পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা-বিপর্যয় নেমে আসার আগেই ব্যবস্থা নিন

দেশের সড়ক-মহাসড়কে মালামাল পরিবহনের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়ে পড়েছে। পরিবহন ব্যবসায়ীদের দাবি, গত এক বছরে কেবল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেই অন্তত ২০০ কোটি টাকার পণ্য অথবা পণ্যসমেত ট্রাক-ভ্যান ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে।


আর শুধু ডাকাতি নয়, চালক-হেলপারকে খুন করে পণ্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে উধাও হওয়ার ঘটনাও ঘটে চলেছে অহরহ। পত্রিকার পাতা খুললেই এ ধরনের বহু ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে। তদুপরি রয়েছে সড়ক-মহাসড়কে পুলিশ ও দলীয় কর্মীদের চাঁদাবাজি। এ যেন গোদের ওপর বিষ ফোড়া। এ নিয়ে আন্তজেলা পণ্য পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি, ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন পুলিশ ও সরকারি প্রশাসনের কাছে বারবার ধরনা দিয়েছে, প্রতিকার চেয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এমনকি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করারও প্রয়োজন বোধ করেননি। এ অবস্থায় তারা বাধ্য হয়ে আজ থেকে দুই দিনের ধর্মঘট করছে। এতেও কাজ না হলে লাগাতার ধর্মঘটে যাওয়া কিংবা পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। অন্যদিকে রমজান মাসের প্রাক্কালে বাজারে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমে বেড়েই চলেছে। এ সময় পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকলে মূল্য পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনুমান করতেও কষ্ট হয়। এর পরও এত জরুরি একটি বিষয়কে সরকার কেন দীর্ঘদিন ধরে এভাবে অবজ্ঞা করে চলেছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
আবার শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনই নয়, সড়ক-মহাসড়কে অন্যান্য পণ্য পরিবহনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে রডবোঝাই ট্রাক লুট হওয়ার বহু ঘটনা ঘটেছে। অনেক চালক ও হেলপারকে খুন করা হয়েছে। সে কারণে বাধ্য হয়ে রড ও লৌহজাত পণ্য পরিবহন সমিতি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে লাগাতার ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছে। বন্ধ রয়েছে এসব পণ্য পরিবহন। গার্মেন্ট পণ্যবাহী ট্রাক লুট হওয়ারও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে গত এক বছরে। অথচ চট্টগ্রামে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এড়িয়ে চলারও কোনো উপায় নেই। আমদানি করা পণ্য যেমন এখান থেকে খালাস করতে হবে, তেমনি রপ্তানির জন্যও পণ্য সেখানে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে প্রতিদিন এই মহাসড়কে পাঁচ থেকে ছয় হাজার পণ্যবাহী যান চলাচল করে। সরকার যদি এই সড়কের উপযুক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করতে পারে, তাহলে দেশের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি বাণিজ্যে যেমন ধস নামবে, তেমনি আমদানি করা পণ্য সারা দেশে সময়মতো পৌঁছাতে পারবে না। আর এর ফল অর্থনীতির জন্য কতটা ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের অনেক কর্তাব্যক্তি মুখস্থ বিদ্যার মতো বলে যাচ্ছেন, 'দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো।' কিন্তু এই কি সেই ভালোর নমুনা?
দেশ পরিচালনায় যে ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন হয়, অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান সরকার সে ধরনের দক্ষতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নৈরাজ্যকর অবস্থা তারই আরেকটি উদাহরণ। দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে জনগণ সরকারের অনেক ব্যর্থতা সহ্য করেছে, অনেক কষ্ট স্বীকার করেছে। আসন্ন রমজানেও যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে মানুষের সেই ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে যাবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নেতাদের নিয়ে অবিলম্বে আলোচনায় বসতে হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সম্ভাব্য উপায়গুলো খুঁজে বের করতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.