জানতে ইচ্ছা করে by সাহস রতন

বছর ঘুরে আবারও ১৬ই ডিসেম্বর। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক কষ্টে অর্জিত সবচেয়ে স্মরণীয় একটি দিন।
পাঁচ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর যুদ্ধাপরাধ/মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবারের ডিসেম্বরে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিবছর ডিসেম্বর এলেই আমরা নড়েচড়ে বসি। চারিদিকে সভা-সেমিনারের ব্যাপক আয়োজন। ডিসেম্বর এলেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে অতি মাত্রায় দেশপ্রেমিক ভাব চলে আসে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, চেতনা- এই শব্দগুলো ব্যাপক হারে ফুটতে থাকে। আর অবধারিতভাবে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের বিচারের বিষয়টি নিয়েও অনেক কথা, অনেক বক্তৃতা শুনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলছে। একাধিকজনের রায়ও হয়েছে। কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ও কার্যকর হয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলাম রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হয়েছে। দেরিতে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি নিয়ে জনমত তৈরি হয়েছে। আমার জানতে বড় ইচ্ছা করে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে বর্তমানে যারা এত সোচ্চার বিগত ৪০টি বছর কিভাবে তারা এতটা নিষপ্রভ থাকলেন? এটা অবশ্য আমার মতো ‘ম্যাঙ্গো পিপল’-এর আমজনতার তা জানার কথা না। আসলে যত ভোগান্তি ওই ‘ম্যাঙ্গো পিপল’-এর কপালে ‘আম’ না হয়ে ‘জাম পাবলিক’ হয়ে যেতে পারলে ভাল হতো। কোনভাবে একটা কমিটিতে ঢুকে যেতে পারলেই হলো। ব্যস্‌, আপনার জীবনের যাবতীয় অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি। গ্রামের বাড়ি গিয়ে একবার এক ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা অনেকদিন পর। কুশলাদি বিনিময়ের পর কি করছে জানতে চাইলে ছোট ভাইটি বললো- ‘ভাই, আমি এইবার থানা কমিটিতে ঢুকছি।’ উত্তর শুনে আমি তো থ’। ওর চেহারা-ছবি দেখে ছোট ভাইটির মতো আমারও বুঝতে বাকি রইল না, থানা কমিটিতে যেহেতু সে ঢুকতে পেরেছে, তার আর কোন চিন্তা নাই। কিছু না হোক, দল ক্ষমতায় থাকাকালে অন্তত একটা মোটরসাইকেল আর নানা ধরনের ঠিকাদারি, চাঁদাবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে স্বাস্থ্যবান একটা ব্যাংক ব্যালেন্স তার হয়ে যাবে। হায় আল্লাহ, আমরা সবাই কেন থানা কমিটিতে ঢুকতে পারলাম না! আমরা যারা দিন রাতে কত কি আলোচনা করি! তারপর দিনশেষে আলোচনার ‘আলো’টি উড়ে গিয়ে কেবল ‘চনা’টি অবশিষ্ট থাকে। আর তাই আমাদের প্রায় সব আলোচনাই শেষমেষ কোন আশার ‘আলো’ উৎপন্ন করতে পারে না। কেন এমন হয়? বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কত ধরপাকড়, কত জেল, কত কিছু ঘটে গেল তাদের দু’টি বছরে। কিন্তু পরিবর্তন তো কিছুই হলো না। বহুবার প্রদর্শিত নাটকের এরকম দৃশ্য অতীতে অনেকবার জনগণ দেখেছে। ফলে বাংলা সিনেমার মতো পরের দৃশ্যে কি ঘটবে তা আগেই বলে দিতে পারেন তারা। তাহলে কেন এত নাটক? তবে একথা আমাদের দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, ‘অবশেষে সাধারণ মানুষের ভালটা আর হয়ে ওঠে না।’ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উর্ধ্বগতি থেকে শুরু করে আইনের প্রয়োগ পর্যন্ত যাবতীয় কিছুর দায় শেষমেষ সাধারণ জনগণকেই পোহাতে হয়। কোন কারণে একবার যদি পাঁকে পড়ে তবে সাধারণ হলে জিন্দেগিতে আর বেরিয়ে আসতে হবে না। এজন্যই নিজেকে আম থেকে জাম পাবলিকে বদলে ফেলতে হবে। প্রায়ই আমাদের নেতা-নেত্রী, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজকে বলতে শুনি, বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সচেতন, তারা কখনও ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না, তারা অনেক প্রতিবাদী ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমার মনে সন্দেহ, এসব বলে বলেই সাধারণ মানুষকে তারা বোকা বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। না হলে এদেশের মানুষ যদি সত্যিই সচেতন আর প্রতিবাদী হতো তা হলে চোখের সামনে বিগত তিন-চার দশক ধরে লুটপাট করে যারা কলাগাছ কিংবা তালগাছ হয়েছে তারা বছরের পর বছর দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে কিভাবে? ব্যাংক লুট করে, শেয়ার বাজার হাইজ্যাক করে, ছলছুতোয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে, ঘুষ-দুর্নীতি করে শ’ কোটি টাকা হাতিয়েও তো এরা বেশ আছে। লুটেরা শ্রেণীটি যে এলাকায় বসবাস করে সেখানে কেউ তো ওদেরকে কোন প্রশ্নের মুখোমুখি করে নি আদৌ, আজ পর্যন্ত। কিভাবে বুঝবো জনগণ সচেতন? পাঁচ বছরে একবার জাগ্রত হয়ে আবার পাঁচ বছরের জন্য শীতনিদ্রায় চলে যাওয়া কোন সচেতন মানুষের লক্ষণ নয়। আমাদের দেশে বিগত বছরগুলোয় আওয়ামী সরকার, বিএনপি সরকার, জাতীয় পার্টি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় নাজিল হয়েছে কিন্তু জনগণের সরকার এখনও দেখি নি। জনগণের আশা আকাঙক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে কেবল জনগণের মঙ্গল চিন্তায় কাজ করবে তেমন এক জনগণের সরকার আমরা ‘ম্যাঙ্গো পিপল’ই নির্বাচিত করবো, এবারের ডিসেম্বরে এই হোক বাংলার মানুষের অঙ্গীকার।

nazmulsahos@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.