বিশ-বিশ, বিষে বিষ ক্ষয় by জালাল আহমেদ চৌধুরী

শ্রীলঙ্কায় ক্রিকেটের মহোৎসব চলছে। খেলাটির চরম উত্তেজনা-সঞ্চারি বিনোদনের পসরা নিয়ে দিনমান সেখানে বহমান। ক্রিকেট বিশ্বের দৃষ্টি এ মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত মুরালি, মাহেলা, সাঙ্গাকারার মাঠসমূহে। প্রকৃত অর্থে চরম অনিশ্চয়তার প্রভাব বলয়ে কোমর কষে আমরাও নিউজিল্যান্ড,


পাকিস্তানের প্রাথমিক দেয়াল টপকানোর জন্য বঙ্গভূমিতে অধিষ্ঠান নিয়েছি। সামর্থ্য আছে বলেই নিয়তির আশীর্বাদ প্রত্যাশা করছি। টি-টোয়েন্টি বলে অনেক দূর যাওয়ার আশা সবার। আমাদেরও তা-ই। এই যে সর্বদলীয় প্রত্যাশার মাত্রা উঁচুলয়ে বাঁধা, তার কারণ ক্রিকেটের ওই আপাতত সংক্ষিপ্ত রূপ।
ক্রিকেটের এই চটকদার সংস্করণটিকে ঘিরে ‘যেকোনো কিছু হতে পারে’ কথাটা এত বেশি লাগসই হয়ে উঠেছে যে ফলাফলের হিসাব-নিকাশ নিয়ে পূর্বাহ্নে মাথা ঘামানোর চেয়ে প্রতিদিনের প্রতি খেলার বিনোদ মাধুর্য নিয়েই ক্রিকেটামোদী মাত্রেই বেশি উদ্গ্রীব। এ প্রতিযোগিতার প্রতি খেলা নয়, প্রতি বলই চমক লাগানোর দৃশ্যপট নির্মাণের প্রেক্ষাপট নিয়ে উপস্থিত দর্শকের সামনে। মাত্রাতিরিক্ত উপভোগের নিমিত্ত এ খেলার চলমান প্রতি পল। সময় কম তাই আনন্দও জমাট বাঁধা ঘন। ব্যাটে-বলে কৌশল প্রয়োগের পরিকল্পনায়, প্রতিপরিকল্পনায় পেশাদারি দক্ষতার নিপুণ প্রদর্শনের লড়াই। এ লড়াইয়ের মান বাড়ছে দিন দিন। প্রতি আসরে কলাকৌশলের বিচিত্রতার বিস্তৃতি। শুধুই কি খেলা? অনুষ্ঠানের আয়োজনে নানা অনুষঙ্গে দর্শক টানা আনন্দ উপকরণের সম্মোহনী ডুগডুগি। সব মিলিয়ে এক আনন্দমেলার মহা আবহ। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটের মতো দীর্ঘসূত্রী আনন্দের বা উপভোগের রেশ রেখে যায় না বটে কিন্তু তাৎক্ষণিক যে পুলক ছড়ায়, তাও একেবারে উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। ক্ষণকালের ছন্দটার আবেদনটাও চিত্তগ্রাহী এবং প্রমাণিতভাবে আগ্রাসী। আগ্রাসী দর্শকের চিত্ত দখলে, আগ্রাসী পৃষ্ঠপোষক টানায়, আগ্রাসী একাধারে শ্রম এবং অর্থ বিনিয়োগকারীর সামনে সপ্রমাণ বাণিজ্যিক লাভের ছবি তুলে ধরতে। ফলে প্রতি পর্বেই বাড়ছে টি-টোয়েন্টির সার্বিক জৌলুস। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ক্রিকেটারদের ওপর চাহিদার দাবি। ২০ ওভারে শুরুতে দেড় শ রানের ধারে-কাছে দর্শক-সমর্থকেরা ঘুরে-ফিরে তৃপ্ত থাকত, এখন সেটা দুই শ পেরিয়ে যাওয়ার দিকে ক্রমেই ধাবমান। সে প্রত্যাশার সঙ্গে তাল রাখায় ব্যস্ত উইকেট, আউটফিল্ডের রানবান্ধব হয়ে ওঠার দ্রুতলয় প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য অনুষঙ্গ। খেলোয়াড়দের প্রস্তুতিপর্বে ঘাম ঝরাতে হচ্ছে বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলায় আরও সাবলীল, আরও ধারালো হওয়ার প্রচেষ্টায় হতে হচ্ছে আরও বেশি আন্তরিক।
অন্যদিকে মরিয়া ব্যাটধারীকে বশে রাখতে বোলারকে দুর্দমনীয় হয়ে ওঠার সাধনায়, উদ্ভাবনের সাধনায় নিবিষ্ট হতে হচ্ছে আরও বেশি। ফিল্ডারকে হতে হচ্ছে ক্ষিপ্রতর, শাণিত লক্ষ্যভেদী। মানসিক দৃঢ়তা, স্নায়ুশক্তির মাত্রা বাড়াতে হচ্ছে। আজ ওয়ান-ডে, কাল টেস্ট, পরশু টি-টোয়েন্টির মেজাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে মগজের ওপর, পেশির ওপর, স্নায়ুর ওপর ধকল বাড়ছে। সে ধকল সামলে সাবলীল হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা সহজতর করার দায় বাড়ছে প্রশিক্ষকের, টিম প্রশাসনের এবং ব্যক্তি খেলোয়াড়ের নিজের। তাঁরা সে দায় সামলে খেলাটিকে আরও বর্ণিল, আরও আকর্ষণীয় করে তুলছেন। বাড়াচ্ছেন ক্রিকেটের আবেদন।
ধকল যাচ্ছে আম্পায়ার, স্কোরারদের ওপরও। প্রতি পর্বে পরিবর্তিত আইনের ধারা-উপধারা প্রয়োগ। হিসাব-কিতাবের রকমফের, ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তির খবরদারি—সব সামলে কাজ করতে হচ্ছে। তাল সামলাতে, সময়ের দাবি মেটাতে, নিত্য-নতুনের সঙ্গে সংগতি রাখতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে আয়োজক সংগঠকদের। আমাদের বিপিএলটা কত চড়াই-উতরাই সৃষ্টি করে ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ আদলে শেষ হলো। তবু নবতর আনন্দ নির্মাণে তো ভালোই সফল।
আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে টি-টোয়েন্টিকে দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। তিন দশক ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রিকেটারদের মাঠে স্লেজিং নামক স্কিলের আওতায় বাচাল হয়ে উঠতে দেখা গেছে। এই শিল্পের এক অগ্রপথিক ইয়ান চ্যাপেল তাঁর উত্তরসূরিদের একবার বলেছিলেন, ‘মাঠে জিব দিয়ে যে চেক লিখো, সেটা তোমার ব্যাট বা বল যদি ক্যাশ করতে না পারে, তবে সে চেক লিখে কাজ নেই।’ এই চেক লেখা এবং ক্যাশ করার দায়টা ক্রিকেটারদের ওপর টি-টোয়েন্টি যেন একটু বেশিই চাপিয়েছে। আর সেই দায় মুক্তির সাধনায় দর্শকের দেখনসুখের আনন্দ বেড়েছে। সে দর্শনানন্দে বুঁদ দর্শক ক্রিকেটে এতই মগ্ন থাকে যে নৃত্যপর চিয়ারগার্লদের মাঠে একটা বাড়তি উপকরণ মনে হয়। মাঝ মাঠের অন্তর্বৃত্ত থেকে হ্রস্ব বমন নর্তকিদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। সনাতনী ক্রিকেটীয় মূল্যবোধ ধুমধাড়াক্কা খেলার মাঝেও সমুন্নত থাকে।
সাদা পোশাক ও লাল বল ছেড়ে রঙিন পোশাক ও সাদা বলে এক দিবসী ক্রিকেটের প্রচলনের শুরুর দিকে একে চটজলদি ক্রিকেট অভিধায় বিঘ্নিত করেছিলাম। ক্রিকেটের শুদ্ধাচার বা শাস্ত্রীয় কৌলিন্য নষ্টের সামান্য আশঙ্কাও পুরাতন মনে ছায়াপাত করেছিল। কিন্তু সময় শুধরে দিয়েছে সে মনোভাব। সংক্ষিপ্ত ক্রিকেট বাড়িয়ে দিয়েছে ক্রিকেটের আবেদন। টি-টোয়েন্টি বিষে বিষ ক্ষয় করে সে আবেদনকে আরও মনোগ্রাহী করে তুলে এনেছে ক্রিকেট কৌশলের ক্রিকেট বিনোদনের সুপ্ত অমৃত। কতই না উদ্ভাবনে প্রতিদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে ক্রিকেট, এই ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেটের সৌজন্যে। সনাতনী রীতিতে মজা মনও তাই তৃষ্ণার্ত মন নিয়ে সুপেয় তরলের খোঁজে দেখতে বসে টি-টোয়েন্টি। তরুণ প্রশিক্ষণার্থীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের যে আশঙ্কা একদিন ছিল, তাও উবে গেছে। এ সময়ের উঠতি খেলোয়াড়দের এ সময়ই সচেতন করে গড়ে তুলছে। এরা বুঝে নিয়েছে গান সম্পূর্ণ শেখার আগে অ্যালবাম বের করে লাভ নেই। সুতরাং জয়তু ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেট।
টি-টোয়েন্টির আদলে কিছু বিক্ষিপ্ত চিন্তাকে ঝটপট বাক্যজালে টি-টোয়েন্টি নিয়ে লেখাটি খাড়া করলাম। পাঠকের পাতে দেওয়ার লায়েক হলো কি না বলতে পারছি না। খেলাটির মতো যা কিছু হতে পারে মনে করে নিবেদন করলাম। বিরক্ত হলে ক্ষমা করবেন। উপভোগ করুন শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ। একটা-দুটো নতুন ধরনের মার, নতুন কৌশলের বলের উড়াল আপনার জন্য হয়তো বা অপেক্ষায় আছে।

No comments

Powered by Blogger.