সরকারি কারখানায় ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত মজুরি বৃদ্ধির সুপারিশ-শ্রমিকের ন্যূনতম মূল মজুরি ৪২৫০ টাকা by আবুল কাশেম

রকারি কলকারখানার শ্রমিকদের মজুরি ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন। প্রস্তাবিত মজুরি কাঠামোতে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মূল মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২৫০ টাকা। তবে মূল মজুরির ৫৫ শতাংশ বাড়িভাড়া, ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও একজন সন্তানের ক্ষেত্রে ২০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দুজন সন্তানের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা ভাতা ছাড়াও আরো কিছু ভাতার সুপারিশ করেছে কমিশন।


এতে সব মিলিয়ে সরকারি শিল্প-কারখানায় কর্মরত সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন শ্রমিক মাস শেষে নূ্যনতম আট হাজার টাকা পাবেন। এটি কার্যকর হলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সংস্থা_বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল শিল্প করপোরেশন এবং বাংলাদেশ বন শিল্প করপোরেশনের প্রায় ৮৫ হাজার শ্রমিকের মজুরি বাড়বে।
জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. মাহি আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, '১৬টি গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে প্রায় ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত মজুরি বাড়ানোর সুপারিশ করেছি আমরা।' তিনি জানান, ২০০৫ সালের পর সরকারি কারখানার শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। কিন্তু এই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৩৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
কমিশনের দায়িত্ব ছিল উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর সুপারিশ করা। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনগুলোর মধ্যে কেবল বন শিল্প আর্থিকভাবে লাভজনক। আর বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল শিল্পের আর্থিক অবস্থা ভালো। অন্য সব প্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে। অর্থাৎ, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। তা সত্ত্বেও তাদের স্বাভাবিক জীবনমান নিশ্চিত করার জন্য '২০১০ সালের মজুরি কমিশন' নতুন কাঠামোর সুপারিশ করেছে। মাহি আলম বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবায়ন হলে শ্রমিকরা বেশ ভালো থাকতে পারবেন। ২০০৫ সালের মজুরি কাঠামোতে শ্রমিকদের নূ্যনতম মজুরি কার্যকর করা হয় ২৪৫০ টাকা। আর সর্বোচ্চ গ্রেডের শ্রমিকের মজুরি ধরা হয় ৩২০০ টাকা। ২০১০ সালের মজুরি কমিশনের প্রস্তাবে নূ্যনতম মজুরি বাড়িয়ে ৪২৫০ টাকা ও সর্বোচ্চ গ্রেডের শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়ে ৫৭৫০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া আগের কাঠামোতে প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য মাসে ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখন তা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করার সুপারিশ করেছে কমিশন। এ ছাড়া ২০০৫ সালে বাস্তবায়ন হওয়া মজুরি কাঠামোতে শ্রমিকের সন্তানদের জন্য কোনো ধরনের শিক্ষাসহায়ক ভাতা ছিল না। নতুন কমিশন একজন শ্রমিক পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ (দুই সন্তানের ক্ষেত্রে) মাসে ৩০০ টাকা ও এক সন্তানের ক্ষেত্রে মাসে ২০০ টাকা শিক্ষাসহায়ক ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। আর বিদ্যমান ২০০৫ সালের মজুরি কাঠামোতে শ্রমিকদের বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হতো মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। এখন তা বাড়িয়ে ৫৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
মাহি আলম জানান, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে গঠিত জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন গত ৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে। গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছেও প্রতিবেদন দিয়েছে তারা। তিনি জানান, করপোরেশনগুলোর আয়-ব্যয় ও আর্থিক সংগতি বিবেচনার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান ও বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের কথা বিবেচনা করেই কমিশন সরকারকে সুপারিশ করেছে।
মাহি আলম জানান, এর বাইরেও শ্রমিকরা ধোলাই ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা যাতে পায়, সে ব্যাপারে সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছে। সব সুপারিশ মেনে নেওয়া হলে একজন শ্রমিক মাস শেষে নূ্যনতম আট হাজার টাকা পাবে।
অর্থমন্ত্রী আবদুল মুহিত গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৫ সালের পর মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। আর এই সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বেসরকারি খাতগুলোর শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। তিনি বলেন, ওই সব শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর চিন্তা থেকেই সরকার এই কমিশন গঠন করেছিল। কমিশন প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মজুরি বাড়ানোর সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এখন শ্রম মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদে পাঠাবে। সেখানে সম্মতির পরই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

No comments

Powered by Blogger.