বাংলাদেশের পণ্য কিনে ঝুঁকি নেবে না যুক্তরাষ্ট্র-কর্মপরিবেশ, দুর্নীতি ও হরতাল নিয়ে আপত্তি

বাংলাদেশে উন্নত কর্মপরিবেশ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি পণ্য কিনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুনাম নষ্ট করার ঝুঁকি নেবেন না। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিউ মজিনা গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।


অনুষ্ঠানে মজিনা তাঁর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সফরকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, ক্যাপিটল হিল (কংগ্রেসনাল অফিস), পেন্টাগন (প্রতিরক্ষা দপ্তর), এএফএল-সিআইও (আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশনস) এবং ইউএসএআইডির (যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তাঁর আলোচনায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, সুশাসন, মানবাধিকার, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ড প্রাধান্য পেয়েছে।
রাষ্ট্রদূত মজিনা বলেন, তিনি যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই বলেছেন যে বাংলাদেশ কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন দুই দেশের অংশীদারিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গত মে মাসে বাংলাদেশ সফর করেছেন।
মজিনা বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অংশীদারি সংলাপের প্রথম বৈঠক আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াশিংটনে হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও সুশাসন- সম্ভাব্য এ তিনটি ওয়ার্কিং গ্রুপের কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের প্রশংসা করে মজিনা বলেন, তাঁরা এ দেশে (বাংলাদেশে) বিনিয়োগ করতে চান। কিন্তু অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা ও দুর্নীতির মতো কিছু প্রতিবন্ধকতা এখানে আছে। রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের সত্যিকারের সোনার বাংলা হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু তাঁরা এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতাগুলোর কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা কাঠামো চুক্তি (টিকফা) বিষয়ে চার বছর ধরে আলোচনার পরও সেটি স্বাক্ষর না হওয়ার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি আশাবাদী।
মজিনা বলেন, বাংলাদেশে শ্রমিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তিনি এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের 'জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স' (জিএসপি) সুবিধার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এএফএল-সিআইওতে। নিহত শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম এএফএল-সিআইও সংশ্লিষ্ট সলিডারিটি সেন্টারের কর্মী ছিলেন।
রাষ্ট্রদূত মজিনা আরো বলেন, অনেক কম্পানি বাংলাদেশের কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা বাংলাদেশি পণ্য কিনে নিজেদের সুনাম নষ্ট করার ঝুঁকি নেবে না বলে জানিয়েছে। তবে তারা এ-ও বলেছে, তারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য কিনতে চায়। মজিনা বলেন, এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে ওই ঝুঁকি দূর করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেন, রপ্তানি আদেশ অনুযায়ী পণ্য যথাসময়ে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশে হরতাল মানে তাঁদের পণ্য পৌঁছাতে দেরি হওয়া। মৌসুমি পণ্য তিন সপ্তাহ পরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে ব্যবসায়ীরা আর তা বিক্রি করতে পারেন না।
পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ানোয় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত মজিনা। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংক আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশাবাদী ছিলেন তিনি। এ সেতুর গুরুত্বও তিনি বোঝেন বলে জানান।
বিশ্বব্যাংককে রাজি করাতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্যোগ নেবে কি না জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মজিনা বলেন, তিনি ওই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র এ সংকটের অংশ নয়। তিনি আশা করেন, বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংক পারস্পরিক প্রত্যাশা পূরণের পথ খুঁজে পাবে।
বিশ্বব্যাংকের সরে দাঁড়ানোর পেছনে ড. ইউনূস ইস্যুর প্রভাব ও যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকার রটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, 'আপনাদের এটি স্বাধীন দেশ। আপনারা যা ইচ্ছা বলতে পারেন। তবে বলব, ওই বিষয়টি ভুল। সম্পূর্ণ ভুল। আর এটিই ইতিহাসের প্রথম বা শেষ ভুল নয়। এই ভুলগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্রও নেই।'
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলাদেশের কয়েকজন মন্ত্রীর একে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যায়িত করা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মজিনা বলেন, স্বাধীন দেশের মানুষ যা ইচ্ছা বলতে পারে। তাঁরা কী বলতে চেয়েছেন, তার ব্যাখ্যা তাঁদের কাছেই চাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি এ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে যাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, তাঁরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে যতটা চাপ দিচ্ছে মিয়ানমারকে ততটা দিচ্ছে না কেন- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের উত্তরে মজিনা বলেন, এমন ধারণা ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সমস্যাকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে মনে করে। যুক্তরাষ্ট্র ওই দেশটিকে জোর দিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার আছে।
বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ কি না জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত মজিনা বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে এ দেশ সুবিধা চাইলে আমরা কি বলব আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করছে? বন্ধুরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে। আমার সঙ্গে কেউ কথা বলতে চাইলে আমি স্বাগত জানাই।'
মজিনা আরো বলেন, 'বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ। যা ভালো হবে, তা অবশ্যই এ দেশের করা উচিত। আমাদের পরামর্শ ভালো মনে না হলে তা করবে না!'
যুক্তরাষ্ট্রের নৌমন্ত্রী রে মেবাসের আসন্ন ঢাকা সফরে কোনো চুক্তি হবে না বলে মজিনা জানান। বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েনের ধারণা আবারও নাকচ করে দিয়ে রসিকতার সুরে তিনি বলেন, কূটনৈতিক জীবন শেষ করে তিনি অধ্যাপক হবেন। সে সময় সপ্তম নৌবহর মোতায়েনের ওই ভিডিও ক্লিপটি দেখিয়ে তিনি শেখাবেন, কিভাবে তথ্য বিকৃত করে চমকপ্রদ প্রতিবেদন তৈরি করা যায়।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামালউদ্দিন সবুজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রেসক্লাবের নেতারা এবং যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক সমঝোতা হবেই : মজিনা

No comments

Powered by Blogger.