মানুষ বনাম হাতি by হরি কিশোর চাকমা

রাঙামাটির পাবলাখালী অভয়ারণ্যসংলগ্ন কয়েকটি এলাকায় দলবেঁধে হামলা চালিয়ে বসতবাড়ি, খেতের ফসল, গোলার ধান সবকিছু তছনছ করছে হাতি। গত কয়েক মাসে এসব এলাকায় হাতির আক্রমণে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। গ্রামবাসী মশাল জ্বালিয়ে, থালাবাসন ও ঘণ্টা পিটিয়েও হাতির দলকে তাড়াতে পারছে না।


স্থানীয় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জঙ্গল উজাড় হওয়ায় নষ্ট হয়েছে হাতির আবাসস্থল। বনে হাতির খাবারেরও অভাব দেখা দিয়েছে। এ কারণে হাতির দল বাধ্য হয়ে লোকালয়ে আসছে খাবারের সন্ধানে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ১০ থেকে ১১টি হাতি দলবেঁধে পাবলাখালী বনসংলগ্ন বরকলের কুরকুটিছড়া, লংগদুর গুলশাখালী ও ভাসান্যা আদামে বিচরণ করছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি, ফসল রক্ষায় হাতির দলের বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। হাতির দলের দু-একটি হাতি মারাও গেছে বলে জানান কয়েকজন গ্রামবাসী। বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে এই বনাঞ্চল থেকে হাতি হারিয়ে যাবে।
সম্প্রতি রাঙামাটির বরকল উপজেলার কুরকুটিছড়ায় গেলে দেখা যায়, চাক্কুয়াতলী এলাকায় কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে ঘেরা একটি টিলায় দুই দলে ভাগ হয়ে নয়টি হাতি বিচরণ করছে। এ সময় প্রথম দলটির ছবি তোলা গেলেও পরের দলটি জঙ্গলের মধ্যে চলে যায়।
স্থানীয় লোকজন জানান, হাতির দলটি কখনো কিছু দিনের জন্য গা ঢাকা দিলেও হঠাৎ করে আবার লোকালয়ে চলে আসে। থালাবাসন, ঘণ্টা বাজিয়ে ও মশাল জ্বালিয়েও হাতিদের তাড়ানো যায় না। হাতির দলটি সাঁতার কেটে কাপ্তাই হ্রদে ঘেরা একটি টিলা থেকে অন্য টিলায় ঘুরে বেড়ায়।
হাতি কেন লোকালয়ে আসছে: কুরকুটিছড়া, ভাসান্যা আদাম ও গুলশাখালীর ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার পূর্বে পাবলাখালী অভয়ারণ্যের অবস্থান। সেই অভয়ারণ্যে মানুষের বসতি স্থাপনের কারণে হাতির খাদ্য বিভিন্ন ফলমূলের গাছ উজাড় হয়ে গেছে। ফলে হাতির দল খাদ্যসংকটে পড়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. ছানাউল্লাহ পাটোয়ারি বলেন, ওই এলাকায় যে বন্য হাতিগুলো দেখা যায় সেগুলো ইন্ডিয়ান এলিফ্যান্ট প্রজাতির হাতি। এসব হাতির বিচরণক্ষেত্র ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি হয়ে থাকে। আর চলাচলও করে অনেকটা মানুষের মতো নির্দিষ্ট পথে। এখন হাতির চলাচলের পথে গড়ে উঠছে জনবসতি।
জানা গেছে, সত্তর ও আশির দশকে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পাবলাখালী বনের আশপাশের আদিবাসী লোকজন উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। জায়গা-জমি হারিয়ে এরা এখন গভীর বনে বসতি স্থাপন করেছে এবং জুমচাষও করছে। পাশাপাশি অনেক কাঠ ব্যবসায়ী বনের ভেতরে বসবাসকারী লোকজনের মাধ্যমে বনের গাছ পাচার করছেন। এ কারণে বিনষ্ট হয়েছে পাবলাখালীর হাতির বাসস্থান।
পাবলাখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য: হাতিসহ বন্য প্রাণী সংরক্ষণে পাবলাখালী রেঞ্জের ২২ হাজার ৬৯৪ হেক্টরসহ শিজক রেঞ্জের কিছু অংশকে নিয়ে ১৯৮৩ সালে ঘোষণা করা হয় বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। কিন্তু বন উজাড় হওয়া আর জনবসতি গড়ে ওঠায় হাতিসহ বন্য প্রাণীর বসবাস অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ডিএফও মো. ছানাউল্লাহ পাটোয়ারি বলেন, হাতি ও আশাপাশ এলাকার মানুষজনকে বাঁচাতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা না হলে হাতির অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। অভয়ারণ্যে বাঁশ, কলাগাছ, কাঁঠাল, ডুমুরসহ নানা ফলের গাছ রোপণ করা হলে হাতির লোকালয়ে আসা বন্ধ হবে।
ডিএফও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় সমন্বিত রক্ষিত এলাকা সহব্যবস্থাপনা প্রকল্প (আইপ্যাক) বাস্তবায়নের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরোধিতার কারণে তা বন্ধ রয়েছে।
মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব: পাবলাখালী এলাকায় বসতি ও খাবার নিয়ে চলছে মানুষের সঙ্গে হাতির দ্বন্দ্ব। কুরকুটিছড়া এলাকায় গত ১৮ আগস্ট রাতে লাইলী বেগমের (৩২) ঘরবাড়ি তছনছ করে হাতির দল। এর আগে হাতির দল একই এলাকার মংহ্লা রাখাইনের আনারসবাগানের দেড় হাজারের বেশি চারা নষ্ট করেছে।
কুরকুটিছড়া গ্রামের প্রিয়বরণ চাকমা (৩৩) বলেন, ‘বন্য হাতির কারণে এলাকায় কোনো বাগান করা যাচ্ছে না। এমনকি গোলায় ধানও রাখা যায় না। গত তিন মাসে বন্য হাতি আমাদের গ্রামে দুবার হানা দিয়েছে।’
বন বিভাগের হিসাব মতে, গত কয়েক মাসে হাতির আক্রমণে চারজন নিহত হয়েছে। তবে লংগদু উপজেলার ভাসান্যা আদাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জহির উদ্দিনের দাবি হাতির আক্রমণে এক শিশুসহ কমপক্ষে সাতজন নিহত হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, কয়েক মাস আগেও হাতির দলে ১১টি হাতি ছিল।
এখন মাত্র নয়টি হাতি দেখা যাচ্ছে। অনেকে অতিষ্ঠ হয়ে হাতি মেরে ফেলছে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন। ডিএফও ছানাউল্লা পাটোয়ারি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় হাতির দল শেষ হয়ে যাবে। কারণ মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্বে হাতির পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়।

No comments

Powered by Blogger.