অস্থিতিশীলতা-নিজেদের তৈরি করা ফাঁদে পাকিস্তান by ইরফান হোসাইন

ম্পূর্ণ হাওয়া থেকে সংকট বানিয়েনিজেরাই তাতে মেতে আছি। খামাখাই নাটক তৈরির অসীম সামর্থ্যের নতুন নমুনা হলো, সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে চলমান সংঘাত। মেমোগেট কেলেঙ্কারির সূত্র ধরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে সেনাপ্রধান ও আইএসআই-প্রধান বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা এড়িয়ে অসাংবিধানিক কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী গিলানি। তাঁর অভিযোগের জবাবে সেনাপ্রধানও ক্রোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
সামরিক বাহিনীর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের কারণে সৃষ্ট জটিলতা এবং এর অশুভ পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে।
যে সেনাবাহিনী অসাংবিধানিকতার অভিযোগ শুনে অখুশি, সেই বাহিনী এর আগে চারবার সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বেসামরিক সরকারকে অপসারণ করেছে। অস্থিতিশীলতা তৈরিতে এখনো বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে তারা। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের জবাবে জেনারেলদের ক্রোধ প্রকাশও পরিহাসে ভরা। সাংবিধানিকভাবে চলতে চাইলে সশস্ত্র বাহিনীগুলোর উচিত কমান্ডার হিসেবে প্রেসিডেন্টকে মান্য করা ও শ্রদ্ধা জানানো।
বাইরে থেকে দেখলে জেনারেলরা আসিফ আলী জারদারির অধীনে বিরক্ত। কিন্তু এর থেকে ভালো বিকল্পও তাঁদের সামনে নেই। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রতিশোধ নিতে অধীর নওয়াজ শরিফের চেয়ে তাঁরা বরং কমজোরি জারদারিকেই রাখতে চাইবে। কিন্তু মঞ্চে ইমরান খানের আবির্ভাবে তাঁদের জন্য তৃতীয় একটা পথ খুলে গেছে। কায়েমি মহলের মদদে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খান গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। অতএব, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য চাপাচাপিও শুরু হয়ে গেছে।
সম্প্রতি ফরেন পলিসি ইন ফোকাস পত্রিকায় ‘পাকিস্তান: ধীরলয়ের অভ্যুত্থান’ শীর্ষক লেখায় মার্কিন বিশ্লেষক ক্রিস্টিন ফেয়ার লিখেছেন, ‘শয়তানকে নাম ধরেই ডাকা যাক: মেমোগেটকে বোঝা উচিত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দাদের একটি সূক্ষ চক্রান্ত হিসেবে। রাষ্ট্রদূত হোসাইন হাক্কানির মাধ্যমে গোলমেলে সুড়সুড়ির ঘটনা নয় এটা। এর লক্ষ্য ছিল মেমোগেট কেলেঙ্কারির উসিলায় উচ্চ আদালতের মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের পতন ঘটানো। (মেমোগেট পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কেলেঙ্কারির নাম। যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে একটি চিঠি পৌঁছানো হয়। হাক্কানীচিঠিটা মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব দেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন ব্যবসায়ী মনসুর আইজাজকে। মনসুর এই খবর মার্কিন গণমাধ্যমে ফাঁস করলে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীবনাম সরকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।) ওই চিঠিতে বলা হয়, সেনাপ্রধান ও আইএসআই-প্রধানকে অপসারণে মার্কিন সহায়তা দরকার। অভিযোগ রয়েছে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হাক্কানি গিলানি সরকারের হয়েই এই চিঠি পাঠিয়েছেন।
রাজনৈতিক দলগুলো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে মার্চে আসন্ন সিনেট নির্বাচনের আগেই সরকারের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশ্য ও গোপনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কোয়ালিশন সরকারের কি উচিত তত দিন পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা? কেননা, সিনেটের ওপরের কক্ষে সরকারি দল পিপিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে যেকোনো আইন প্রণয়নে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা পাওয়ার আশা রাখে।
বিরোধী দলগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত। সরকারের বিরুদ্ধে যারা কাজ করছে, তাদের মধ্যে এরাই বেশি, এরাই টিভি টক শোগুলো মাতিয়ে রাখে। এ অবস্থায় হয়তো পিপিপি সরকার শিগগরিই এভাবে বা সেভাবে পতিত হবে।
কিন্তু সেনাবাহিনীও যেহেতু একা কিছু করতে অনিচ্ছুক, সেহেতু বন্দুকের ট্রিগার টেপার চাপটা আসছে সুপ্রিম কোর্টের ওপরই। একদিকে মেমোগেট কেলেঙ্কারি, অন্যদিকে বাতিল এনআরও (১৯৮৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দুই দফা সেনাশাসনের সময় কৃত খুন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির দায়মুক্তি অধ্যাদেশ, পরে সুপ্রিম কোর্ট যা বাতিল করে); বলা যায়, সুপ্রিম কোর্টের দোনলা বন্দুকের দুটি নলই ভরা ও তৈরি। খুশিতে আত্মহারা হওয়ার আগেই আসুন দেখি, আরেকটি নির্বাচিত সরকারকে অসময়ে সরিয়ে দেওয়ার পরিণতি কী হতে পারে?
মিডিয়ার রক্তপাতের ডাকাডাকি আর বিচার বিভাগের কুঠার হাতে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা পাকিস্তানের জন্য এক অস্বাস্থ্যকর দৃষ্টান্ত। পিপিপিকে চতুর্থবারের মতো মেয়াদ শেষের আগেই ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে রক্তপাত ঘটবে। অথচ অযোগ্যতার জন্য দলটিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে, তা করা যেত আগামী নির্বাচনে ভোটারদের রায়ের মাধ্যমে।
তুরস্কে কিছুদিন আগেই সাবেক সেনাপ্রধানকে এরদোগান সরকারকে উচ্ছেদে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হতে দেখা গেল। কিন্তু কিছুদিন আগ পর্যন্তও তুরস্কের সেনাবাহিনী এবং এর জাতীয়তাবাদী সমর্থকদের রাষ্ট্রের ভেতরে আরও গভীর রাষ্ট্র (ডিপ স্টেট) হিসেবে ভাবা হতো। রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর বিরাট প্রভাবও পাকিস্তানের মতোই ছিল। তাহলে তুরস্কে কী এমন ঘটল যে অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচিত সরকারের পক্ষে দায়িত্বরত এবং সাবেক জেনারেলদের আরেকটি ক্যু ঘটানোর চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলো? উত্তরটি এক শব্দেই দেওয়া যায়: সুশাসন।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মধ্যপন্থী ইসলামি ন্যায়বিচার ও উন্নয়ন (একে) দল অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটায়। তারপর ধীরে ধীরে তারা সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে থাকে। একের পর এক তুমুল জনপ্রিয় বিজয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এরদোগান এই ডিপ স্টেটকে রাজনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে সক্ষম হন।
পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ও সিভিল সোসাইটির জন্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার ব্যাপার ছিল। এরা উভয়ই দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছে, সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত হয়ে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা কেউ সেধে তুলে দেয় না, তা দখল করতে হয়।
ট্যাংক ও বাহিনীহীন রাজনীতিবিদদের উচিত ছিল ক্ষমতায় বসে দক্ষতার প্রমাণ রাখা। উচিত ছিল, নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। কিন্তু বারবার আদালতে আর সেনাবাহিনীর কাছে দৌড়াদৌড়ি করে তাঁরা গণতন্ত্রকে দুর্বলই করেছেন। গত চার বছরে এই সরকার যদি জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করত, তাহলে আজ সেনাহুমকির মুখে এতটা দুর্বল বোধ করত না তারা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হতাশাজনক কাজকর্মের ফলে এদের সমর্থন করার লোক কম।
তা সত্ত্বেও আমি মনে করি, আদালত বা জেনারেলদের নির্বাচিত সরকারের ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকার নেই। এই কাজের অধিকার একমাত্র ভোটারদের। মেয়াদের আগেই ক্ষমতাচ্যুতি এবং অভ্যুত্থানের বিষাক্ত চক্র ভাঙার তাই এখনই সময়।
অনেকেই এখনো বুঝতে পারছেন না, মনসুর আইজাজের মতো সন্দেহজনক লোকের পক্ষে কীভাবে সরকারকে পতনের কিনারে ঠেলে আনা সম্ভব হলো। মনে রাখতে হবে, তিনি প্রায়ই প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও আইএসআইকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের জন্য দোষারোপ করে থাকেন। কিন্তু যখন সেনাপ্রধান আশফাক কায়ানি এবং জেনারেল পাশা হোসাইন হাক্কানির বিরুদ্ধে মনসুরের অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ও সর্বাধিনায়কের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, তখন একটা পরিকল্পনার আভাসও স্পষ্ট হতে থাকে। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশিদের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেওয়ার আমি ঘোরবিরোধী। তাহলেও, মেমোগেটের অভিযোগ যদি সত্যিও হয়, তা তো ছিল সেনাবাহিনীকে নির্বাচিত সরকারের অধীনে আনার জন্য। আমাদের সংবিধান কি এটাই করতে বলেনি?
দি ট্রিবিউন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
ইরফান হোসাইন: পাকিস্তানি বিশ্লেষক, ফ্যাটাল ফল্টলাইনস: পাকিস্তান, ইসলাম অ্যান্ড দি ওয়েস্ট গ্রন্থের লেখক।

No comments

Powered by Blogger.