'সমঝোতা না করলে ফল ভালো হবে না'-ডাব্লিউটিসিতে যুক্ত হতে সিমেন্ট উৎপাদকদের নৌমন্ত্রীর চাপ

বাংলাদেশ কার্গো ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও কোস্টাল-শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সমঝোতার জন্য বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনকে (বিসিএমএ) চাপ দিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ জন্য তিনি ১৭ দিন সময় বেঁধে দিয়ে বলেছেন, 'আমরা রেফারি হিসেবে থাকতে চাই।


আগামী ২ অক্টোবরের মধ্যে সমঝোতা করুন। আমাকে আইন প্রয়োগে বাধ্য করবেন না। বাধ্য করলে ফল কিন্তু ভালো হবে না।' গতকাল রবিবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত এক সভায় মন্ত্রী এই হুঁশিয়ারি দেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিজস্ব নৌযানে কাঁচামাল পরিবহনকারী সিমেন্ট কারখানা এবং অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কার্গো ভেসেল ও কোস্টাল-শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য পদ গ্রহণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক চাপ দেওয়া হচ্ছে। এ দুটি অ্যাসোসিয়েশন থেকে গত জুনে বিসিএমএ এবং এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃথক চিঠিতে তাদের সব পণ্যবাহী নৌযানকে তথাকথিত ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডাব্লিউটিসি) ক্রমতালিকাভুক্ত হয়ে পণ্য পরিবহন করতে বলা হয়। একটি চক্র 'সিরিয়াল' দেওয়ার নাম করে এই সেলের মাধ্যমে আমদানিকারকদের কাছ থেকে উচ্চ হারে কার্গো ভাড়া আদায় করে। তারা সিরিয়ালের নামে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব কার্গোর মাধ্যমে দ্রুত পণ্য পরিবহন করতে দেয় না। এভাবে চক্রটি বিগত কয়েক বছরে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে, যার ভাগ বিভিন্ন মহলে যায়। তারাই বিসিএমএকে অবৈধ ডাব্লিউটিসির সঙ্গে যুক্ত করার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে দিয়ে গতকালের সভাটি আহ্বান করায় বলে জানা গেছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গতকাল 'বিধিমালা অনুযায়ী কার্গো জাহাজ নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলাচল নিশ্চিত করা' সংক্রান্ত এই সভায় ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম ছাড়াও বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বিভিন্ন সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নিজস্ব শিপিং লাইনসের কর্মকর্তা ছাড়াও কার্গো ওনার্স ও কোস্টাল-শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্রে বলা হয়েছে, কার্গো জাহাজসহ নৌযানের রেজিস্ট্রেশন হয় ১৯৭৬ সালের ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্সের ২০০৫ সালে সংশোধিত ধারা ৩-এর আওতায়। যাত্রীবাহী নৌযানগুলো রুট পারমিটে নির্ধারিত সময়ে চলাচল করলেও মালবাহী নৌযানগুলো অভ্যন্তরীণ সব রুটে চলাচল করতে পারে। তবে ১০ বছরের বেশি মেয়াদি ও ৫০ মিটারের ঊধর্ে্বর নৌযান সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী স্পেশাল সার্ভে করে সন্তোষজনক বিবেচিত হলেই কেবল উপকূল অতিক্রম করে চট্টগ্রাম যাওয়ার অনুমতি পেয়ে থাকে। আর যেসব নৌযানের দৈর্ঘ্য ৪৫ মিটারের ঊধর্ে্ব সেগুলোকে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শান্ত মৌসুমে উপকূল অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়। কার্গো জাহাজের উপকূল অতিক্রমের (বে ক্রসিং) অনুমতি নেওয়ার জন্য সরকারকে পাঁচ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। তা ছাড়া কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নৌদুর্যোগ তহবিলে ২০ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। কোনো নৌযান নিমজ্জিত বা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওই তহবিল থেকে তাদের সহায়তা দেওয়া হয় বলে কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন দাবি করছে।
কার্যপত্রে আরো বলা হয়, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও কিছু কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের মালামাল বহন করার জন্য নৌযান ক্রয় ও নির্মাণ করেছে। এসব নৌযান মালিক কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য নন এবং তাঁরা বে ক্রসিংয়ের অনুমতির জন্য কেবল সরকারি ফি প্রদান করলেও নৌদুর্যোগ তহবিলে ২০ হাজার টাকা জমা দেন না। গতকালের সভায় বিদ্যমান নৌ চলাচল বিধিমালা অনুযায়ী কিভাবে জাহাজগুলোর চলাচল নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।
সভায় আমন্ত্রিত নিজস্ব কার্গো জাহাজে চট্টগ্রাম থেকে কাঁচামাল পরিবহনকারী সিমেন্ট উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানতে চান, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা কেন সভায় আসেননি। তাই তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই আগামী ২ অক্টোবর আবার সভা ডেকেছেন। তবে মন্ত্রী এটা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন যে আগামী সভার আগে ১৭ দিনের মধ্যে কোস্টাল-শিপ ওনার্স ও কার্গো ভেসেল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বিসিএমএকে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। অন্যথায় তিনি আইন প্রয়োগের হুমকি দেন। আগামী সভায় এমডিদের অথবা তাঁদের কাছ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সভায় আসতে বলা হয়েছে।
গতকালের সভায় উপস্থিত সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নিজস্ব শিপিং লাইনসের কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের নৌযানগুলো বীমা করা। ফলে নিমজ্জিত বা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাঁরা পণ্য ও জাহাজ উভয়ের ক্ষতিপূরণ পান। তাঁদের নৌদুর্যোগ তহবিলের টাকার প্রয়োজন নেই। তাঁরা জানান, মন্ত্রণালয় যতই চাপ প্রয়োগ করুক বিসিএমএ অবৈধ ডাব্লিউটিসির সঙ্গে যুক্ত হবে না। এটা করা হলে স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত বন্দর থেকে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাবে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং সম্ভাবনাময় সিমেন্ট কারখানাগুলো রুগ্ণ হয়ে পড়বে। ফলে আবার বিদেশ থেকে সিমেন্ট আমদানি করতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.