নিজামী মুজাহিদ সাঈদী স্বাধীনতাবিরোধী নন-রোডমার্চ শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জে জনসভায় খালেদা জিয়া by হাসান শিপলু ও আমিনুল ইসলাম,

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, সরকার স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী ও সাকা চৌধুরীকে আটক করেছে। তারা স্বাধীনতাবিরোধী নন। যারা দেশবিরোধী বিভিন্ন চুক্তি করছে তারাই স্বাধীনতাবিরোধী। অবিলম্বে নেতাদের মুক্তি দিতে হবে। ইসলামী ঐক্যজোট নেতার গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার পাঁচ মাস ধরে তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে। তাকে গ্রেফতার করা হলে এর পরিণতি শুভ হবে না।
্িবএনপি চেয়ারপারসন বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সময়মতো নির্বাচন দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না।


বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে বিদায় দিয়ে নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, একতরফাভাবে নিজেদের লোক দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। খালেদা জিয়া হুশিয়ার উচ্চারণ করে বলেন, রোডমার্চ শেষে আরও বৃহৎ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে সরকারকে গদিচ্যুত করে দেশকে রক্ষা করা হবে। ঢাকা থেকে রোডমার্চ করে মফস্বলে এসেছি। প্রয়োজনে মফস্বল থেকে ঢাকায় গিয়ে গণজমায়েত করতে হবে। শেয়ারবাজার সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজার সম্পর্কে ধারণা না থাকলে পদে বসে আছেন কেন? তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির টাকা সরকার খেয়ে ফেলেছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তির পকেটেও গেছে।
গতকাল বুধবার উত্তরবঙ্গ অভিমুখে বিএনপির রোডমার্চের সমাপনী দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরকারি কলেজ মাঠে চার দল জনসভার আয়োজন করে। এর আগে নওগাঁর এটিম হাইস্কুল মাঠে একমাত্র পথসভা হয়। জনসভার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে সার্কিট হাউসে বিশ্রাম শেষে রাতেই ঢাকায় ফেরেন তিনি। ২৭ অক্টোবর ময়মনসিংহে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
বগুড়া সার্কিট হাউসে রাতযাপন শেষে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখে রোডমার্চ শুরু হয়। দুপুর ১টায় নওগাঁ এটিম হাইস্কুল মাঠে একমাত্র পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি। সেখান থেকে যাত্রা
করে পড়ন্ত বিকেলে চাঁপাই কলেজ মাঠে আসেন।
খালেদা জিয়া যখন জনসভাস্থলে এসে পেঁৗছান তখন আশপাশের এলাকা লোকে লোকারণ্য। দুপুরের আগে থেকেই আশপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী আসেন কলেজ মাঠে। খালেদা জিয়া ৪০ মিনিট বক্তব্য দেন।
বগুড়া থেকে বের হওয়ার পরই রাস্তার দু'ধারে হাজার হাজার নেতাকর্মী তাকে শুভেচ্ছা জানান। পথে পথে জামায়াতকেও শোডাউন করতে দেখা গেছে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানান। নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে দ্বিতীয় রোডমার্চও। তবে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, সিলেট রোডমার্চে জনতার ঢল থেকে ঈর্ষান্বিত হয়ে সরকার উত্তরবঙ্গের পথে পথে বাধা দিয়েছে। কর্মসূচিতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) একটি টিম তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিল।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি অগ্রবর্তী দল প্রতিটি পথসভাস্থলে আগে গিয়ে সেখানকার প্রস্তুতি দেখভাল করেন। এ দলে রয়েছেন যুগ্ম মহাসচিব যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল প্রমুখ।
ট্রানজিটের নামে ভারতকে স্থায়ীভাবে করিডোর দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, আগে বলা হয়েছিল ট্রানজিট পরীক্ষামূলকভাবে দেওয়া হয়েছে। জনগণ ট্রানজিটের নামে করিডোর বাস্তবায়ন হতে দেবে না। সরকার বলেছিল, ট্রানজিট দিলে দেশ সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে। এখন দেশ দেউলিয়া হয়ে গেছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যদি অন্য দেশ নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব থাকল কোথায়? পাকিস্তানের শৃঙ্খল থেকে দেশ স্বাধীন করেছি ভারতের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নয়।
তিনি বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সঠিত তদন্ত হয়নি। প্রকৃত খুনিদের অনেককে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ সরকারের ছত্রছায়ায় রয়েছে। বিডিআরের পোশাক ও নাম পরিবর্তন করা হলেও সীমান্ত আজ অরক্ষিত। খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য আদালতের দোহাই দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করেছে। তিনি বলেন, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল আওয়ামী লীগের দাবি। ১৯৯৬ সালে তারা এ দাবিতে জ্বালাও-পোড়াও ও মানুষ হত্যা করেছে। জনগণ, সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী সবার দাবি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। আমিও বলছি, নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। সব রাজনৈতিক দল এমনকি আওয়ামী লীগও সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী বুধবার এক জনসভায় বলেছেন, বিএনপি আমলের দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতুর অর্থ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, পদ্মা সেতু তৈরির আগেই যোগাযোগমন্ত্রী সব টাকা পকেটে নিয়েছেন। যে কারণে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও জাইকা অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে। যোগাযোগমন্ত্রী এখন বলছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে? এই মন্ত্রী বাহাদুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেই বা কী করে। যিনি ব্যবস্থা নেবেন টাকার ভাগ তার পকেটেও যায়। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি শেয়ারবাজার ঠিকমতো বোঝেন না। যিনি শেয়ারবাজার সম্পর্কে বোঝেন না কেন তিনি ওই পদে বসে আছেন।
জেলা সভাপতি শাহজাহান মিয়ার সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব আবদুল লতিফ নেজামী, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মজিবুর রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, জমিরউদ্দিন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, ড. মঈন খান, সংসদ সদস্য বরকতুল্লা বুলু, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশীদ, সাংসদ শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক আশিফা আশরাফি পাপিয়া প্রমুখ।
জোট ও দলীয় নেতাদের বক্তব্য :মাওলানা ইসহাক বলেন, ইসলাম ও গণবিরোধী সরকারকে হটিয়ে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে হবে।
মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, সরকার জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ইসলামী ঐক্যজোটের আমির মুফতি ফজলুল হক আমিনীকে বন্দি করে দেশ থেকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তিকে নিঃশেষ করতে চায়।
মির্জা ফখরুল বলেন, এ সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তারা দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সংবিধান তছনছ করেছে। দেশের রাস্তা বিদেশিদের দিয়ে দিচ্ছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দুর্বার গনআন্দোলন গড়ে তুলে জুলুমবাজ এ সরকারকে বিদায় করতে হবে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে সাপের মতো মানুষ হত্যা করেছে, তারাই মানবতাকে নিষ্পেশিত করেছে। লাশের ওপর নর্তন কুর্দন করেছে।
নওগাঁর পথসভা : বুধবার রোডমার্চের দ্বিতীয় দিনে দুপুরে নওগাঁর এ টিম খেলার মাঠের পথসভায় খালেদা জিয়া আমিনীর মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। জেলা সভাপতি শামসুজ্জোহা খানের সভাপতিত্বে এ পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি-মন্দির ক্ষমতাসীনরা দখল করছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, 'আওয়ামী লীগ মনে করে হিন্দুরা তাদের সম্পদ। তারা যেভাবে ইচ্ছা তাদের ব্যবহার করছে। শ্মশানঘাট ও মন্দিরের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। মন্দিরের প্রতিমার স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে নিচ্ছে। হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ মা-ভাইবোনদের বলব, আপনারা একবার বিএনপিকে ভোট দিন। আপনাদের বিএনপি সম্মান ও নিরাপত্তা দেবে। একবারের জন্য বিএনপিকে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ছেড়ে দিন।'
খালেদার গাড়ির চাকার নিচে পড়ে মিনু আহত : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, খালেদা জিয়ার গাড়ির চাপায় আহত হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও রাজশাহী মহানগর কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু। বুধবার বিকেলে বিএনপির রোডমার্চ রাজশাহী মহানগরীতে প্রবেশের সময় নওদাপাড়া আমচত্বর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে মিনুর ডান পায়ের একটি আঙুলের হাড় ফেটে যায়। আহত মিনুর চাঁপাইনবাবগঞ্জের জনসভায় যোগ দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যান তিনি।
এদিকে ফেরার পথে নাটোর শহরে এক পথসভায় বক্তব্য রাখেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সাবেক উপমন্ত্রী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। খালেদার গাড়িবহর রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে নাটোর শহরে প্রবেশ করে। ছেড়ে যায় ১০টা ৪৫ মিনিটে।
রোডমার্চে হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় মানববন্ধন : সমকাল প্রতিবেদক জানান, রোডমার্চের গাড়িবহরে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দল ঢাকা মহানগর শাখা। নগর শাখার সভাপতি হুমায়ুন কবির ব্যাপারীর সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি মেজর (অব.) এম এম মেহবুবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন বক্তৃতা করেন।
 

No comments

Powered by Blogger.