বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন : বিক্ষোভকারীদের পাশে এবার ইউরোপীয় রাজনীতিবিদরা

বৈশ্বিক পুঁজির (অর্থনীতি) বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈষম্য ও বড় বড় কোম্পানিকেন্দ্রিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে তরুণরা যেভাবে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, তার পেছনে ইউরোপীয় অনেক রাজনীতিবিদ সমর্থন দিচ্ছেন। আমেরিকার পুঁজিবাজারের কেন্দ্র ‘ওয়ালস্ট্রিট’কে প্রতীকী দখলের ঘোষণা দিয়ে ‘ওয়ালস্ট্রিট চলো’ স্লোগানে শুরু হওয়া আন্দোলনে তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন ওইসব রাজনীতিবিদ।ইউরোপে এই বৈষম্যবিরোধী ও পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। গত কয়েকদিনে লিসবন, বার্লিন, রোমসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ওইসব আন্দোলনকারী বিক্ষোভ করেছে। লিসবনের রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে ২০ হাজারের মতো মানুষ।


বার্লিনে করেছে ১০ হাজারের কাছাকাছি। এছাড়া লন্ডন ও রোমের সিটি সেন্টারের সামনেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্টে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের সামনে পাঁচ হাজারের মতো মানুষ সমাবেশ করেছে। এদিকে এবার নিউইয়র্ক পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করল ‘ওয়ালস্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারীদের গ্রেফতারের সময় কিছু পুলিশ কর্মকর্তার অতিরিক্ত জবরদস্তির প্রতিবাদে তারা এই বিক্ষোভ করে।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কের ম্যানহাটন এলাকার আইন কর্মকর্তার অফিসের সামনে প্রায় ১শ’ বিক্ষোভকারী পুলিশের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভরত আন্দোলনকারী জ্যাকচ্ ওয়েলচ্ বলেন, গ্রেফতার করার সময় পুলিশ আমাকে লাথি মারে, ভ্যানের ভেতর নিয়ে আমার হাতে আঘাত করে, পরে আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারে বাধা দেয়ার অভিযোগ আনে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ালস্ট্রিট চলো’ (অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট) আন্দোলনে সংহতি প্রকাশে শনি থেকে মঙ্গলবার বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ব্যাংকবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। কর্পোরেট ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই দুনিয়ার অধিকাংশ সম্পদ ভোগ করছে কতিপয় লোক—এই অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের।
পুঁজিবাদের বৈষম্যবিরোধী বা ব্যাংকবিরোধী যাই বলা হোক না কেন, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে যে আন্দোলন দানা বাঁধছে তা উপেক্ষা করা খুবই কঠিন বর্তমান ব্যবস্থা পরিচালনাকারী রাজনীতিবিদদের জন্য। বেশকিছু রাজনীতিবিদ এই কঠিন হবার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং বিক্ষোভকারীদের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। জার্মান সরকারপ্রধান অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেট ধরনে রক্ষণশীল। দলটির অন্যতম রাজনীতিবিদ ও মার্কেল সরকারের অর্থমন্ত্রী উল্ফগাং রোববার টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেছেন, তিনি ওইসব বিক্ষোভকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা আনা খুবই জরুরি।
পুঁজিবাজারে দুর্নীতিবিরোধী এই বিক্ষোভের শুরুর দিকে মধ্যবামপন্থী সামাজিক গণতন্ত্রী দল স্যোশাল ডেমোক্র্যাট-এর নেতা সিগমার গ্যাবরিয়েল স্পিগেল ম্যাগাজিন-কে বলেন, সত্যিকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকগুলোকে আমাদের জোর তাগাদা দিতে হবে। এ ধরনের যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারলে কমার্শিয়াল ব্যাংকিং ধারা বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাত্ বিনিয়োগ নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় জড়ো না হয়ে ভাগ হয়ে যাবে। ফলে মধ্যমমানের ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হবে না। জার্মানির সাবেক অর্থমন্ত্রী রেইনার বুরুডারলি প্রখ্যাত ট্যাবলয়েড পত্রিকা বিল্ডকে বলেন, প্রত্যেকটি দেশের ব্যাংকগুলোরই দরকার নিজেদের সংস্কারের জন্য নিজেদের উদ্যোগ নেয়া। তারা নিজেরা কোনো ব্যবস্থা না নিলে পরে রাষ্ট্রের তরফ থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এদিকে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের ভবিষ্যত্ প্রধান ব্যক্তি মারিও ড্রাগহি বলেছেন, তরুণদের এ ধরনের আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ বিবিসি টেলিভিশনকে বলেছেন, এটা সত্য যে, ব্যাংকিং পদ্ধতির মধ্যে যথেষ্ট অন্যায় রয়ে গেছে।
ফরাসি দৈনিক পত্রিকা লি প্যারিসিয়েন’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জোস ম্যানুয়েল ব্যারোসো অসাধু ব্যাংকারদের যথাযথ শাস্তি দাবি করেন।

No comments

Powered by Blogger.