সমাপনীর মঞ্চ তৈরি by সঞ্জয় সাহা পিয়াল

গের রাতে পৃথিবীর ছায়া গিয়ে পড়েছিল চাঁদের গায়ে। কথা দিয়েছে, সাত বছর পর আবার গিয়ে চাঁদকে আড়াল করে দেবে পৃথিবী। কক্ষপথের পরিক্রমায় এটাই নিয়ম। চট্টগ্রাম টেস্টের কক্ষপথে বাংলাদেশিরা একটা নিয়মের পরিমণ্ডলে ঘুরপাক খাচ্ছেন। যেখানে প্রথম ইনিংসের মতোই দ্বিতীয় ইনিংসের ভুলগুলোর ছায়া পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের গায়ে। তামিম, নাফীস, আশরাফুলদের আগের মতোই গিলে খাচ্ছে বল বাছাইয়ের ত্রুটিগুলো।


আর তাই ৮০ রানের মধ্যে ৪ উইকেট পড়া দেখেও কেউ অবাক হননি। যেমনটি আহ্লাদিত হতে দেখা যায়নি দিন শেষে নাজিম আর সাকিবের ৪১ রান করে অপরাজিত থাকা নিয়ে। পাকিস্তানকে ৫ উইকেটে ৫৯৪ রানের ইনিংসের পিছু নিয়ে ইনিংস হার এড়াতে এখনও ৩২৫ রান দূরে দাঁড়িয়ে মুশফিকরা। ক্রিক ইনফোতে মজা করে লিখেছে, চট্টগ্রাম টেস্ট থেকে বাংলাদেশ আলোকবর্ষ দূরে। বাস্তবতা হলো, তারও দূরের অন্ধকারে ছিটকে গেছেন ঘরের ছেলেরা। প্রথম দিনই এই টেস্টের আশার ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়েছে, আজ শুধু হাতে থাকা নাটাইটি পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিতে হবে। সাগরিকার খোঁজ নেওয়ার শুধু একটাই কারণ থাকতে পারে, আশরাফুলদের দিয়ে যাওয়া বোঝা কতক্ষণ টানতে পারবেন বাকিরা। তিন দিন ধরে ফিল্ডিং করা বাংলাদেশিরা গতকালের খেলা শেষ হতেই ড্রেসিংরুমে গিয়ে বরফ জলে ঢুবে কুলডাউন হয়েছেন। এতে হয়তো শরীরটা জুড়াতে পারে, মাথাটা বোধহয় না। অন্তত দিনের দুটি অংশের ব্যাটিং দেখার পর এই ধারণাটার পক্ষে বেশকিছু যুক্তি দাঁড় করানো যায়। লাঞ্চের আগে-পরে ইউনিস খান আর আসাদ শফিক যেখানে দাপিয়ে ব্যাটিং করলেন। আসাদ তার অভিষেক টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পেলেন, আর ইউনিস তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরি করলেন। সেখানেই পনেরো মিনিটের বিরতি দিয়ে খেলতে নামা তামিম ইকবাল ১৫ রান করেই প্যাভিলিয়নে গিয়ে প্যাড খুলে ফেললেন। যেখানে ইউনিস ৪১২ মিনিট ব্যাটিং করলেন সেখানেই কি-না তামিম ৩৭ মিনিটের বেশি দাঁড়াতে পারলেন না। হাফিজের সোজা আসা বলটি টার্ন হবে ভেবে ছেড়ে দিয়ে ধোঁকা খেলেন। ইউনিসের সঙ্গে তামিমের তুলনাটা বাড়াবাড়ি হলেও ম্যাচ খেলার দিক দিয়ে আশরাফুলকে আনা যায়। প্রথম ইনিংসে ১ করা দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ মানুষটিই এদিন ০ রানে অনিশ্চিতের দিকে হাঁটতে লাগলেন। রেহমানের বলটি কিছুটা টার্ন করাতেই স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বসেন। ৪৩ বল ক্রিজে কাটানো নাফীসকেও মনে হয়েছিল আজ তিনি পারবেন; কিন্তু কে জানত, আগের বলটিই বাউন্ডারি হাঁকানোর পর আজমলকে সুইপ খেলতে যাবেন। ভারী ভারী নামগুলোর এই পরিণতি দেখে দলের তাজা রক্ত নাসিরকে পাঠিয়েছিলেন কোচ স্টুয়ার্ট ল; কিন্তু অফ সাইডের দিকে ফিল্ডাররা তাকে আটকে দেওয়ায় হাঁসফাঁস করে চিমাকে পুল করতে গিয়ে স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে বসলেন। যেখানে হারানোর কিছু নেই, সেখানে 'আক্রমণই রক্ষণের সেরা অস্ত্র'_ কোচ স্টুয়ার্ট ল-র বলা এই কথাটি শুনেই হয়তো ক্রিজে এসেছিলেন সাকিব। যিনি ৪৪ বলে ৪১ রান করেছেন পুল, হুক আর সুইপের মতো রিস্কি শট খেলে। তবে তার পাশে একজনকে এই ইনিংসেও বাকিদের থেকে অন্যরকম লেগেছে, তিনি নাজিমউদ্দিন। বাজে বলে কিছু কভার ড্রাইভ ছাড়া ১০৯ বল মোকাবেলা করে ৪১ রান করেছেন। একটু ধৈর্য, চাপা সাহস আর আত্মবিশ্বাসের জোরেই নাজিমউদ্দিন তার প্যাভিলিয়নে বসে থাকা তারকাদের দেখিয়ে দিয়েছেন, চট্টলার এই উইকেট ব্যাটিং করার জন্য। নাজিম কিংবা নাসিরদের বেশ দুর্ভাগা মনে হয়েছিল গতকাল। যখন অভিষেক সেঞ্চুরি পাওয়া আসাদ শফিক সাংবাদিকদের সামনে এসে বলেছিলেন। 'আমি ভাগ্যবান, ইউনিস ভাইয়ের মতো একজন বড় ভাই এদিন আমার পার্টনার ছিলেন। তার কাছ থেকেই শুনেছি, কোন বল মারতে হবে, কোনটি ছাড়তে হবে।' শফিকের মতো এই বড় ভাইয়েরই অভাব নাজিমদের। পরামর্শ আর সাহস নেওয়ার মতো ভাই তার দলে নেই। যাদের দিকেই তাকাতে যান, তাকেই দেখেন মাথা নিচু করে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটছেন।

No comments

Powered by Blogger.