কালের আয়নায়-প্রদীপের নিচে অন্ধকার জমে উঠছে by আবদুল গাফফার চৌধুরী

ই খতিয়ান আরও দীর্ঘ করতে পারি। তা করতে চাই না। আমার বলার কথা, শেখ হাসিনা নিজে সূর্য হয়ে আর কত আলো বিতরণ করবেন? দিনের শেষে যদি রাত্রি নামে, তার জন্য তো কিছু নক্ষত্র সৃষ্টি করা দরকার, তা তিনি পারছেন না। দলে কক্ষচ্যুত অশুভ নক্ষত্রগুলো আবার ফিরে আসছে। তাদের প্রভাব বাড়ছে। প্রদীপের আলোর নিচে জমছে ঘন অন্ধকার। শেখ হাসিনা নিজের সাফল্যের আলো দিয়ে আর কতদিন এই অন্ধকার ঢাকা দিয়ে রাখতে পারবেন?


আমরা শুধু তাকে হুশিয়ার করতে পারি। তিনি হুশিয়ার না হলে তো কারও কিছু করার নেই গোলাম আযম গ্রেফতার হওয়ার পর দেশ-বিদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না, তিনি তা করেছেন। '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের গায়ে হাত দেওয়া যাবে না, তিনি তাদের গায়ে হাত দিয়েছেন। গোলাম আযমকে গ্রেফতার করা যাবে না, তাকেও শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করেছেন। লন্ডনের বিবিসি রেডিওর ক্লাবে আড্ডা দিতে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বন্ধু পশ্চিমা সাংবাদিকই মন্তব্য করলেন, She is an outsiding Asian leaderÕ , হাসিনা একজন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এশিয়ান নেতা।
আমার নিজের মতেও শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশে ঘুরে ঘুরে সম্মানসূচক অসংখ্য ডক্টরেট কুড়িয়ে যে সম্মান অর্জন করতে (সম্প্রতি বিরাট দল নিয়ে আগরতলা থেকেও সম্মান নিয়ে এসেছেন) পারেননি, সেই সম্মান তিনি অর্জন করেছেন দেশ পরিচালনায় তার পিতার মতো দুর্জয় সাহসের পরিচয় দিয়ে। বিবিসি ক্লাবের আড্ডাতেই বসে পাকিস্তানের ফ্রাইডে টাইমস পত্রিকায় লন্ডনে বসবাসকারী এক সাংবাদিক আমাকে বলেছেন, 'আমাদের বেনজির ভুট্টো ছিলেন অক্সফোর্ড শিক্ষিতা। কিন্তু শেখ হাসিনা একজন সাধারণ শিক্ষিত গৃহবধূ হয়ে রাজনীতিতে এসে এবং দেশ শাসনে যে সাহস ও চমক দেখালেন, তার কোনো তুলনা নেই। বেনজির কোনোভাবেই হাসিনার সঙ্গে তুলনীয় নন।'
এ ধরনের কথা অনেক বিদেশি বন্ধুর মুখেই শুনেছি। কথায় বলে, 'ঘরকা মুরগি ডাল বরাবর।' হাসিনা যেহেতু আমাদের ঘরের মেয়ে, তাই তার সাফল্যটা সহসা আমাদের চোখে পড়ে না, তার পরিমাপ আমরা করতে পারি না। যতটা তার ত্রুটি আছে, তাকে আরও বড় করে দেখি। শরৎচন্দ্র বলেছেন, 'ঘরের বউয়ের যতো রূপগুণই থাকুক, শাশুড়ি তাহার দোষ খুঁজিয়া বাহির করিবেনই।' শেখ হাসিনার মন্দভাগ্য; তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অগি্নপরীক্ষায় বারবার প্রাণবাজি রেখে উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও শরৎচন্দ্রের কথিত শাশুড়ির মতো আমাদের একটি সুশীল সমাজের কাছ থেকে কখনও কোনো সুনাম অর্জন করতে পারেননি।
ভারতে জওয়াহেরলাল নেহরু নিজ হাতে মেয়ে ইন্দিরাকে রাজনীতিতে দীক্ষা দিয়েছিলেন; নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা খাটিয়ে তাকে কংগ্রেসের সভানেত্রী করেছিলেন; নিজের মৃত্যুর পর মেয়েকে দিলি্লর সিংহাসনে বসানোর সব ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেয়ে হাসিনাকে রাজনীতিতে টানা দূরের কথা, দ্রুত বিয়ে দিয়ে সংসারধর্ম করতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ছাত্ররাজনীতি ছাড়া শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা শূন্য। রাজনীতিতে পা দেওয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন দুই সন্তানের জননী। একজন গ্র্যাজুয়েট গৃহবধূ। একজন রাজনীতিবিমুখ বিজ্ঞানীর স্ত্রী।
দেশের এক দারুণ সংকট সন্ধিক্ষণে তাকে দেশ এবং দলকে রক্ষার জন্য রাজনীতিতে ডেকে আনা হয়েছিল। তারপর থেকে ত্রিশ বছর ধরে তিনি একটানা দেশের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলটির নেত্রীপদে আসীন রয়েছেন। দু'দু'বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ভবিষ্যতেও নির্বাচন জিতে হতে পারেন। এটা একটা রেকর্ড সৃষ্টিকারী ইতিহাস। তার বড় বড় সাফল্যের তালিকায় রয়েছে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যে আওয়ামী লীগকে বলা হতো একটি unelectable party বা নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য পার্টি; সেই পার্টিকে এক সময়ের আর্মি, আমেরিকা ও জঙ্গি মৌলবাদীদের সম্মিলিত বাধা অতিক্রম করে নির্বাচনে জয়ী করেছেন। ক্ষমতায় বসিয়েছেন।
তার সবচেয়ে বড় সাফল্য বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার এবং মুখ্য ঘাতকদের ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো। যে কাজটি মিয়ানমারের অং সান সু চি কিংবা পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো পারেননি। আউং সান কন্যার কাছে ক্ষমা চেয়েই লিখছি, তার দেশের সামরিক বাহিনীর হাতে তার পিতা গোটা কেবিনেটসহ নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর তিনি শিশু বয়সেই বিদেশে চলে যান। কিন্তু বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পরও দেশে ফেরেননি। বিদেশি স্বামী গ্রহণ করে বিদেশেই ঘর-সংসার করতে থাকেন। পিতৃহত্যার চলি্লশ বছর পর দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাকে ডেকে আনতে হয়। তিনি বছরের পর বছর গৃহবন্দি থেকেছেন। কিন্তু পশ্চিমা বৃহৎ শক্তির সমর্থন ও সাহায্য পাওয়া সত্ত্বেও কোনো আন্দোলন সফল করতে পারেননি। পিতৃহত্যাকারী ঘাতকদের বিচার ও শাস্তি দেওয়া দূরের কথা।
পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টো তার পিতাকে হত্যাকারী সামরিক জান্তার সঙ্গে আপস করেই রাজনীতি করেছেন, ক্ষমতায় বসেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সামরিক গোয়েন্দা চক্র এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের যুক্ত চক্রান্তেই তিনি নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছেন বলা হয়। এদিক থেকে শেখ হাসিনার রেকর্ড সাম্প্রতিক বিশ্বে অতুলনীয়। তার নেতৃত্বে সামরিক ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন জয়যুক্ত হয়েছে। শুধু নিজের পিতা নয়, জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার করে তাদের অধিকাংশকে শাস্তি দিয়েছেন এবং অনুরূপ বড় সাফল্য, তিনি গোটা জাতির সর্বসম্মত দাবি মেনে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতাদ্রোহীদের বিচার দেশি-বিদেশি বিশাল চক্রান্ত মোকাবেলা করে শুরু করতে যাচ্ছেন।
নুরেমবার্গ বিচারে নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি হওয়ার পর চার্চিল বলেছিলেন, 'আমি মানবতার কাছে দায়মুক্ত হলাম, এর চেয়ে বড় সাফল্য আমি আর কোনো কিছু দাবি করি না।'
বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তিদানের পর শেখ হাসিনা যদি একাত্তরের এই নরপশুদের বিচার এবং শাস্তিদানের ব্যবস্থাটি করে যেতে পারেন, তাহলে তিনি শুধু জাতির কাছেই দায়মুক্ত হবেন না, তার সরকারের সব ব্যর্থতা ত্রুটির উধর্ে্ব উঠে সমকালীন ইতিহাসে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনেতাদের মধ্যে নিজের স্থানটি স্থায়ী করে যেতে পারবেন।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাফল্য অতুলনীয়, এ কথা স্বীকার করতে আমার কেন, অনেকেরই দ্বিধা নেই। কিন্তু তার সরকারের প্রশাসনিক ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। প্রদীপের নিচে অন্ধকার জমা হওয়ার মতো তা দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। এই প্রশাসনিক ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য তার প্রাথমিকভাবে বেশি অদক্ষ ও অযোগ্য মন্ত্রী বাছাইয়ের নীতিকে দায়ী না করে পারা যায় না। তার ওপর মন্ত্রীদের মাথায় কিছু নামসর্বস্ব উপদেষ্টা বসিয়ে যে দ্বৈতশাসন প্রবর্তন করা হয়েছে তা প্রশাসনকে দক্ষতা ও গতি না দিয়ে আরও গতিহীন এবং অদক্ষ করে তুলেছে।
বর্তমান সরকারে যে ক'জন দক্ষ ও সফল মন্ত্রী আছেন, তাদের সাফল্য বিরাট হওয়া সত্ত্বেও অদক্ষ ও অযোগ্য মন্ত্রীদের কার্যকলাপে তা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। কেবিনেট সরকারের কার্যকলাপ সবসময় টিমওয়ার্ক দিয়ে বিচার করা হয়। বর্তমান সরকারের টিমওয়ার্ক ভালো হচ্ছে না বলে দক্ষ মন্ত্রীদের সাফল্যগুলোও মিডিয়ার কাছে স্বীকৃতি পাচ্ছে, কিন্তু দেশবাসীর চোখে তেমনভাবে ধরা পড়ছে না। মনে হয় না, নির্বাচনের একেবারে কাছাকাছি যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভাকে গতিময় করে তোলার জন্য কোনো প্রকার উল্লেখযোগ্য রদবদল ঘটাবেন। শেষ পর্যন্ত যখন ঘটাবেন, তখন তা তেমন কাজ দেবে কিনা তা বলা মুশকিল।
মন্ত্রিসভায় অদক্ষ ও অযোগ্য মন্ত্রীদের সংখ্যা যদি বেশি হয়, তাহলে আমলাদের দাপট বাড়ে। বর্তমান মন্ত্রিসভার মাথার ওপর চেপে বসা অধিকাংশ উপদেষ্টা সাবেক আমলা। তাতে এই সরকারেরও একটা আমলাতান্ত্রিক চরিত্র গড়ে উঠেছে এবং আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে। যদি কোনো রাজনৈতিক সরকার আমলাতন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে তার গণবিচ্ছিন্নতা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং সাফল্যের বদলে অসাফল্যের পাল্লা ভারী হতে থাকে।
সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দূর করা এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও সুস্থ করে তোলার ব্যাপারেও আওয়ামী লীগ সরকার আগের বিএনপি আমলের অসুস্থ ও অশুভ নীতির অনুসরণ থেকে মুক্ত হতে পারছে বলে মনে হয় না। যুবদল ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসের ভূমিকাটি এখন গ্রহণ করেছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। দুর্নীতি সম্পর্কে এক আওয়ামী মন্ত্রী আমাকে ঠাট্টা করে বলেছেন, ÔWe did not create it, but inherited it from BNPÕ. 'অর্থাৎ দুর্নীতি আমরা সৃষ্টি করিনি, তবে বিএনপির কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে গ্রহণ করেছি।' এটা একজন মন্ত্রী ঠাট্টা করে বললেও এটা তাদের অনেকের মনের কথা।
অথচ দেশবাসীর কাছে এই সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করতে না পারলেও তার লাগাম দৃঢ়ভাবে টেনে ধরা। বর্তমান সরকার বহু ক্ষেত্রে তা পারেনি। দেশবাসী কল্পনা করেনি, এই সরকারের আমলে একটি বড় হাওয়া ভবনের বদলে ছোট ছোট হাওয়া ভবন গড়ে উঠবে এবং বিএনপি আমলের মতোই বড় বড় সন্ত্রাসের নায়করা সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে বিচার ও শাস্তি এড়াতে পারবে। বিএনপি আমলের মতোই সন্ত্রাস ও দুর্নীতির জন্য অভিযুক্ত দলীয় রাঘববোয়ালদের পাইকারি হারে সব অভিযোগ ও মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে এটা কি দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে আশা করেছিল? নাকি আশা করেছিল, এগুলোর অধিকাংশ যদি মিথ্যা ও সাজানো মামলাও হয়ে থাকে, তাহলে এগুলোর নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করে বিচার পদ্ধতির মারফতই একে একে মিথ্যা মামলাগুলো খারিজ করে দেওয়া?
এই সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মামলা পাইকারি হারে খারিজ এবং অভিযুক্তদের খালাস দেওয়ার ব্যাপারে বিএনপি আমলের নীতি অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ সরকার যা করল, তাতে তারেক রহমান, আরাফাত রহমান কোকোসহ বড় বড় দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মামলায় অভিযুক্তদের ভবিষ্যতে সব অভিযোগ, সব মামলা-মোকদ্দমা থেকে মুক্ত হয়ে, বিচার থেকে রেহাই পেয়ে সমাজ জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠার, এমনকি রাজনৈতিক নেতৃত্বে ফিরে আসার পথ প্রশস্ত করে দিল বলা চলে।
এই খতিয়ান আরও দীর্ঘ করতে পারি। তা করতে চাই না। আমার বলার কথা, শেখ হাসিনা নিজে সূর্য হয়ে আর কত আলো বিতরণ করবেন? দিনের শেষে যদি রাত্রি নামে, তার জন্য তো কিছু নক্ষত্র সৃষ্টি করা দরকার, তা তিনি পারছেন না। দলে কক্ষচ্যুত অশুভ নক্ষত্রগুলো আবার ফিরে আসছে। তাদের প্রভাব বাড়ছে। প্রদীপের আলোর নিচে জমছে ঘন অন্ধকার। শেখ হাসিনা নিজের সাফল্যের আলো দিয়ে আর কতদিন এই অন্ধকার ঢাকা দিয়ে রাখতে পারবেন? আমরা শুধু তাকে হুশিয়ার করতে পারি। তিনি হুশিয়ার না হলে তো কারও কিছু করার নেই। তবু বলি, 'প্রদীপের নিচে অন্ধকার গাঢ় হইতেছে। সময় বহিয়া যাইতেছে।'
লন্ডন, ১৩ জানুয়ারি ২০১২, শুক্রবার
 

No comments

Powered by Blogger.