প্রসঙ্গ ইসি পুনর্গঠন-রাষ্ট্রপতির ভাবনায় তিন প্রস্তাব-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক by শাহেদ চৌধুরী

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সুনির্দিষ্ট তিনটি প্রস্তাবের কথা ভাবছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান। এ তিনটি প্রস্তাব হচ্ছে_ সার্চ কমিটি গঠন, আইন প্রণয়ন এবং সরাসরি নির্বাচন কমিশন গঠন। এদিকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের পর গতকাল শনিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই নেতারা রাষ্ট্রপতির সংলাপে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।


বঙ্গভবন সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন গঠনের বেলায় তিনটি প্রস্তাব নিয়ে ভাবছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে তিনি এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে আগামী দুই থেকে তিন দিন কিংবা চলতি সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।
রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ২৪টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সংলাপ করেছেন। গত ২২ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে রাজনৈতিক দলের নেতারা সার্চ কমিটি গঠন, আইন প্রণয়ন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন বহাল রাখা, নতুন কমিশনার হিসেবে নাম প্রস্তাব, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ এবং প্রধান দুই জোট মনোনীত চারজন নির্বাচন
কমিশনার নিয়োগ এবং নির্বাচন কমিশন গঠনের আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের প্রস্তাব দিয়েছেন।
এসব প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই চিন্তা-ভাবনা করছেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। এ প্রসঙ্গে গত ১২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপ শেষ হওয়ার পর দলের সাধারণ সম্পাদক এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে প্রয়োজনে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
একাধিক মন্ত্রী সমকালকে জানান, সার্চ কমিটি গঠনের জন্য আইন করতে হবে। এ আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সার্চ কমিটি করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় নেই। আইন প্রণয়নের জন্য যে সময়ের দরকার হবে, তার আগেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে।
আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার মেয়াদ শেষ হবে। অন্য দুই কমিশনারের মধ্যে ছহুল হোসাইনের মেয়াদ ৫ ফেব্রুয়ারি এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের মেয়াদ শেষ হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। এ সময়ের মধ্যে আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা খুবই কম। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।
আগামী ২৫ জানুয়ারি থেকে নবম সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করতে হলে ২৬ জানুয়ারি বিল আনতে হবে। বিলটি অনুমোদনের আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাচাই-বাছাই এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে (মতামত) যেতে হবে; কিন্তু ৪ ফেব্রুয়ারির আগে তা সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রাষ্ট্রপতি সরাসরি নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন বলে মনে করছেন না অনেকেই। তাদের মতে, সংলাপের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি সবার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি অবশ্যই সব রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেবেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রয়োজন হলে সরকারের সহায়তা চাইবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আ'লীগ নেতাদের বৈঠক : গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক নেতাদের অনির্ধারিত বৈঠকে বলা হয়েছে, সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ঐকমত্য সৃষ্টির জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বিকল্প কোনো উদ্যোগ নিলে আওয়ামী লীগ সেটা মেনে নেবে। তবে রাষ্ট্রপতির প্রস্তাবের পর আবারও বৈঠকে বসবে আওয়ামী লীগ।
একটানা প্রায় দুই ঘণ্টার এ বৈঠকে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের মধ্যকার সংলাপের বিষয়াদি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন দলের সাধারণ সম্পাদক এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ভারতের ত্রিপুরা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ত্রিপুরায় থাকায় রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নিতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কী ধরনের আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করবেন, সংলাপ আলোচনায় সেটা পরিষ্কার করেছেন কি-না। এর জবাবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, আইন প্রণয়নের প্রস্তাবের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
গতকালের বৈঠকে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই বর্তমান সরকারের আমলে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে। আর পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের প্রস্তাব সরকারের কাছে এসেছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির প্রমাণ দিতে পারেনি এবং এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানিয়েছেন।
এ সময় যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, তিনি দেশজুড়ে ভাঙা রাস্তাঘাট সংস্কারের চেষ্টা করছেন। কিন্তু টাকা নেই। তিনি রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট চেয়েছেন। রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলওয়ের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের রেলের উন্নয়নে ভারতের সম্ভাব্য সহায়তার কথা জানান।
এ বৈঠকে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর চার সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, উপদেষ্টা পরিষদের তিন সদস্য আমির হোসেন আমু, আবদুল জলিল এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি থাকায় সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, কাজী জাফর উল্লাহ এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

No comments

Powered by Blogger.