ঝুঁকিমুক্ত নয় দেশের হাসপাতাল ক্লিনিকও-অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগুন মোকাবেলার প্রস্তুতি নেই by বদরুদ্দোজা সুমন

দেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় অগি্নকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও প্রস্তুতি নেই। অধিকাংশ স্বাস্থ্য স্থাপনায় 'জরুরি নির্গমন পথ' বলে কিছু নেই। খোদ রাজধানী ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে অগি্ননির্বাপণ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। সরেজমিন কয়েকটি বড় হাসপাতাল পরিদর্শনকালে জানা গেছে, সেখানে গুটিকয়েক অগি্ননির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইসার) থাকলেও সেগুলো চালানোর প্রশিক্ষণ হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট


কারোরই নেই। সরকারি হাসপাতালগুলো ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের। অথচ অগি্ননির্বাপণসহ দুর্ঘটনা মোকাবেলার যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের হাতে। এটিকে প্রতিবন্ধকতা মনে করছেন স্বাস্থ্য বিভাগের
কর্মকর্তারা।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্গমন পথ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি। কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হাসপাতালগুলো ঝুঁকিতে আছে। আগুন লাগলে তা নেভাতে প্রাথমিক পদক্ষেপের ব্যবস্থা অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, আগুন লাগলে প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কলকাতার আমরি হাসপাতালের মতো অগি্নকাণ্ড দেশের কোনো হাসপাতালে ঘটলে তা শত শত মানুষের মৃত্যু ডেকে আনবে। ওই ঘটনার পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অগি্নকাণ্ডজনিত জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতির প্রসঙ্গটি সামনে চলে এসেছে। নড়েচড়ে বসেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। গতকাল রোববার অগি্ননির্বাপণ ব্যবস্থা দেখতে আকস্মিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক। আজ সোমবার বিকেল ৩টায় মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর সূত্র জানায়, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অগি্ননির্বাপণ সংক্রান্ত লজিস্টিক সাপোর্টগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সিফায়েত উল্লাহ সমকালকে বলেন, 'অগি্ননির্বাপক যন্ত্র চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষতা হাসপাতাল কর্মীদের নেই। হাসপাতালে অগি্নকাণ্ড ঘটলে মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং অধিদফতরের প্রধান হিসেবে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। তাহলে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে কেন থাকবে না? এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।'
এদিকে অগি্ননির্বাপণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঢালু সিঁড়ি, বিকল্প দরজা, প্রত্যেক তলার আয়তন অনুসারে পর্যাপ্তসংখ্যক ফায়ার এক্সটিংগুইসার, বিকল্প সিঁড়ি এবং সংলগ্ন ডায়াগনস্টিক ল্যাবে ব্যবহৃত কেমিক্যালে আগুন লাগলে তা নেভাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস রাখতে হয়। বৃহৎ হাসপাতালে ঢালু সিঁড়ি থাকলেও অন্যান্য ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম শাহীদুল্লাহ সমকালকে বলেন, 'আগুন লাগলে রোগীদের দ্রুত স্থানান্তরের মহড়া কোনো হাসপাতালে হচ্ছে না। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে হাসপাতালের জন্য পৃথক সতর্কতামূলক নির্দেশনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই সেটি মানা হয় না।' তিনি বলেন, আগুন লাগলে ডাক্তার ও নার্সদেরই প্রধান ভূমিকা নিতে হয়। এ জন্য তাদের ঢালু সিঁড়ি দিয়ে রোগী দ্রুত নামানোর প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৯ ডিসেম্বর কলকাতার আমরি হাসপাতালে ভয়াবহ অগি্নকাণ্ডে ৯০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এর মধ্যে একজন বাংলাদেশিও ছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক ঢাকা মেডিকেল পরিদর্শন শেষে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অগি্ননির্বাপণে দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। এখানে (ঢাকা মেডিকেল) বের হওয়ার অনেক রাস্তা থাকায় আপাতত বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই। ছোটখাটো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেখানে ওয়ার্ড রয়েছে ৪৬টি। গত জুনে মাত্র ১১টি ফায়ার এক্সটিংগুইসার সংগ্রহ করে বারান্দায় ঝোলানো হয়। বারান্দার মেঝেতে রাখা রোগীর স্বজনরা স্যালাইন ঝোলানো থেকে শুরু করে নানাভাবে ক্ষতি করায় একপর্যায়ে তা সরিয়ে রাখা হয়। বর্তমানে অধিকাংশ স্থানেই যন্ত্রটি নেই। অবশ্য কর্মকর্তারা বলছেন, এ হাসপাতালে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদুল হক মলি্লক সমকালকে বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে অগি্ননির্বাপক যন্ত্র ও কেবিন ব্লকে ৬টি যন্ত্র রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসালট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার শ্রীকান্ত রায় সমকালকে বলেন, সংলগ্ন হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ফায়ার এক্সটিংগুইসার রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার কর্মীরা সেগুলো চালাতে পারেন। তবে সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
বেশি ঝুঁকি বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিকে
বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অগি্নকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। অপরিসর ভবন, বের হওয়ার বিকল্প সিঁড়ি/পথ না থাকা, একটিমাত্র সদর গেট থাকা এবং অগি্ননির্বাপক যন্ত্র না রাখায় আগুনে ভয়াবহ পরিস্থিতির ঝুঁকি রয়েছে। রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের আশপাশে অর্ধশতাধিক ক্লিনিক রয়েছে, অধিকাংশই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ধানমণ্ডি, গ্রিনরোড, পান্থপথ এলাকায়ও রয়েছে ছোট-বড় অনেক ক্লিনিক। এসব প্রতিষ্ঠানে অগি্ননির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি খাতে পরিচালিত বড় করপোরেট হাসপাতালগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। সেগুলোর একটিতেও ঢালু সিঁড়ি নেই। অথচ ফায়ার সার্ভিস বলছে, এটি রোগীদের স্থানান্তরে খুব কার্যকর। এ ব্যাপারে ল্যাবএইড হাসপাতালের পরিচালক মেজর (অব.) ডা. মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, 'ঢালু সিঁড়ি না থাকলেও রোগী সরিয়ে নিতে বিকল্প ব্যবস্থা এবং প্রত্যেক ভবনে একটি করে জরুরি নির্গমন পথ রয়েছে। কলকাতার ঘটনার পর আমরা খুব সতর্ক রয়েছি।'
স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক কেএম সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কলকাতার ঘটনার পর কর্মীদের জন্য দু'দফা মহড়ার আয়োজন এবং যন্ত্রপাতিগুলো ফের চালু করে দেখা হয়েছে। হাসপাতালের প্রধান প্রকৌশলী ইউসুফ আলী প্রধান সমকালকে জানান, হাসপাতালে আগুন লাগলে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম এবং তাপমাত্রা ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে স্টিঙ্কলার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটাতে শুরু করবে। ৬৪টি ফায়ার হোস কেবিনেট এবং পর্যাপ্ত এক্সটিংগুইসারসহ সব ব্যবস্থাই রয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.