চীনা অর্থনীতি ॥ বাংলাদেশ অর্থনীতি by ড. আর এম দেবনাথ

গত কয়েক মাসের মধ্যে জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে ঠক খেয়েছি বেশ কয়েকবার। প্রথম ঠক খেয়েছি ইস্টার্ন প্লাস শপিং সেন্টার থেকে একটা টেবিলল্যাম্প কিনতে গিয়ে। এত সুন্দর টেবিলল্যাম্প! দেখেই পছন্দ হয়ে গেল। সুন্দর তো সুন্দর, তার ওপর সুইচ টিপে আলো কমানো-বাড়ানো যায়। কত টাকায় কিনেছিলাম মনে নেই।


বাড়িতে এসে খুব তৃপ্ত বোধ করলাম। এই তৃপ্তি এক মাসও টিকল না। টিপ দিলে আলো আর বাড়ে- কমে না। দু’দিন পর দেখি সুইসও কাজ করে না। এই ঠক খাওয়ার পর আরেক ঠক খেলাম মাল্টিপ্লাগ কিনে। দেখতে খুবই সুন্দর। দামও সস্তা। এক সপ্তাহ ব্যবহার করার পর দেখি মাল্পিপ্লাগ বার বার খোঁচাখুঁচি করতে হয়। কানেকশন ‘লুজ’ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে তা বাতিল করে একজনকে দিয়ে একটা মাল্টিপ্লাগ বানিয়ে নিলাম। তৃতীয় ঠক খাই আমার কাঁধের ব্যাগের একটা ছোট তালা কিনতে গিয়ে। আবার দারুণ সুন্দর দেখতে তালাটা। দাম মাত্র ৫০ টাকা। কিনলাম, এক সপ্তাহও গেল না । নষ্ট হয়ে গেল। আবার কিনলাম সেই একই তালা। এবার দোকানদার গ্যারান্টি দিল। আমার কপালই বোধহয় খারাপ, আবার তা নষ্ট হলো। এই যে অভিজ্ঞতাগুলোর কথা বললাম তা কোন্ দেশের মালামাল সম্পর্কিত। পাঠকরা, বিশ্বাস করুন আর নাই করুন। তিনটা ঘটনাই চাইনিজ মাল নিয়ে । টেবিলল্যাম্প, মাল্টিপ্লাগ ও তালা তিনটিই চাইনিজ। যে দোকানেই গেছি, চেয়েছি ভারতীয় মাল। না ভারতীয় কোন মাল নেই। সব ‘চাইনিজ’। পান থেকে সূচ পর্যন্ত সবই চাইনিজ। অথচ আমার অভিজ্ঞতা এত খারাপ। এটা কি আমার কপালের দোষ, না মালের দোষ, না অন্য কিছু। চীনারা সারা বাংলাদেশের বাজার কেন সারা বিশ্বের বাজার দখল করছে। কিন্তু প্রশ্ন, তারা কি এ ধরনের মাল দিয়ে বিশ্ববাজার দখল করছে, না কি চীনাদের নামে নকল জিনিস তৈরি হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এ কথা জলের মতো পরিষ্কার, চীনাদের বাজার এখন বিশ্বজুড়ে। তাদের রফতানি বাজারের কোন জুড়ি নেই।
বস্তুত চীনা অর্থনীতি শধু রফতানির ওপর নির্ভর করে গত দুই- তিন দশক ধরে চমকপ্রদ রেজাল্ট দেখাচ্ছে। তারা আজ বিশ্বের তাবৎ উন্নত দেশকে পেছনে ফেলছে। জাপান পেছনে, জার্মানি পেছনে, আমেরিকা পেছনে পড়ে পড়ে অবস্থা। গত ২৫-৩০ বছর যাবত চীনা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১০-১৫ শতাংশ হারে। তারা বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ গড়ে তুলেছে তা ঈর্ষণীয়। জাপান ও জার্মানি পেছনে পড়েছে অনেক আগে। মার্কিনীদের যত ঋণ সব এখন চীনাদের কাছে। চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দখল করে করে অবস্থা। ভারতীয়রা চীনাদের পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে। ভারত ও চীন আজ থেকে ২৫০ -৩০০ বছর আগে বিশ্ব অর্থনীতির অর্ধৈক ছিল। দুই-তিন শতক ঘুমিয়ে থাকর পর চীনারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ভারতও তাই। তারা সম্মিলিতভাবে পূর্বের জায়গায় যাচ্ছে বলেই সবার অনুমান। এ হেন চীন এখন আর ঘুমিয়ে নেই। দারিদ্র্যের জায়গাও নয় চীন। চীন এখন প্রাচুর্র্যের দেশ। বাংলাদেশ থেকে যারাই দক্ষিণ চীনে যাচ্ছে তারাই এসে বলছেÑভীষণ ব্যাপার! নির্মাণ শিল্প, আধুনিক শহর এসব দেখে সবাই তাজ্জব। এত উন্নতি। যে চীন থেক ৬০-৭০ বছর আগেও সব ধনী দেশ সমাজতন্ত্রের (লাল চীন) ভয়ে হংকং, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশে পালিয়ে এসেছিল, এসেছিল ঢাকা-কলকাতাতেও সেই চীনে এখন বিলিয়ন (এক হাজার মিলিয়ন সমান এক বিলিয়ন) নয় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক আছে। ধনাঢ্য ব্যক্তি যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে ধনবৈষম্য, আয়বৈষম্য। প্রচ্ছন্ন দারিদ্র্য সর্বত্র। চীনের গ্রামবাসীরা শহরে আসতে পারে না। একে বলে ‘হুকাও সিস্টেম।’ কিন্তু মানুষ দারিদ্র্যের চাপ সইতে না পেরে শহরে আসছে। শহরস্থ মিলফ্যাক্টরি-দোকানপাট তাদের কাজ দিচ্ছে, কিন্তু অর্ধেক বেতনে। এ দিয়ে তাদের সংসার চলে না। তাদের থাকার ব্যবস্থা নেই, চিকিৎসা নেই। যেমন ক্যাইন শহরে (বর্তমান নাম ভিন্ন) দেড় কোটি লোক কাজ করে। এর মধ্যে মাত্র ৩০ লাখ লোক সরকারীভাবে, বাকিরা কাজ করে অবৈধভাবে। এভাবে গ্রাম খালি হয়ে মানুষ শহরে আসে। এদের সস্তায় খাটিয়ে চীন গড়ে তুলেছে বিরাট এক রফতানি অর্থনীতি। চীনের রফতানি ব্যবসা ভীষণভাবে ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল যা বহন করার ক্ষমতা দীর্ঘদিন চীনের থাকবে না। রফতানি বাজার না অভ্যন্তরীণ বাজার, এই বিতর্ক এখন চীনে। রফতানির্নিভর এই প্রাচুর্য ধরে রাখা যাবে কিনা এ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। ইতোমধ্যে পশ্চিমা মন্দার কারণে লাখ লাখ চীনা বেকার হয়ে পড়েছে। অসন্তোষ জন্ম নিচ্ছে সর্বত্র। চীন শ্রমিক ও মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের কোন মূল্য দেয় না। সরকারী ব্যাংকগুলো তাদেরকে খুব কম সুদ দেয়। অথচ রফতানির জন্য সুদের হার খুবই কম। অর্থাৎ সঞ্চয়কারীদের ঠকিয়ে চীন রফতানি শিল্প গড়ে তুলছে। এ নিয়ে চীনাদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। নতুন প্রাচুর্য এখন চীনাদের নানা প্রশ্নের সমুখীন করছে। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, ঋণবৈষম্য চীনা সমাজকে ‘ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে। চীনারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। ১৯৯৩ সালে যেখানে প্রতিবাদসভার সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৩০০ সেস্থলে ২০১১ সালে সেই প্রতিবাদসভার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮০০০০-এ। এর থেকেই বোঝা যায় অসন্তোষের আকার কি?
চীনরা ব্যাংকগুলোকে মনে করে ‘শোষণের যন্ত্র’। আর্থিক নির্র্যাতন করে চীনা সরকারী ব্যাংকগুলো।
চীন থেকে শিক্ষা কি? চীনের দারিদ্র্য, প্রচ্ছন্ন দারিদ্র্য আছে। আমাদেরও তা আছে। চীনে প্রচ- বৈষম্য আছে, আমাদের তা আছে। চীনের ব্যাংকগুলো শোষণের হাতিয়ার। সাধারণ মানুষকে তারা কোন সুদ দিতে চায় না। আমাদের ব্যাংকও তাই। চীনের অর্থনীতি রফতানিনির্ভর। আমাদের অর্থনীতিও রফতানিনির্ভরÑহয় মাল রফতানি না হয় শ্রমশক্তি রফতানি । চীনের গ্রাম থেকে শহরে মানুষ আসতে পারে না। সরকারী বাধা আছে, তবু মানুষ আসে। এবং কম বেতনে চাকরি করে । তাদের থাকার জায়গা নেই। চিকিৎসার সুযোগ নেই। শিক্ষার সুযোগ নেই। আমদের গ্রামবাসীদের ঢাকায় আসতে কোন বাধা নেই। তারা আসছে বানের স্রোতের মতো। তাদেরও ন্যায্য বেতন দেয়া হয় না। এদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের কোন ব্যবস্থা নেই। চীনের রফতানি বাণিজ্য ভর্তুকি নির্ভর। আমাদেরও তাই। চীন প্রাচুর্যের দেশ, শক্তিশালী দেশ। সারা বিশ্ব তারা গিলে খেতে চাইছে। তারা মার্কিনীদের সঙ্গে টেক্কা দিতে চাইছে। এটা আমরা নই। আমরাও প্রাচুর্যের মুখ দেখছি। কিন্তু সেটা কিছুসংখ্যক লোকের জন্য। কিন্তু চাকচিক্য আমাদেরও আছে। আমাদের অর্থনীতি ছোট। কিন্তু সম্ভাবনাময়। এসব দিক বিবেচনা করলে দেখা যাবে চীনের অর্থনৈতিক-সামাজিক সব রোগ আমাদের আছে এবং এসব রোগ দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করেছ। তবে চীনের মাটি বা এলাকা বিশাল। আমাদের জমি কম। চীনা ব্যাংকাররা যেমন সঞ্চয়কারীদের কোন মূল্য দেয় না তেমনি আমাদের ব্যাংকাররা সঞ্চয়কারীদের কোন মূল্য দেয় না। একটি উদাহরণ দিয়ে শেষ করব আজকের নিবন্ধ।
ধরা যাক সঞ্চয়ী আমানতের কথা। এই আমানতটা সাধারণ সঞ্চয়কারীদের । সাধারণ মানুষের। তাদের টাকাই থাকে এই সঞ্চয়ী আমানতে । একে বলা হয় কোর ডিপোজিট। সঞ্চয়ী আমানতে টাকা জমে। মানুষ বিপদে না পড়লে কেউ এর থেকে টাকা তোলে না। মেয়াদি আমানত একটু অবস্থাপন্নদের যারা টাকা ধরে রাখতে পারে দীর্ঘদিনের জন্য এবং যাদের আয় ভাল। বাংলাদেশে দেখা যায় মেয়াদি আমানতে এখন সুদ দেয়া হচ্ছে সাড়ে বারো শতাংশ হারে। অথচ সঞ্চয়ী আমানতের সুদের হার মাত্র ৫ দশমিক ০৬ শতাংশ। তারপর কত ধরনের টাকা এর থেকে কেটে রাখা হয়। এই সুদের ওপর আবার দশ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কাটা হয়। এখন থেকে কাটা হবে ১৫ শতাংশ যদি না ‘টিআইএন’ থাকে। তার অর্থ বস্তুত সুদের হার হবে ৪ শতাংশ। বর্তমানে সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা। এক লাখ কোটি টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে সুদ হয় দশ হাজার কোটি টাকা। দেয়া হয় মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের ফর্মুলানুযায়ী সঞ্চয়ী আমানতের ৮৫ শতাংশ টাকা মেয়াদি আমানত হিসাবে গণ্য করা হয়। যদি তাই হবে তা হলে মেয়াদি আমানতের ওপর প্রযোজ্য সুদ সঞ্চয়ী আমানতে দিতে অসুবিধা কোথায়? এতে সাধারণ মানুষ প্রচুর উপকৃত হতো। কিন্তু তা হচ্ছে না। এর প্রতিকার কি?

লেখক : সাবেক অধ্যাপক বিআইবিএম

No comments

Powered by Blogger.