ভিক্ষুক পুনর্বাসনের পাইলট কর্মসূচি ব্যর্থ, মনোযোগ ঢাকার দিকে by ইসমাইল হোসেন


ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ও ভিক্ষাবৃত্তির অপবাদ থেকে মুক্তির জন্য সরকার ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করলেও কার‌্যত তা ব্যর্থ হয়েছে।

সরকার গৃহীত পাইলট প্রকল্প হিসেবে একটি কর্মসূচিতে দেখা গেছে, অভ্যাসগত কারণেই তারা আবার ফিরে এসেছেন ভিক্ষাবৃত্তিতে। এ অবস্থায় সরকার ঢাকাকে পর্যায়ক্রমে ভিক্ষুকমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীর সাত স্থানকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘ভিক্ষুকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ঢাকা শহরের দুই হাজার ভিক্ষুকের পুনর্বাসন এবং পর‌্যায়ক্রমে ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনের লক্ষ্যে ঢাকা শহরের সকল ভিক্ষুককে জরিপের আওতায় আনা হয়।

কর্মসূচির বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১০টি এনজিও’র মাধ্যমে ঢাকা শহরকে ১০টি জোনে ভাগ করে ১০ হাজার ভিক্ষুকের ওপর জরিপ পরিচালনা করে তাদের ডাটাবেজ তৈরি করা হয়।

সূত্র আরও জানায়, কর্মসূচির পাইলটিং পর‌্যায়ে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনার জন্য ভিক্ষুকের সংখ্যা বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল ও জামালপুর জেলাকে নির্বাচন করে প্রতি জেলা থেকে পাঁচশ’ জন করে মোট দুই হাজার জনকে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

ঢাকা জেলার পাইলটিং পর‌্যায়ে পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনা করা হলে সারা দেশের ভিক্ষুক ঢাকামুখী হবে- এই বিবেচনায় পরবর্তীতে ঢাকা জেলার কোটা ময়মনসিংহ জেলার অনুকূলে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

গত বছরের ২০ নভেম্বর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে ময়মনসিংহের ৩৭ জন ভিক্ষুকের মধ্যে ১২ জনকে ১২টি রিক্সা, ১৭ জনকে ১৭টি ভ্যান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য পাঁচ হাজার করে টাকা এবং বাকী ৮ জনের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার করে টাকা হস্তান্তর করে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।

সে সময় সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা অফিসারদের উপকারভোগীর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড তদারকি এবং এ বিষয়ে পাক্ষিক প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

২১ জানুয়ারি ময়মনসিংহ জেলা সমাজসেবা উপ-পরিচালক প্রদেয় প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৭ জনের মধ্যে মাত্র ১০ জন প্রাপ্ত উপকরণের সহায়তায় জীবিকা অর্জন ও নিজ জেলায় অবস্থান করছে। অবশিষ্টদের কেউ কেউ উপকরণ ভাড়া দিয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছে। এদের কয়েকজনকে নিজ ঠিকানায়ও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

ময়মনসিংহে এ প্রকল্পের ব্যর্থতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সরকার। এজন্য ঢাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। গত ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করার লক্ষ্যে সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা’য় সাত স্থানকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হয়।

বিদেশিদের অভ্যাগতদের চলাচলরত এলাকা যেমন- বিমানবন্দর, কূটনৈতিক জোন ও দূতাবাস এলাকা, হোটেল সোনারগাঁও, হোটেল রূপসী বাংলা, হোটেল রেডিসন ও বেইলি রোড এলাকা এর আওতাভূক্ত থাকবে। সভায় ঢাকায় শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব রনজিত কুমার বিশ্বাস, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাসিমা বেগম, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিত কর্মকর্তাবৃন্দ পাইলট প্রকল্পের ব্যর্থতা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাসিমা বেগম বাংলানিউজকে বলেন, “ময়মনসিংহের পাইলট প্রকল্পে অনেক উপকারভোগী ঢাক চলে এসেছেন। এজন্য পর‌্যায়ক্রমে ঢাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করা গেলে ভিক্ষাবৃত্তির হাত থেকে মুক্ত হতে পারব”।

নাসিমা বেগম বলেন, “ভিক্ষুকমুক্ত স্থানে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত অক্ষমদের সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা পুনরুজ্জীবন, প্রয়োজনীয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ এবং একাজে নিয়োজিত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টদের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়”।

তিনি বলেন, “ভিক্ষাবৃত্তির গ্লানি থেকে মুক্ত করতে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সেক্ষেত্রে ভিক্ষুকমুক্ত করার অভিযানের সচিত্র প্রতিবেদন সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচার করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে”।

No comments

Powered by Blogger.