদ্যমান, তবে অধিকাংশের মতে সেই রাতটি হচ্ছে ২৭ রমাদান রাত। লায়লাতুল কদরকে রমাদানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমাদান রাতে লায়লাতুল কদর খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম, সেজন্যই ই‘তিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। লায়লাতুল কদরের মাহাত্ম্য সম্পর্কে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াব লাভের আশায় লায়লাতুল কদরের রাতে দ-ায়মান হয় (অর্থাৎ সালাত আদায় করে) তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।
যুগ শ্রেষ্ঠ সূফী হযরত মওলানা শাহ সূফী আলহাজ্জ তোয়াজউদ্দীন আহমদ রহমাতুল্লাহি ‘আলায়হি বলেছেন : ই‘তিকাফ হালতে শবে কদরকে একান্ত নিকট হতে অবলোকন করা যায়।’
রমাদান মাসের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া। কোনো পাড়া, মহল্লা কিম্বা এলাকার জামে মসজিদে এক বা একাধিক সায়িম (রোযাদার) ই‘তিকাফ করলে তার সকলের পক্ষ হতে ই‘তিকাফ আদায় হয়ে যায়। কেউই যদি ই‘তিকাফ না করে সেজন্য গুনাহর ভাগিদার অধিবাসীরা সবাই হয়ে যায়।
পেশাব-পায়খানা, অযূ-গোসল ইত্যাদি প্রয়োজনের তাকীদ ছাড়া ই‘তিকাফ অবস্থায় ই‘তিকাফ স্থল ত্যাগ করা যায় না। ঐ সব কারণবশত কেউ যদি বাইরে যেতে বাধ্য হন তাহলে দ্রুত প্রয়োজন মিটিয়ে ফিরে আসবেন। ই‘তিকাফ অবস্থায় দুনিয়াদারী বা পার্থিব কথাবার্তা বলা যায় না, কেনাকাটা করা যায় না। রমাদান মাসের রাতের বেলায় স্ত্রীগমন বৈধ হলেও ই’তিকাফ অবস্থায় তা বৈধ নয়।
ই’তিকাফের ফযীলত বা মাহাত্ম্য অপরিসীম, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি রমাদানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করবে তা হবে তার জন্য দু’টি হজ্জ ও দু’টি উমরাহ পালন করবার সমতুল্য। (বায়হাকী)।
ই‘তিকাফ একটা প্রাচীন রীতি। মক্কার হাশিমীগণ বছরের নির্দিষ্ট সময় গ্রীষ্মকালে বায়তুল্লাহর চত্বরে ই‘তিকাফ করতেন আর আবদুল মুত্তালিব ই‘তিকাফ করতেন হিরা গুহায়। আল্লা জাল্লা শানুহু হযরত মূসা আলায়হিস ছালামকে তূর পাহাড়ে প্রথমে ৩০ দিন পরে আরও ১০ দিন মোট ৪০ দিন সিয়ামসহ ই‘তিকাফ করার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। তা সম্পূর্ণ হলে ৬ রমাদান তার নিকট তওরাত কিতাব নাযিল করা হয় পাথরের ফলকে উৎকীর্ণ অবস্থায়। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : আর আমি মূসার জন্য ত্রিশ রাত্রি নির্ধারিত করি এবং আর দশ দ্বারা তা পূর্ণ করি, এইভাবে তার রব-এর নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়। (সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১৪২)। আম্বিয়া কেরামের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাঁদের জীবনে ই‘তিকাফের চর্চা ব্যাপকভাবে ছিল। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, সূফীয়ায়ে কেরাম ই‘তিকাফ করতেন। ই‘তিকাফ আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য বিশেষ সহায়ক।


লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (স.), সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

No comments

Powered by Blogger.